১ জুলাই থেকে নতুন পে-স্কেল: তিন ধাপে বাস্তবায়নের পরিকল্পনা, সর্বনিম্ন বেতন ২০ হাজার টাকা

সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারীদের জন্য বহুল আলোচিত নতুন পে-স্কেল আগামী ১ জুলাই থেকে আংশিকভাবে কার্যকর হতে পারে বলে নীতিগত সিদ্ধান্তের তথ্য পাওয়া গেছে। তবে অতিরিক্ত আর্থিক চাপ ও মূল্যস্ফীতির ঝুঁকি বিবেচনায় এটি একবারে নয়, তিন ধাপে বাস্তবায়নের পরিকল্পনা নেওয়া হয়েছে। প্রস্তাব অনুযায়ী, নতুন কাঠামোয় সর্বনিম্ন মূল বেতন ২০ হাজার টাকা এবং সর্বোচ্চ মূল বেতন ১ লাখ ৬০ হাজার টাকা নির্ধারণের কথা রয়েছে।

অর্থ মন্ত্রণালয় সংশ্লিষ্ট সূত্র ও একাধিক গণমাধ্যমে প্রকাশিত তথ্য অনুযায়ী, ২০২৬-২৭ অর্থবছরের প্রথম দিন থেকে নবম জাতীয় বেতন কাঠামোর প্রথম ধাপ চালু হতে পারে। দীর্ঘ ১১ বছর পর নতুন পে-স্কেল নিয়ে এমন অগ্রগতি সরকারি চাকরিজীবী, পেনশনভোগী এবং শিক্ষা খাতসংশ্লিষ্টদের মধ্যে নতুন আলোচনা তৈরি করেছে।

তিন ধাপে যেভাবে বাস্তবায়ন হতে পারে

প্রস্তাবিত পরিকল্পনা অনুযায়ী, প্রথম ধাপে আগামী অর্থবছর থেকে বর্ধিত মূল বেতনের ৫০ শতাংশ কার্যকর করা হতে পারে। দ্বিতীয় ধাপে ২০২৭-২৮ অর্থবছরে মূল বেতনের বাকি ৫০ শতাংশ দেওয়া হবে। আর তৃতীয় ধাপে ২০২৮-২৯ অর্থবছরে বাড়িভাড়া, চিকিৎসা, যাতায়াতসহ অন্যান্য ভাতা ও আর্থিক সুবিধা সমন্বয়ের কথা রয়েছে।

এভাবে ধাপে ধাপে বাস্তবায়ন করলে সরকারের ওপর তাৎক্ষণিক বড় অঙ্কের চাপ কমবে, একই সঙ্গে বাজারে অতিরিক্ত অর্থপ্রবাহজনিত মূল্যস্ফীতির আশঙ্কাও কিছুটা নিয়ন্ত্রণে রাখা সম্ভব হবে বলে সংশ্লিষ্টরা মনে করছেন।

সর্বনিম্ন ২০ হাজার, সর্বোচ্চ ১ লাখ ৬০ হাজার

নতুন পে-স্কেলের প্রস্তাবে বিদ্যমান ২০টি গ্রেড বহাল রাখার সুপারিশ করা হয়েছে। তবে প্রতিটি গ্রেডে বেতন কাঠামো পুনর্নির্ধারণের কথা বলা হয়েছে। এতে বর্তমান ২০তম গ্রেডের ৮ হাজার ২৫০ টাকার মূল বেতন বাড়িয়ে ২০ হাজার টাকা করার প্রস্তাব রয়েছে। একইভাবে ১ম গ্রেডের মূল বেতন ৭৮ হাজার টাকা থেকে বাড়িয়ে ১ লাখ ৬০ হাজার টাকা করার সুপারিশ করা হয়েছে।

প্রস্তাবিত এ কাঠামোয় সর্বনিম্ন ও সর্বোচ্চ বেতনের অনুপাত ১:৯.৪ থেকে কমিয়ে ১:৮-এ নামিয়ে আনার কথা বলা হয়েছে। অর্থাৎ নিচের স্তরের কর্মীদের বেতন তুলনামূলক বেশি হারে বাড়ানোর ওপর গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে।

বেতন বাড়বে ১০০ থেকে ১৪০ শতাংশ পর্যন্ত

সংশ্লিষ্ট সূত্রগুলো বলছে, নতুন কাঠামোয় গ্রেডভেদে ১০০ থেকে ১৪০ শতাংশ পর্যন্ত বেতন বৃদ্ধির সুপারিশ রয়েছে। কিছু প্রতিবেদনে এ হার আরও বেশি হতে পারে বলেও ইঙ্গিত মিলেছে। তবে চূড়ান্ত অনুমোদন ও প্রজ্ঞাপন ছাড়া সুনির্দিষ্ট হার নিশ্চিত বলা যাচ্ছে না।

তাই এখন পর্যন্ত এটুকু স্পষ্ট যে, নতুন পে-স্কেল কার্যকর হলে সরকারি চাকরিজীবীদের মূল বেতনে বড় ধরনের পরিবর্তন আসবে।

কত টাকা বাড়তি ব্যয় হতে পারে

নতুন পে-স্কেল পুরোপুরি বাস্তবায়নে সরকারের অতিরিক্ত প্রায় ১ লাখ ৬ হাজার কোটি টাকা প্রয়োজন হতে পারে বলে অর্থ মন্ত্রণালয় সূত্রে বিভিন্ন প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে। এর মধ্যে প্রথম ধাপ বাস্তবায়নের জন্য আগামী বাজেটে প্রায় ৩৫ হাজার কোটি টাকা অতিরিক্ত বরাদ্দ রাখার আলোচনা রয়েছে।

বর্তমানে সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারী ও পেনশনভোগীদের বেতন-ভাতায় সরকারের বার্ষিক ব্যয় প্রায় ১ লাখ ৩১ হাজার কোটি টাকা। ফলে এক ধাপে পুরো কাঠামো কার্যকর করা সরকারের জন্য বড় আর্থিক চাপ তৈরি করতে পারে।

কারা এর আওতায় আসতে পারেন

প্রস্তাবিত বেতন কাঠামোর আওতায় বেসামরিক প্রশাসন, বিচার বিভাগ, সশস্ত্র বাহিনী, স্বায়ত্তশাসিত ও আধা-স্বায়ত্তশাসিত প্রতিষ্ঠানের কর্মীরা থাকতে পারেন। এছাড়া প্রায় ৯ লাখ পেনশনভোগীর বিষয়টিও আলোচনায় রয়েছে।

শিক্ষা খাতের পাঠকদের জন্য গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, ব্যয়ের হিসাব-নিকাশে পেনশনভোগীদের পাশাপাশি এমপিওভুক্ত শিক্ষক-কর্মচারীদের বিষয়ও আলোচনায় এসেছে বলে কিছু প্রতিবেদনে উল্লেখ রয়েছে। তবে শিক্ষা খাতের ক্ষেত্রে চূড়ান্ত প্রয়োগ কীভাবে হবে, তা সরকারিভাবে বিস্তারিত জানানো হয়নি।

পেনশন ও ভাতায়ও আসতে পারে পরিবর্তন

বেতন কমিশনের সুপারিশে শুধু মূল বেতন নয়, পেনশন ও বিভিন্ন ভাতায় পরিবর্তনের কথাও উঠে এসেছে। কম পেনশনভোগীদের জন্য তুলনামূলক বেশি হারে পেনশন বৃদ্ধির সুপারিশ রয়েছে। পাশাপাশি টিফিন ভাতা বাড়ানো, বৈশাখী ভাতা বৃদ্ধি, নিচের গ্রেডের কর্মীদের জন্য যাতায়াত ও বাড়িভাড়া ভাতায় বাড়তি সুবিধার প্রস্তাবও আলোচনায় আছে।

তবে এসব সুপারিশের সবকিছুই এখনো বাস্তবায়নের চূড়ান্ত পর্যায়ে পৌঁছায়নি। ফলে সরকারি সিদ্ধান্ত, বাজেট ঘোষণা ও পরবর্তী প্রজ্ঞাপনই এখানে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হবে।

কেন গুরুত্বপূর্ণ এই নতুন পে-স্কেল

সর্বশেষ জাতীয় পে-স্কেল কার্যকর হয়েছিল ২০১৫ সালে। এরপর দীর্ঘ সময় পার হয়ে গেলেও নতুন বেতন কাঠামো ঘোষণা হয়নি। এ সময়ে মূল্যস্ফীতি, নিত্যপণ্যের দাম বৃদ্ধি এবং জীবনযাত্রার ব্যয় বাড়ায় সরকারি চাকরিজীবীদের মধ্যে নতুন পে-স্কেলের দাবি জোরালো হয়ে ওঠে।

সেই প্রেক্ষাপটে নতুন কাঠামো শুধু বেতন বাড়ানোর বিষয় নয়; এটি প্রকৃত মজুরি সমন্বয়, কর্মীদের আর্থিক স্বস্তি এবং প্রশাসনিক দক্ষতা ধরে রাখার সঙ্গেও যুক্ত।

এখন কী দেখার

এখন সবার নজর থাকবে আসন্ন বাজেট ঘোষণা, সরকারের আনুষ্ঠানিক সিদ্ধান্ত এবং বাস্তবায়ন সূচির দিকে। ১ জুলাই থেকে প্রথম ধাপ শুরু হলেও সেটি মূলত আংশিক বাস্তবায়ন হবে—এমনটাই এখন পর্যন্ত পাওয়া তথ্য বলছে। পূর্ণাঙ্গ সুবিধা পেতে সময় লাগতে পারে আরও দুই অর্থবছর।

সব মিলিয়ে, নতুন পে-স্কেল সরকারি চাকরিজীবীদের জন্য বড় স্বস্তির বার্তা হলেও এটি এখনো নীতিগত ও প্রস্তাবনার পর্যায়ে রয়েছে। তাই শিক্ষার্থী, চাকরিপ্রার্থী, শিক্ষক-কর্মচারী এবং অভিভাবকদের জন্য সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হলো—চূড়ান্ত সরকারি ঘোষণা না আসা পর্যন্ত বিষয়টিকে সম্ভাব্য সিদ্ধান্ত হিসেবেই দেখা। তবে যদি প্রস্তাবিত কাঠামো অনুযায়ী বাস্তবায়ন শুরু হয়, তাহলে ১ জুলাই থেকে দেশের বেতন কাঠামোয় বড় পরিবর্তনের সূচনা হতে যাচ্ছে।

তাসনিম লাবু
তাসনিম লাবু
তাসনিম আক্তার লাবনি শিক্ষা ও ভর্তি সংক্রান্ত সংবাদ সহজভাবে উপস্থাপনের জন্য কাজ করেন। তিনি ইংরেজি বিষয়ে স্নাতকোত্তর সম্পন্ন করেছেন এবং জটিল নোটিশকে পরিষ্কার ভাষায় ব্যাখ্যা করতে দক্ষ। তিনি সবসময় তথ্যের নির্ভুলতা নিশ্চিত করতে অফিসিয়াল সার্কুলার ও বিশ্বস্ত উৎস যাচাই করেন। তার লেখার উদ্দেশ্য হলো শিক্ষার্থীদের বিভ্রান্তি কমানো।
রিলেটেড আরটিকেল

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here

- Advertisment -

জনপ্রিয় নিউজ