দীর্ঘ পাঁচ বছর পর এবার স্বাভাবিক অবস্থায় ফিরে আসছে এইচএসসি পরীক্ষার ফলাফল। করোনাভাইরাসের প্রভাবে বিগত বছরগুলোতে যে অটোপাস এবং সাবজেক্ট ম্যাপিং পদ্ধতি অনুসরণ করা হয়েছিল, সেই অস্বাভাবিক পরিস্থিতি থেকে বেরিয়ে এবার সম্পূর্ণ মেধার ভিত্তিতে ফলাফল প্রকাশ করা হবে। তবে এই পরিবর্তনের কারণে এবার পাসের হার এবং জিপিএ-৫ প্রাপ্তির সংখ্যা কমে যেতে পারে বলে মনে করছেন শিক্ষাবিদরা।
শিক্ষা মন্ত্রণালয় এবং বিভিন্ন শিক্ষা বোর্ডের চেয়ারম্যানরা জানিয়েছেন যে, এবার কোনো ধরনের অতিরিক্ত সুবিধা বা অনুকম্পা দেখানো হবে না। পুরোপুরি নিয়মতান্ত্রিক পদ্ধতিতে উত্তরপত্র মূল্যায়ন করে ফলাফল প্রস্তুত করা হচ্ছে। আগামী ১৮ অক্টোবরের মধ্যে এই স্বাভাবিক ফলাফল প্রকাশের সব প্রস্তুতি সম্পন্ন করা হবে।
কেন কমতে পারে পাস ও জিপিএ-৫?
বিগত কয়েক বছরে অস্বাভাবিক পরিস্থিতির কারণে শিক্ষার্থীরা যে ধরনের সুবিধা পেয়েছিল, এবার তা আর থাকছে না। ২০২০ সাল থেকে শুরু করে ২০২৪ সাল পর্যন্ত বিভিন্ন কারণে সংক্ষিপ্ত সিলেবাস, অটোপাস এবং সাবজেক্ট ম্যাপিং পদ্ধতি ব্যবহার করা হয়েছিল। এর ফলে পাসের হার এবং জিপিএ-৫ পাওয়ার সংখ্যা স্বাভাবিকের চেয়ে অনেক বেশি ছিল।
চলতি বছরের এসএসসি পরীক্ষার ফলাফল থেকেই এর প্রমাণ পাওয়া যায়। স্বাভাবিক অবস্থায় ফেরার পর এসএসসিতে পাসের হার কমে দাঁড়ায় ৬৮.৪৫ শতাংশে, যেখানে আগের বছর ছিল ৮৩.০৩ শতাংশ। একইভাবে জিপিএ-৫ পাওয়া শিক্ষার্থীর সংখ্যাও কমে ১ লাখ ৩৯ হাজার ৩২ জনে নেমে আসে, যা আগের বছরের তুলনায় প্রায় ৪৩ হাজার কম।
রাজধানীর একটি কলেজের প্রভাষক মো. আতিকুর রহমান এ বিষয়ে বলেন, “এসএসসির মতো এবারও এইচএসসিতে পাস কমতে পারে। তবে এই পরীক্ষাই জীবনের গতিপ্রকৃতি নির্ধারণ করে দেবে, বিষয়টি এমন নয়। এবার পুরোপুরি মেধার ভিত্তিতে ফলাফল প্রকাশ করায় সবার প্রকৃত অবস্থা জানা যাবে।”
শিক্ষার্থী ও অভিভাবকদের জন্য পরামর্শ
এই পরিবর্তিত পরিস্থিতিতে শিক্ষার্থী এবং তাদের অভিভাবকদের মানসিকভাবে প্রস্তুত থাকার পরামর্শ দিচ্ছেন বিশেষজ্ঞরা। একজন অভিভাবক হ্যাপি আক্তার জানান, “এইচএসসির ভালো ফলাফল বিশ্ববিদ্যালয় ভর্তিতে সহায়ক হলেও খারাপ ফলাফলের জন্য শিক্ষার্থীদের বকাঝকা করা উচিত নয়। বরং তাদের মানসিক সাপোর্ট দিয়ে ভর্তি পরীক্ষার প্রস্তুতিতে উৎসাহিত করতে হবে।”
তিনি আরও যোগ করেন, “একটি পরীক্ষার ফলাফলের ওপর জীবন থেমে থাকে না। এমন অনেক শিক্ষার্থী আছে যাদের অ্যাকাডেমিক রেজাল্ট খারাপ হওয়ার পরও তারা জীবনে প্রতিষ্ঠিত হয়েছে।”
বিগত পাঁচ বছরের এইচএসসি পরীক্ষার চিত্র
২০২০ সাল: করোনাভাইরাসের কারণে সবাই অটোপাস করেন। ১৩ লাখ ৬৭ হাজার পরীক্ষার্থীর মধ্যে জিপিএ-৫ পান ১ লাখ ৬১ হাজার ৮০৭ জন।
২০২১ সাল: সংক্ষিপ্ত সিলেবাসে পরীক্ষা নিয়ে পাসের হার ছিল ৯৫.২৬ শতাংশ। জিপিএ-৫ পান ১ লাখ ৮৯ হাজার ১৬৯ জন।
২০২২ সাল: সংক্ষিপ্ত সিলেবাসেই পরীক্ষা হলেও পাসের হার কমে ৮৫.৯৫ শতাংশে নেমে আসে। জিপিএ-৫ পান ১ লাখ ৭৬ হাজার ২৮২ জন।
২০২৩ সাল: পাসের হার আরও কমে ৭৮.৬৪ শতাংশ হয়। জিপিএ-৫ পান মাত্র ৯২ হাজার ৫৯৫ জন।
২০২৪ সাল: গণঅভ্যুত্থানের কারণে সাবজেক্ট ম্যাপিং করে ফলাফল দেওয়া হয়। পাসের হার ছিল ৭৭.৭৮ শতাংশ।
এবারের এইচএসসি পরীক্ষার বিশেষত্ব
চলতি বছরের এইচএসসি ও সমমানের পরীক্ষায় অংশ নেন ১২ লাখ ৫১ হাজার ১১১ জন শিক্ষার্থী। তাদের মধ্যে ৬ লাখ ১৮ হাজার ১৫ ছাত্র এবং ৬ লাখ ৩৩ হাজার ৯৬ ছাত্রী। সারাদেশে ২ হাজার ৭৯৭টি কেন্দ্রে পরীক্ষা অনুষ্ঠিত হয়।
চট্টগ্রাম শিক্ষা বোর্ডের চেয়ারম্যান অধ্যাপক ইলিয়াছ উদ্দিন আহাম্মদ জানান, “কারও প্রতি কোনো দয়া বা অনুকম্পা দেখানোর সুযোগ নেই। সব হবে পুরোপুরি মেধার ভিত্তিতে। শিক্ষার্থী যেভাবে উত্তর দিয়েছে, সেটা যথার্থভাবে মূল্যায়ন করেছি।”
ফলাফল প্রকাশের সময়সূচী
শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের নির্দেশনা অনুযায়ী বোর্ড চেয়ারম্যানরা ৬০ দিনের মধ্যে ফলাফল প্রকাশের আশ্বাস দিয়েছেন। গত ১৯ আগস্ট লিখিত পরীক্ষা এবং ২১-৩১ আগস্ট ব্যবহারিক পরীক্ষা শেষ হওয়ার পর থেকে গণনা করলে ১৮ অক্টোবরের মধ্যে সব প্রস্তুতি সম্পন্ন হবে।
মাধ্যমিক ও উচ্চশিক্ষা বিভাগের অতিরিক্ত সচিব মো. মজিবর রহমান জানিয়েছেন, “বোর্ড চেয়ারম্যানরা ১৯ অক্টোবরের মধ্যে ফল প্রকাশের আশ্বাস দিয়েছেন। তবে এর আগেও ফল প্রকাশ করতে পারেন।”
শিক্ষার্থীদের জন্য গুরুত্বপূর্ণ বার্তা
এই স্বাভাবিক অবস্থায় ফেরা শিক্ষাব্যবস্থার জন্য একটি ইতিবাচক পদক্ষেপ। যদিও পাসের হার এবং জিপিএ-৫ এর সংখ্যা কমতে পারে, তবে এর মানে এই নয় যে শিক্ষার্থীদের ভবিষ্যৎ সম্ভাবনা কমে গেছে। বরং এখন প্রকৃত মেধার ভিত্তিতে মূল্যায়ন হওয়ায় বিশ্ববিদ্যালয় ভর্তি পরীক্ষার জন্য আরও ভালো প্রস্তুতি নেওয়ার সুযোগ রয়েছে।
শিক্ষাবিদরা পরামর্শ দিচ্ছেন যে, ফলাফল যেমনই হোক না কেন, শিক্ষার্থীদের আত্মবিশ্বাস হারানো উচিত নয়। কারণ সবার ক্ষেত্রেই একই অবস্থা, তাই ভর্তি পরীক্ষার প্রস্তুতিতে মনোযোগ দিলে ভালো ফলাফল অর্জন সম্ভব।
পাঁচ বছর পর এই স্বাভাবিক ফলাফল প্রকাশের মাধ্যমে দেশের শিক্ষাব্যবস্থা আবার তার নিয়মতান্ত্রিক গতিতে ফিরে আসছে। এটি দীর্ঘমেয়াদে শিক্ষার মান উন্নয়নে ইতিবাচক প্রভাব ফেলবে বলে আশা করা যায়।
