এমবিবিএস ভর্তিতে অটোমেশন বাতিল চান কলেজ মালিকরা: কেন এই দাবি?

বাংলাদেশের বেসরকারি মেডিক্যাল কলেজের মালিকরা এমবিবিএস ভর্তি প্রক্রিয়ায় অটোমেশন পদ্ধতি বাতিলের জোরালো দাবি তুলেছেন। তাদের মূল অভিযোগ হলো অটোমেশন পদ্ধতির কারণে অনেক আসন ফাঁকা থাকছে এবং শিক্ষার্থী ও অভিভাবকরা পছন্দের প্রতিষ্ঠানে ভর্তি হতে পারছেন না।

কেন অসন্তুষ্ট কলেজ মালিকরা?

বাংলাদেশ বেসরকারি মেডিক্যাল কলেজ অ্যাসোসিয়েশনের তথ্য অনুযায়ী, অটোমেশন চালুর আগে ২০২০-২১ এবং ২০২১-২২ শিক্ষাবর্ষে কোনো আসন ফাঁকা থাকেনি। কিন্তু অটোমেশনের পর পরিস্থিতি সম্পূর্ণ বদলে গেছে। ২০২২-২৩ শিক্ষাবর্ষে ২১৭টি আসন ফাঁকা ছিল। ২০২৪-২৫ শিক্ষাবর্ষে এই সংখ্যা বেড়ে দাঁড়িয়েছে ৪৬৭টি আসনে।

কলেজ মালিকদের ভাষ্যমতে, তিন বছর আগেও এসব জটিলতা ছিল না। মেডিক্যাল কলেজে শিক্ষার্থী ভর্তি প্রক্রিয়ায় অটোমেশন পদ্ধতি চালুর পর এই সংকট তৈরি হয়েছে। বর্তমানে অটোমেশন প্রক্রিয়ায় ভর্তি কার্যক্রম শেষ হতে সময় লাগে তিন মাসের বেশি। ২০২৩-২৪ শিক্ষাবর্ষে ভর্তি প্রক্রিয়া শেষ হতে পুরো ৬ মাস সময় লেগেছিল।

অর্থনৈতিক প্রভাব কতটুকু?

বেসরকারি মেডিক্যাল কলেজগুলোর অর্থনৈতিক ক্ষতি হচ্ছে বিপুল পরিমাণে। সারা দেশে ৬৭টি বেসরকারি মেডিক্যাল কলেজ এবং সেনাবাহিনী ও নৌবাহিনীর ৭টি মেডিক্যাল কলেজে মোট ৬ হাজার ২৯৩টি আসন রয়েছে। এর মধ্যে ৪৫ শতাংশ আসন অর্থাৎ ২ হাজার ৮৩২টি আসন বিদেশি শিক্ষার্থীদের জন্য সংরক্ষিত।

বিদেশি শিক্ষার্থীর আসন পূর্ণ করা গেলে প্রায় ১ হাজার ৫০০ কোটি টাকা আয় করা সম্ভব। কারণ একজন বিদেশি শিক্ষার্থী গড়ে ৪০ হাজার মার্কিন ডলার খরচ করেন তার পুরো শিক্ষাজীবনে। কিন্তু অটোমেশনের কারণে এই আয়ের সুযোগ হাতছাড়া হচ্ছে।

কী দাবি করছেন কলেজ মালিকরা?

কলেজ মালিকরা বেশকিছু গুরুত্বপূর্ণ দাবি তুলেছেন। তারা চান দেশি শিক্ষার্থীদের এসএসসি ও এইচএসসিতে জিপিএ ৯ এর পরিবর্তে জিপিএ ৮ করা হোক। বিদেশি শিক্ষার্থীদের ক্ষেত্রে এই জিপিএ হোক ৭। একইসাথে বায়োলজিতে জিপিএ ৪ এর পরিবর্তে ৩.৫ করার দাবি জানিয়েছেন তারা।

অ্যাসোসিয়েশনের সভাপতি ডা. শেখ মহিউদ্দীনের মতে, অটোমেশন পদ্ধতি শিক্ষার্থীদের জন্য শিক্ষাবান্ধব নয়। এটি মেধাবী শিক্ষার্থীরা পছন্দ করছেন না এবং অনেকে দেশের বাইরে চলে যাচ্ছেন।

সরকারি অবস্থান কী?

তবে এই দাবির সাথে সম্পূর্ণ একমত নন স্বাস্থ্য শিক্ষা অধিদপ্তরের মহাপরিচালক অধ্যাপক ডা. নাজমুল হোসেন। তিনি বলেছেন যে অটোমেশনের কারণেই যে বেসরকারি মেডিক্যাল কলেজগুলো শিক্ষার্থী পাচ্ছে না, বিষয়টি সম্পূর্ণ সঠিক নয়। আরও অনেক কারণ রয়েছে।

তিনি উল্লেখ করেছেন যে ২০২৩ সালে সরকারি মেডিক্যাল কলেজে ১ হাজার ৩০টি আসন একযোগে বাড়িয়ে দেওয়া হয়েছে। এই শিক্ষার্থীরা এখন আর বেসরকারি কলেজে যাচ্ছেন না। পাশাপাশি কিছু প্রাইভেট মেডিক্যাল কলেজের মান খুবই খারাপ এবং বিদেশি স্বীকৃতি সংক্রান্ত জটিলতা রয়েছে।

নীতিনির্ধারকদের মতামত

নীতিনির্ধারকরা মনে করেন যে চিকিৎসা শিক্ষার সাথে কোনো আপস করার সুযোগ নেই। কম রেজাল্ট নিয়ে ভর্তির সুযোগ দেওয়া হলে চিকিৎসা শিক্ষার মান আরও খারাপ হবে। তাদের মতে, এমবিবিএস একটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ বিষয় এবং এখানে মানের সাথে কোনো ছাড় দেওয়া যাবে না।

বিশ্বব্যাপী অবস্থা

বেসরকারি মেডিক্যাল কলেজ অ্যাসোসিয়েশনের দাবি অনুযায়ী, বিশ্বের কোথাও মেডিক্যাল কলেজের ভর্তি প্রক্রিয়ায় অটোমেশন পদ্ধতি চালু নেই। তাদের মতে, এই পদ্ধতি শিক্ষার্থীদের জন্য অনেক জটিলতা সৃষ্টি করছে।

সমাধানের পথ

এই সমস্যার সমাধানে কলেজ মালিকরা চান যে বিদেশি শিক্ষার্থী ভর্তিতে নীতিমালা সহজ করা হোক। একইসাথে এসএসসি ও এইচএসসির গ্যাপ দুই বছর থেকে তিন বছর করার দাবিও জানিয়েছেন তারা। তাদের মতে, সরকার বেসরকারি মেডিক্যাল কলেজের উদ্যোক্তাদের ৫ শতাংশ প্রণোদনা দিলে আয় আরও বাড়বে।

বর্তমান পরিস্থিতিতে এমবিবিএস ভর্তি নিয়ে সৃষ্ট এই বিতর্ক শিক্ষার্থী, অভিভাবক এবং চিকিৎসকদের মধ্যে অসন্তোষ সৃষ্টি করেছে। ভবিষ্যতে এই সমস্যার টেকসই সমাধান খুঁজে পেতে হবে যা একদিকে চিকিৎসা শিক্ষার মান বজায় রাখবে, অন্যদিকে বেসরকারি মেডিক্যাল শিক্ষা খাতের স্বার্থও রক্ষা করবে।

রায়হান আহাম্মেদ
রায়হান আহাম্মেদ
রায়হান আহাম্মেদ শিক্ষা ও চাকরি সংক্রান্ত আপডেট নিয়ে কাজ করেন। তিনি কম্পিউটার সায়েন্সে স্নাতক সম্পন্ন করেছেন এবং অনলাইন তথ্য যাচাই ও দ্রুত আপডেট প্রকাশে দক্ষ। তিনি বিভিন্ন নির্ভরযোগ্য ওয়েবসাইট ও অফিসিয়াল নোটিশ থেকে তথ্য সংগ্রহ করে নিশ্চিত হওয়ার পর প্রকাশ করেন। তার লক্ষ্য হলো পাঠকদের জন্য নির্ভরযোগ্য তথ্য নিশ্চিত করা।
রিলেটেড আরটিকেল

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here

- Advertisment -

জনপ্রিয় নিউজ