কাল শুরু হচ্ছে ইসলামিক বই মেলা, অংশ নিচ্ছে দেড় শতাধিক প্রকাশনী

আগামীকাল ১৩ সেপ্টেম্বর ২০২৫ থেকে ইসলামিক বই মেলা শুরু হতে যাচ্ছে। এই বই মেলা অনুষ্ঠিত হবে বায়তুল মোকাররম জাতীয় মসজিদের পূর্ব চত্বরে। এবারের মেলায় অংশ নিচ্ছে দেড় শতাধিক প্রকাশনী সংস্থা। মাসব্যাপী এই মেলার উদ্বোধন করবেন অন্তর্বর্তী সরকারের ধর্ম উপদেষ্টা ড. আ ফ ম খালিদ হোসেন।

আন্তর্জাতিক রূপ পেয়েছে ইসলামিক বই মেলা

এবারের ইসলামিক বই মেলায় একটি বিশেষ আকর্ষণ হলো আন্তর্জাতিক অংশগ্রহণ। দেশীয় প্রকাশনার বাইরে মিসর, পাকিস্তান এবং লেবানন থেকে চারটি আন্তর্জাতিক মানের প্রকাশনা সংস্থা প্রথমবারের মতো এই মেলায় অংশ নিচ্ছে। এই আন্তর্জাতিক অংশগ্রহণের ফলে মেলাটি আন্তর্জাতিক রূপ পেয়েছে এবং বাংলাদেশী পাঠকরা বিদেশী ইসলামিক বইয়ের সাথে পরিচিত হওয়ার সুযোগ পাবেন।

বিস্তৃত হয়েছে মেলার পরিসর

গত বছরের তুলনায় এবার মেলার পরিসর উল্লেখযোগ্যভাবে বাড়ানো হয়েছে। বায়তুল মোকাররমের পূর্ব গেট থেকে দৈনিক বাংলার মেইন রোড পর্যন্ত মেলার স্টল বিস্তৃত করা হয়েছে। এই বিস্তৃত পরিসরে দর্শনার্থীরা আরও বেশি বই এবং প্রকাশনার সাথে পরিচিত হওয়ার সুযোগ পাবেন।

দর্শনার্থীদের জন্য বিশেষ সুবিধা

দর্শনার্থীদের সুবিধার কথা মাথায় রেখে এবারের মেলায় যুক্ত করা হয়েছে অনেক নতুন সুবিধা। মেলায় থাকছে শিশুচত্বর, যেখানে ছোট ছেলেমেয়েরা আনন্দের সাথে সময় কাটাতে পারবে। মিডিয়া কর্নার থাকবে সংবাদকর্মীদের জন্য। মহিলাদের জন্য রয়েছে আলাদা বসার স্থান। লিটল ম্যাগাজিন কর্নারে পাওয়া যাবে ছোট পত্রিকাগুলো। লেখক কর্নারে লেখকদের সাথে পাঠকরা সরাসরি কথা বলতে পারবেন। এছাড়াও থাকবে চা-কফি-ফুড কর্নার এবং ইনফরমেশন সেন্টার।

বিশাল মঞ্চে চলবে নানা অনুষ্ঠান

মেলায় থাকবে একটি বিশাল মঞ্চ, যেখানে বইয়ের মোড়ক উন্মোচন, আলোচনা অনুষ্ঠান এবং বিভিন্ন সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান পরিচালিত হবে। এই মঞ্চে লেখক-পাঠকদের মধ্যে সরাসরি যোগাযোগ স্থাপিত হবে এবং নতুন বই নিয়ে আলোচনা হবে।

ইসলামিক বই মেলার ইতিহাস ও বিবর্তন

ইসলামিক ফাউন্ডেশন আয়োজিত এই বই মেলা গত শতাব্দীর নব্বইয়ের দশক থেকে আয়োজিত হয়ে আসছে। মাঝখানে অবশ্য মেলায় ক্রেতা-দর্শনার্থীর সংখ্যা কমে গিয়েছিল। তবে গত কয়েক বছর ধরে বিশেষ উদ্যোগের কারণে মেলা আবার জমজমাট হয়ে উঠেছে। বিশেষ করে গত বছর জুলাই বিপ্লবের পরবর্তী মুক্ত পরিবেশে এই মেলা আগের চেয়ে অনেক বেশি জনপ্রিয় হয়ে উঠেছে।

আগে দক্ষিণ গেটে এই মেলার আয়োজন করা হলেও গত বছর থেকে পূর্ব গেটে আয়োজন করা হচ্ছে। এই পরিবর্তনের ফলে ইসলামি ধারার পেশাদার প্রকাশকরা অংশ নেওয়ায় মেলাটি অভিজাত বইমেলার রূপ নিয়েছে। এ বছর মেলা আরও বেশি জমজমাট হয়ে উঠবে বলে প্রত্যাশা করছেন সংশ্লিষ্টরা।

বাংলা ভাষায় ইসলামিক বইয়ের বিকাশ

একসময় বাংলা ভাষায় ইসলামিক বইপুস্তকের যথেষ্ট অভাব ছিল। বাংলাভাষী মুসলমানরা ধর্মীয় জ্ঞান অর্জনের ক্ষেত্রে বইপুস্তকের সংকটে ভুগতেন। নব্বইয়ের দশক থেকে ধীরে ধীরে এই সংকট কাটতে শুরু করে। সেই নব্বইয়ের দশকেই ইসলামিক ফাউন্ডেশনের উদ্যোগে শুরু হয় ইসলামিক বই মেলার।

পাকিস্তান আমলে মাওলানা শামছুল হক ফরিদপুরী, মাওলানা মুনীরুজ্জামান ইসলামাবাদী, মাওলানা নূর মুহাম্মদ আজমী, মাওলানা মুহিউদ্দীন খান প্রমুখ ওলামায়ে কেরামের জোর প্রচেষ্টায় মুসলমানদের দৈনন্দিন জীবনের প্রয়োজনীয় বিষয়াদির উপর বহু বইপুস্তক রচিত হতে থাকে। বাংলাদেশ হওয়ার পর কিছু সংখ্যক আলেম এই ধারা অব্যাহত রাখেন।

আধুনিক যুগে ইসলামিক প্রকাশনার উন্নতি

নব্বইয়ের দশক থেকে কওমি মাদরাসার বিপুল সংখ্যক ছাত্র-শিক্ষক লেখালেখি ও সাহিত্যচর্চায় আত্মনিয়োগ করেন। পাশাপাশি পুরান ঢাকার চকবাজার ও বাংলাবাজারকে কেন্দ্র করে অনেক ইসলামিক পুস্তক প্রকাশনা সংস্থা গড়ে ওঠে। বর্তমানে শত শত প্রতিষ্ঠান শুধুমাত্র ইসলামিক পুস্তক প্রকাশ করছে।

বর্তমানে ইসলামিক বইয়ের পরিধি শুধু ধর্মীয় বিধিবিধানে সীমাবদ্ধ নেই। কোরআন, হাদিস, ফিকাহ, তাফসিরের পাশাপাশি শিল্প-সংস্কৃতির নানা বিষয়েও রচিত হচ্ছে ইসলামিক ভাবধারার বইপুস্তক। বিষয়বৈচিত্র্যে এবং অঙ্গসজ্জায় নতুন নতুন মাত্রা যোগ করছে এসব বই।

বৈচিত্র্যময় বিষয়ের সমাহার

আজকাল শিশু সাহিত্য, মুসলিমদের গৌরবময় ইতিহাস, কৃষ্টি-কালচার, গল্প-উপন্যাস, ছড়া-কবিতাসহ নানা বিষয়ে প্রায় প্রতিদিনই প্রকাশিত হচ্ছে নানা স্বাদের বই। এই বৈচিত্র্য ইসলামিক বই মেলাকে আরও আকর্ষণীয় করে তুলেছে এবং সকল বয়সের পাঠকদের কাছে এই মেলা জনপ্রিয় হয়ে উঠেছে।

মেলার গুরুত্ব ও প্রভাব

ইসলামিক বই মেলা শুধুমাত্র একটি বাণিজ্যিক অনুষ্ঠান নয়, এটি বাংলাদেশী মুসলিম সমাজের জ্ঞানচর্চা ও সাংস্কৃতিক বিকাশের একটি গুরুত্বপূর্ণ প্ল্যাটফর্ম। এই মেলার মাধ্যমে নতুন লেখকরা পরিচিতি পান এবং পাঠকদের সাথে সরাসরি যোগাযোগের সুযোগ পান। প্রকাশকরা তাদের নতুন বই নিয়ে আসেন এবং পাঠকদের প্রতিক্রিয়া জানতে পারেন।

আগামীকাল থেকে শুরু হওয়া এই ইসলামিক বই মেলা বাংলাদেশের ইসলামিক সাহিত্যের অগ্রগতির একটি উল্লেখযোগ্য মাইলফলক। দেড় শতাধিক প্রকাশনীর অংশগ্রহণ এবং আন্তর্জাতিক উপস্থিতি এই মেলাকে আরও সমৃদ্ধ করেছে। বই প্রেমীরা এবং জ্ঞানপিপাসুরা এই মেলায় তাদের পছন্দের বই খুঁজে পাবেন এবং নতুন জ্ঞানের সাথে পরিচিত হওয়ার সুযোগ পাবেন।

শাকিল আহম্মেদ
শাকিল আহম্মেদhttps://porasonablog.com
মোঃ শাকিল আহাম্মেদ শিক্ষা বিষয়ক সংবাদ নিয়ে নিয়মিত কাজ করছেন এবং ভর্তি, রেজাল্ট ও বিভিন্ন পরীক্ষার আপডেট সংগ্রহ ও যাচাই করেন। তিনি অর্থনীতি বিষয়ে স্নাতক সম্পন্ন করেছেন। তথ্য প্রকাশের আগে তিনি সংশ্লিষ্ট শিক্ষা বোর্ড, বিশ্ববিদ্যালয়ের অফিসিয়াল নোটিশ ও নির্ভরযোগ্য সূত্র মিলিয়ে দেখেন। শিক্ষার্থীদের জন্য দ্রুত ও নির্ভুল তথ্য পৌঁছে দেওয়াই তার প্রধান লক্ষ্য।
রিলেটেড আরটিকেল

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here

- Advertisment -

জনপ্রিয় নিউজ