এইচএসসি ২০২৬: কেন্দ্রে সিসিটিভি বাধ্যতামূলক, এনালগ ঘড়ি ছাড়া সব নিষিদ্ধ

আসন্ন উচ্চ মাধ্যমিক সার্টিফিকেট (এইচএসসি) ২০২৬ পরীক্ষা সুষ্ঠু, স্বচ্ছ এবং নকলমুক্ত পরিবেশে আয়োজনের লক্ষ্যে কঠোর অবস্থানে গেছে ঢাকা শিক্ষা বোর্ডসহ সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ। নতুন নির্দেশনায় বলা হয়েছে—প্রতিটি পরীক্ষাকেন্দ্রে সিসিটিভি ক্যামেরা স্থাপন বাধ্যতামূলক এবং পরীক্ষার্থীরা শুধুমাত্র এনালগ (কাঁটাযুক্ত) হাতঘড়ি ব্যবহার করতে পারবেন। ডিজিটাল ঘড়ি, স্মার্টওয়াচ, মোবাইল ফোনসহ যেকোনো ইলেকট্রনিক ডিভাইস কেন্দ্রে আনা সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ।

এইচএসসি ২০২৬ পরীক্ষাকে সামনে রেখে ঢাকা শিক্ষা বোর্ডের পরীক্ষা নিয়ন্ত্রকের স্বাক্ষরে সম্প্রতি কেন্দ্রের ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তাদের কাছে একগুচ্ছ জরুরি নির্দেশনা পাঠানো হয়েছে। প্রশ্নফাঁস ও অসদুপায় ঠেকাতেই মূলত এসব কঠোর ব্যবস্থা নেওয়া হচ্ছে বলে জানা গেছে।

কেন্দ্রে সিসিটিভি কেন বাধ্যতামূলক

নির্দেশনা অনুযায়ী, প্রতিটি পরীক্ষাকেন্দ্রের কৌশলগত স্থানে—বিশেষ করে প্রশ্নপত্র সংরক্ষণের কক্ষ, উত্তরপত্র সংগ্রহের জায়গা এবং পরীক্ষা হলের প্রবেশপথে—সচল সিসিটিভি ক্যামেরা থাকতে হবে। পরীক্ষা চলাকালীন পুরো সময় এসব ক্যামেরা চালু রাখার বিষয়টি নিশ্চিত করবেন কেন্দ্রের ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা।

সৃজনশীল (CQ) ও বহুনির্বাচনী (MCQ) উভয় অংশের পরীক্ষায় সিসিটিভি নজরদারির আওতায় থাকবে। ক্যামেরার ফুটেজ পরবর্তী সময়ে যেকোনো অভিযোগ যাচাই বা তদন্তের ক্ষেত্রে প্রমাণ হিসেবে সংরক্ষিত থাকবে। বোর্ড সূত্র বলছে, প্রশ্নফাঁস ও সংঘবদ্ধ নকল রোধে এটি কার্যকর ভূমিকা রাখবে বলেই আশা করা হচ্ছে।

ঘড়ি নিয়ে নতুন বার্তা: এনালগ ছাড়া আর কিছু নয়

সাম্প্রতিক এসএসসি পরীক্ষায় ঘড়ি নিয়ে নানা আলোচনা ও বিভ্রান্তির পর এইচএসসিতে বিষয়টি একেবারে পরিষ্কার করে দিয়েছে বোর্ড। নির্দেশনায় বলা হয়েছে—

  • পরীক্ষার্থীরা কেবল কাঁটাযুক্ত এনালগ হাতঘড়ি ব্যবহার করতে পারবেন।
  • কোনো ধরনের ডিজিটাল ঘড়ি, স্মার্টওয়াচ, ব্লুটুথ-সংযোগ যুক্ত ঘড়ি বা মেমোরি কার্ড সমর্থিত ঘড়ি কেন্দ্রে আনা যাবে না।
  • মোবাইল ফোনের সুবিধাযুক্ত ঘড়ি, ক্যামেরাযুক্ত পেন বা অনুরূপ যেকোনো ইলেকট্রনিক যন্ত্র সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ।

বিশেষজ্ঞরা বলছেন, আধুনিক প্রযুক্তির বহুমুখী ব্যবহারের কারণে অনেক স্মার্টওয়াচই এখন ছোটখাটো কম্পিউটারের মতো কাজ করে। তাই অসদুপায় ঠেকাতে এনালগ ঘড়ি ছাড়া বাকি সব ঘড়িকে নিষিদ্ধের তালিকায় আনা হয়েছে।

মোবাইল ফোন: শুধু কেন্দ্রসচিবের জন্য সীমিত ছাড়

পরীক্ষার্থী, কক্ষ পরিদর্শক, শিক্ষক—কেউই পরীক্ষাকেন্দ্রে মোবাইল ফোন নিয়ে প্রবেশ করতে পারবেন না। শুধুমাত্র কেন্দ্রের ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (কেন্দ্রসচিব) একটি সাধারণ ফিচার ফোন ব্যবহার করতে পারবেন, তবে সেটি অবশ্যই ছবি তোলা ও ইন্টারনেট সুবিধা বিহীন হতে হবে।

এ ছাড়া প্রশ্নপত্র পরিবহন ও গ্রহণের কাজে নিয়োজিত কর্মকর্তা, শিক্ষক ও কর্মচারীরাও দায়িত্ব পালনের সময় ফোন ব্যবহার করতে পারবেন না।

প্রশ্নপত্রের নিরাপত্তা ও পরিবহন

প্রশ্নফাঁস ঠেকাতে প্রশ্নপত্রের নিরাপত্তা ব্যবস্থায় বিশেষ গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে। সংক্ষেপে যা যা থাকছে—

  • পরীক্ষা শুরুর তিন দিন আগে ট্রেজারি বা থানার লকারে সংরক্ষিত প্রশ্নপত্রের প্যাকেট সংশ্লিষ্ট ট্রেজারি অফিসার, উপজেলা নির্বাহী অফিসার, কেন্দ্রের ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা ও পরীক্ষা পরিচালনা কমিটির সদস্যদের উপস্থিতিতে যাচাই করতে হবে।
  • সৃজনশীল (CQ) ও বহুনির্বাচনী (MCQ) প্রশ্নপত্র দুই সেট করে তারিখভিত্তিক আলাদা সিকিউরিটি খামে প্যাকেট করতে হবে।
  • প্রতিটি সিকিউরিটি খামের ওপর পরীক্ষার তারিখ, বিষয় কোড ও সেট কোড স্পষ্টভাবে লিখতে হবে।
  • পরীক্ষার দিন ট্যাগ অফিসার ও পুলিশ পাহারায় প্রশ্নপত্র কেন্দ্রে আনতে হবে।
  • প্রশ্নপত্র বহনের কাজে কালো কাঁচযুক্ত মাইক্রোবাস বা এ ধরনের যানবাহন ব্যবহার করা যাবে না।
  • পরীক্ষা শুরুর নির্দিষ্ট সময় আগে মোবাইলে এসএমএসের মাধ্যমে সেট কোড জানানো হবে। ট্যাগ অফিসার ও পুলিশ কর্মকর্তাকে দেখিয়ে, ফয়েল প্যাকেটে অমোচনীয় কলমে স্বাক্ষর করার পরই প্রশ্নপত্রের প্যাকেট খোলা যাবে।
  • নির্ধারিত সেট কোডের বদলে অন্য সেটের প্রশ্নপত্রে পরীক্ষা নিলে সংশ্লিষ্টদের বিরুদ্ধে বিভাগীয় শাস্তিমূলক ব্যবস্থা নেওয়া হবে।

পরীক্ষা শুরু ও প্রবেশের সময়সূচি

  • পরীক্ষা শুরু হবে সকাল ১০টায় এবং দুপুর ২টায়—দুই শিফটে।
  • পরীক্ষার্থীরা সকাল ৮টা ৩০ মিনিট থেকে কেন্দ্রে প্রবেশ করতে পারবেন।
  • পরীক্ষা শুরুর অন্তত ৩০ মিনিট আগে নিজ আসনে বসতে হবে।
  • কোনো পরীক্ষার্থী দেরিতে এলে রেজিস্টার খাতায় তার রোল নম্বর, প্রবেশের সময় ও দেরির কারণ লিপিবদ্ধ করে ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা বিশেষ বিবেচনায় কেন্দ্রে প্রবেশের অনুমতি দিতে পারবেন।
  • পরীক্ষা শেষে রেজিস্টার খাতাটি বোর্ডে জমা দিতে হবে।

পরীক্ষার্থীদের জন্য জরুরি কিছু কথা

পরীক্ষার্থীদের প্রতি পরামর্শ—

  • প্রবেশপত্র ও রেজিস্ট্রেশন কার্ড অবশ্যই সঙ্গে রাখতে হবে।
  • শিক্ষা বোর্ড অনুমোদিত সাধারণ সাইন্টিফিক ক্যালকুলেটর ব্যবহার করা যাবে; প্রোগ্রামেবল ক্যালকুলেটর সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ।
  • নিয়মিত (২০২৪-২০২৫ সেশন) পরীক্ষার্থীরা ২০২৬ সালের পূর্ণাঙ্গ সিলেবাসে পরীক্ষা দেবেন।
  • অনিয়মিত ও মানোন্নয়ন (২০২৩-২০২৪ ও তদূর্ধ্ব সেশন) পরীক্ষার্থীরা ২০২৫ সালের অনুমোদিত সিলেবাস অনুযায়ী পরীক্ষায় অংশগ্রহণ করবেন।
  • একজন পরীক্ষার্থীর সঙ্গে কেন্দ্রে একজনের বেশি অভিভাবক প্রবেশ করতে পারবেন না।
  • কেন্দ্রের বাইরে অভিভাবক বা অন্য কেউ যেন ভিড় তৈরি করতে না পারেন—সে জন্য প্রয়োজন হলে হ্যান্ডমাইক ব্যবহার করে শৃঙ্খলা বজায় রাখা হবে।

কক্ষ পরিদর্শক ও আসন বিন্যাস

  • প্রতি ২০ জন পরীক্ষার্থীর জন্য ১ জন কক্ষ পরিদর্শক নিয়োগ করতে হবে।
  • প্রতিটি কক্ষে কমপক্ষে দুইজন পরিদর্শক দায়িত্ব পালন করবেন।
  • ৫ বা ৬ ফুট লম্বা প্রতিটি বেঞ্চে দুজন এবং ৪ ফুট লম্বা বেঞ্চে একজন পরীক্ষার্থীর আসন বিন্যাস করতে হবে। এই নিয়মের ব্যতিক্রম কোনোভাবেই করা যাবে না।

নকল ও গুজব রোধে কঠোর অবস্থান

বোর্ড স্পষ্ট করে জানিয়েছে, প্রশ্নফাঁস বা সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে গুজব ছড়ানোর সঙ্গে জড়িতদের বিরুদ্ধে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী ও জেলা প্রশাসন কঠোর আইনগত ব্যবস্থা নেবে। বোর্ড থেকে সরবরাহকৃত নকলবিরোধী পোস্টার কেন্দ্রের দৃশ্যমান স্থানে টানিয়ে রাখতে হবে। কেন্দ্রের কর্মকর্তাদের যেকোনো ধরনের গাফিলতি বিভাগীয় শাস্তিমূলক ব্যবস্থার আওতায় আসবে।

অভিভাবক ও শিক্ষার্থীদের জন্য কী বার্তা

পরীক্ষার্থী ও অভিভাবকদের কয়েকটি বিষয়ে এখনই সতর্ক হওয়া দরকার—

  • বাসা থেকে বের হওয়ার আগে নিশ্চিত হন, পরীক্ষার্থী যেন এনালগ ঘড়ির বাইরে অন্য কোনো ঘড়ি বা ইলেকট্রনিক যন্ত্র সঙ্গে না নেয়।
  • মোবাইল ফোন বাসায় রেখে আসাই নিরাপদ; ভুলে কেন্দ্রে নিয়ে গেলে তা বাজেয়াপ্ত হতে পারে।
  • কেন্দ্রে পৌঁছানোর সময় হাতে রেখে দিন—যানজট বা অন্য কারণে যেন দেরি না হয়।
  • প্রবেশপত্রের একটি ফটোকপি ব্যাকআপ হিসেবে সঙ্গে রাখুন।
  • পরীক্ষা সম্পর্কিত কোনো ‘সাজেশন’, ‘প্রশ্ন কমন আসবে’ ধরনের গুজবে কান না দিয়ে নিজের প্রস্তুতিতে মনোযোগ দিন।

শেষ কথা

এইচএসসি ২০২৬ পরীক্ষা ঘিরে শিক্ষা বোর্ডের এসব নির্দেশনা মূলত একটি স্বচ্ছ, নিরাপদ ও মেধার সঠিক মূল্যায়ন নিশ্চিত করার লক্ষ্যেই নেওয়া হয়েছে। সিসিটিভির আওতা, এনালগ ঘড়ির সীমা এবং ইলেকট্রনিক যন্ত্রের ওপর নিষেধাজ্ঞা—সব মিলিয়ে এবারের পরীক্ষা পরিবেশ আগের যেকোনো বছরের তুলনায় বেশি নিয়ন্ত্রিত হতে যাচ্ছে। নিয়মগুলো ভালোভাবে বুঝে নিয়ম মেনে চললে পরীক্ষার দিন বাড়তি কোনো চাপ পড়বে না; বরং প্রস্তুতিকে কাজে লাগানোর সুযোগ মিলবে শতভাগ। শিক্ষার্থীদের প্রতি পরামর্শ—নিয়ম মেনে চলুন, আত্মবিশ্বাস ধরে রাখুন, এবং প্রস্তুতিকে চূড়ান্ত করুন। কোনো সরকারি নির্দেশনায় পরিবর্তন এলে নিজ নিজ কলেজ ও সংশ্লিষ্ট শিক্ষা বোর্ডের অফিসিয়াল ঘোষণার দিকে নজর রাখার অনুরোধ করা হলো।

নিলয় আহমেদ
নিলয় আহমেদ
নিলয় আহম্মেদ শিক্ষা বিষয়ক প্রতিবেদক। তিনি বাংলা বিষয়ে স্নাতকোত্তর সম্পন্ন করেছেন। পরীক্ষা, ভর্তি ও শিক্ষানীতি সংক্রান্ত তথ্য নিয়ে কাজ করেন। তথ্য যাচাই করে সংক্ষিপ্ত ও পরিষ্কারভাবে উপস্থাপন করাই তার প্রধান দায়িত্ব।
রিলেটেড আরটিকেল

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here

- Advertisment -

জনপ্রিয় নিউজ