খুলনা প্রকৌশল ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয় (কুয়েট) এ একটি অভূতপূর্ব ঘটনা ঘটেছে। প্রকৌশলী অধিকার আন্দোলন কুয়েট নামের একটি সংগঠন নতুন ব্যাচের ভর্তি পরীক্ষা অনির্দিষ্টকালের জন্য বন্ধ ঘোষণা করেছে। এই ঘোষণা আসার পর থেকে কুয়েট ভর্তি পরীক্ষা নিয়ে ব্যাপক আলোচনা শুরু হয়েছে।
কী হয়েছিল বৃহস্পতিবার রাতে?
গত ১৮ সেপ্টেম্বর বৃহস্পতিবার রাত ১১টার দিকে কুয়েট ক্যাম্পাসে শিক্ষার্থীরা একটি বিক্ষোভ মিছিল বের করেন। মিছিল শেষে তারা প্রধান ফটকে ‘এডমিশন টেস্ট বন্ধ’ লেখা একটি ব্যানার ঝুলিয়ে দেন। এই ঘটনার মাধ্যমেই কুয়েট ভর্তি বন্ধের আনুষ্ঠানিক ঘোষণা আসে।
শিক্ষার্থীদের এই প্রতিবাদ আন্দোলনের মূল কারণ হলো, তারা মনে করেন সরকারের কাছে প্রকৌশলীদের ন্যায্য মর্যাদা নেই। এই পরিস্থিতিতে নতুন কোনো প্রকৌশলী তৈরি করার প্রয়োজন নেই বলে তারা মত প্রকাশ করেছেন।
আন্দোলনের প্রধান দাবিগুলো কী?
প্রকৌশল অধিকার আন্দোলন গত ছয় মাস ধরে তিনটি প্রধান দাবি নিয়ে শান্তিপূর্ণ আন্দোলন করছে। এই দাবিগুলো অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ এবং প্রকৌশল শিক্ষার ভবিষ্যতের সাথে জড়িত।
প্রথম দাবি হলো ইঞ্জিনিয়ারিং নবম গ্রেডে কোনো প্রকার প্রমোশনাল কোটা থাকবে না। সবার জন্য পরীক্ষা বাধ্যতামূলক এবং ন্যূনতম যোগ্যতা হতে হবে বিএসসি ডিগ্রি। এই দাবিটি প্রকৌশল শিক্ষার মান বৃদ্ধির সাথে সরাসরি সম্পর্কিত।
দ্বিতীয় দাবি অনুযায়ী দশম গ্রেডে ডিপ্লোমা ও বিএসসি উভয় পক্ষকেই পরীক্ষার মাধ্যমে অন্তর্ভুক্তির সুযোগ দিতে হবে। এটি ন্যায্যতার নীতি অনুসরণ করে।
তৃতীয় দাবিটি সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ। এতে বলা হয়েছে বিএসসি ডিগ্রি ছাড়া কেউ ‘ইঞ্জিনিয়ার’ পদবি ব্যবহার করতে পারবে না। এই নীতিগত সিদ্ধান্ত গ্রহণের দাবি জানানো হয়েছে।
সরকারের সাথে আলোচনার ইতিহাস
২৭ আগস্ট প্রকৌশল শিক্ষার্থীরা রাজধানীর শাহবাগ মোড়ে অবস্থান নিয়ে আন্দোলন করেন। এই আন্দোলনের চাপে সরকার দাবিগুলো যাচাই করতে একটি তদন্ত কমিটি গঠন করে। এই কমিটিতে ডিপ্লোমা ও বিএসসি উভয় পক্ষের প্রতিনিধি রাখা হয়েছিল।
কিন্তু আন্দোলনকারীদের অভিযোগ অনুযায়ী, তদন্ত কমিটিতে তাদের দাবির যৌক্তিকতা উপস্থাপন করার পরও সরকার ১৭ সেপ্টেম্বর প্রথম কমিটি বাতিল করে নতুন কমিটি গঠন করেছে। তাদের ভাষায়, এটি ডিপ্লোমাধারীদের মব প্রেশারের ফল।
২৪তম ব্যাচই শেষ ব্যাচ?
প্রকৌশল অধিকার আন্দোলনের নেতারা একটি চাঞ্চল্যকর ঘোষণা দিয়েছেন। তারা বলেছেন, “২৪তম ব্যাচই হবে কুয়েটের শেষ ব্যাচ”। এই ঘোষণার মাধ্যমে তারা সরকারের প্রতি তীব্র অসন্তুষ্টি প্রকাশ করেছেন।
তাদের মতে, সরকার যৌক্তিক দাবির দিকে নজর না দিয়ে স্পষ্টভাবে মবের কাছে মাথা নত করেছে। এতে বোঝা যায়, সরকারের কাছে প্রকৌশলীদের কোনো মূল্য নেই। তাই নতুন করে কোনো ব্যাচের ভর্তি পরীক্ষা নেওয়ার প্রয়োজন নেই বলে তারা মনে করেন।
বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসনের নীরবতা
এই গুরুত্বপূর্ণ ঘটনার পর থেকে কুয়েট প্রশাসন নীরব রয়েছে। বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষের পক্ষ থেকে এখনো কোনো আনুষ্ঠানিক বিবৃতি বা মন্তব্য পাওয়া যায়নি। এই নীরবতা পরিস্থিতির জটিলতা আরও বৃদ্ধি করেছে।
ভবিষ্যতে কী হতে পারে?
কুয়েট ভর্তি পরীক্ষা বন্ধের এই ঘটনা বাংলাদেশের প্রকৌশল শিক্ষার ইতিহাসে একটি নতুন অধ্যায়ের সূচনা করতে পারে। প্রকৌশলীদের মর্যাদা এবং শিক্ষার মান নিয়ে যে বিতর্ক তৈরি হয়েছে, তা সমাধান না হলে এই আন্দোলন আরও দীর্ঘায়িত হতে পারে।
সরকার এবং শিক্ষার্থীদের মধ্যে কার্যকর সংলাপের প্রয়োজন রয়েছে। প্রকৌশল শিক্ষার ভবিষ্যৎ নিয়ে সিদ্ধান্ত নেওয়ার ক্ষেত্রে সব পক্ষের মতামত বিবেচনা করা জরুরি।
এই ঘটনা শুধু কুয়েট নয়, বরং সারাদেশের প্রকৌশল শিক্ষার্থী এবং প্রকৌশলীদের একটি বড় অংশের মনের কথা প্রকাশ করেছে। প্রকৌশলীদের ন্যায্য অধিকার এবং যোগ্যতা ভিত্তিক নিয়োগ নিশ্চিত করার দাবি এখন আর এড়িয়ে যাওয়া সম্ভব নয়।
