পড়াশোনার পাশাপাশি খাবার ডেলিভারি করতেন রিয়াজ: সিএনজির ধাক্কায় শিক্ষার্থীর মৃত্যু

চট্টগ্রাম নগরীতে একটি হৃদয়বিদারক ঘটনা ঘটেছে। পড়াশোনার পাশাপাশি খাবার ডেলিভারি করে জীবিকা নির্বাহ করা মো. রিয়াজ উদ্দিন (২৬) নামের এক কলেজ শিক্ষার্থীর সিএনজির ধাক্কায় মৃত্যু হয়েছে। শনিবার রাত নয়টার দিকে চট্টগ্রাম নগরীর দেওয়ানহাট ফ্লাইওভারের পশ্চিম পাশে এই মর্মান্তিক দুর্ঘটনাটি ঘটে।
স্বপ্নবান শিক্ষার্থীর জীবনযাত্রা

মো. রিয়াজ উদ্দিন ছিলেন আনোয়ারা উপজেলার বারখাইন ইউনিয়নের তৈলারদ্বীপ এলাকার একজন মেধাবী ছাত্র। তিনি চট্টগ্রাম হাজী মুহাম্মদ মহসিন কলেজের অনার্স চতুর্থ বর্ষের শিক্ষার্থী ছিলেন। পারিবারিক আর্থিক অবস্থার কথা চিন্তা করে তিনি লেখাপড়ার পাশাপাশি একটি খাবার সরবরাহ প্রতিষ্ঠানে চাকরি করতেন।

বাইসাইকেল দিয়ে খাবার ডেলিভারি করে পড়ালেখার খরচ চালাতেন রিয়াজ। এমন অনেক শিক্ষার্থী রয়েছেন যারা পড়াশোনার পাশাপাশি কাজ করে নিজেদের পায়ে দাঁড়ানোর চেষ্টা করেন। রিয়াজও ছিলেন তেমনই একজন স্বনির্ভর শিক্ষার্থী।
দুর্ঘটনার বিবরণ: শেষ ডেলিভারি থেকে ফেরার পথে

শনিবার রাতে বহদ্দারহাট থেকে সাইকেল যোগে অর্ডার ডেলিভারি শেষ করে মনছুরাবাদ বাসায় ফিরছিলেন রিয়াজ। রাত সাড়ে নয়টার দিকে দেওয়ানহাট ফ্লাইওভারের কাছে পৌঁছালে পাহাড়তলী বাজারের দিক থেকে আসা একটি দ্রুতগতির সিএনজি অটোরিকশার ধাক্কায় তিনি সড়কে ছিটকে পড়েন।

সিএনজির তীব্র ধাক্কায় রিয়াজের মাথায় গুরুতর আঘাত লাগে এবং তার সাইকেলটি দুমড়ে মুচড়ে যায়। দুর্ঘটনার পর সিএনজি চালক তাকে চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে নিয়ে গিয়ে ভর্তি করিয়ে দেন। কিন্তু কৌশলে পালিয়ে যান সেই চালক।
পরিবারের বেদনাদায়ক অভিজ্ঞতা

নিহতের ছোট ভাই মো. আরিফুল ইসলাম (২১) জানান, “আমার ভাই পড়ালেখার পাশাপাশি বাইসাইকেল যোগে খাবার সরবরাহকারী প্রতিষ্ঠানে চাকরি করত। শনিবার রাত সাড়ে দশটার দিকে এক ব্যক্তি ফোন করে জানায় আমার ভাই অ্যাক্সিডেন্টে গুরুতর আহত হয়ে চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে চিকিৎসাধীন।”

তিনি আরও বলেন, “তাৎক্ষণিক আমরা হাসপাতালের জরুরি বিভাগে পৌঁছলে সেখানে মরদেহ দেখতে পাই।” এই আকস্মিক মৃত্যুর খবর পুরো পরিবারকে গভীর শোকে নিমজ্জিত করেছে।
পুলিশী তদন্ত ও আইনি ব্যবস্থা

ডবলমুরিং মডেল থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) বাবুল আজাদ জানান, “সড়ক দুর্ঘটনায় আনোয়ারার নিহত যুবকের মরদেহ বিনা ময়নাতদন্তের জন্য আবেদন করেছে তার পরিবার। আবেদনের প্রেক্ষিতে মরদেহ পরিবারের কাছে হস্তান্তর করা হয়েছে।”

তিনি আরও জানান, “গুরুতর আহত অবস্থায় সিএনজি চালক যুবককে হাসপাতালে এনে ভর্তি করান বলে হাসপাতাল সূত্রে আমরা জেনেছি। পরবর্তীতে মারা গেলে ওই চালক পালিয়ে যায়। তবে গাড়ির নম্বর আর চালকের পরিচয় শনাক্ত করেছে পুলিশ। আশা করছি দ্রুত আইনের আওতায় আনা যাবে।”
ছাত্রজীবনে কর্মসংস্থানের চ্যালেঞ্জ

রিয়াজের মৃত্যু বাংলাদেশের অনেক শিক্ষার্থীর বাস্তবতা তুলে ধরে। উচ্চশিক্ষার খরচ মেটাতে অনেক শিক্ষার্থীকেই পড়াশোনার পাশাপাশি কাজ করতে হয়। খাবার ডেলিভারি, পার্ট টাইম জব ইত্যাদি করে তারা নিজেদের শিক্ষার খরচ বহন করার চেষ্টা করেন।

কিন্তু সড়কের নিরাপত্তাহীনতা এই পরিশ্রমী শিক্ষার্থীদের জীবনে ঝুঁকি বয়ে আনে। রাতের বেলা ডেলিভারি কাজ করতে গিয়ে অনেকেই দুর্ঘটনার শিকার হন। চট্টগ্রাম নগরীর মতো ব্যস্ত শহরে যানবাহন নিয়ন্ত্রণ ও চালকদের দায়বদ্ধতা নিশ্চিত করা অত্যন্ত জরুরি।
সড়ক নিরাপত্তার গুরুত্ব

এই ঘটনা সড়ক নিরাপত্তার বিষয়ে আমাদের সচেতন করে তোলে। সিএনজি অটোরিকশা চালকদের দায়িত্বশীল আচরণ ও ট্রাফিক আইন মেনে চলার প্রয়োজনীয়তা আরও স্পষ্ট হয়ে ওঠে। দুর্ঘটনার পর পালিয়ে যাওয়া একটি গর্হিত অপরাধ যা কঠোর শাস্তির দাবি রাখে।

খাবার ডেলিভারি কাজে নিয়োজিত শিক্ষার্থী ও যুবকদের নিরাপত্তা নিশ্চিতকরণ এবং তাদের জন্য উপযুক্ত সুরক্ষা ব্যবস্থা গড়ে তোলা সময়ের দাবি। রিয়াজের মতো স্বপ্নবাজ শিক্ষার্থীদের জীবন রক্ষায় আমাদের সবাইকে দায়িত্বশীল হতে হবে।
উপসংহার

মো. রিয়াজ উদ্দিনের মৃত্যু শুধু একটি পরিবারের ক্ষতি নয়, এটি সমাজের একজন ভবিষ্যৎ কর্মী হারানোর দুঃখজনক ঘটনা। পড়াশোনার পাশাপাশি কাজ করে স্বনির্ভর হওয়ার চেষ্টায় তিনি ছিলেন অনুকরণীয়। তার আকস্মিক মৃত্যু আমাদের সড়ক নিরাপত্তা ও যুব কর্মসংস্থানের নিরাপত্তা নিয়ে ভাবতে বাধ্য করে।

ইকরাম শেখ
ইকরাম শেখ
ইকরাম শেখ শিক্ষা খাতের বিভিন্ন আপডেট নিয়ে লেখালেখি করেন। তিনি সমাজবিজ্ঞান বিষয়ে স্নাতক সম্পন্ন করেছেন এবং তথ্য সংগ্রহ ও বিশ্লেষণে আগ্রহী। নতুন কোনো ভর্তি বা ফলাফল সংক্রান্ত তথ্য প্রকাশের আগে তিনি সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের প্রকাশিত নোটিশ যাচাই করেন। তিনি নির্ভরযোগ্য ও সময়োপযোগী তথ্য তুলে ধরতে সচেষ্ট।
রিলেটেড আরটিকেল

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here

- Advertisment -

জনপ্রিয় নিউজ