আজ ৬ সেপ্টেম্বর ২০২৫, বাংলাদেশসহ বিশ্বের মুসলিম সম্প্রদায় পালন করছে পবিত্র ঈদে মিলাদুন্নবী (সা.)। হিজরি রবিউল আউয়াল মাসের ১২ তারিখ এই শুভ দিনটি মুসলমানদের কাছে বিশেষ তাৎপর্যপূর্ণ।
ঈদে মিলাদুন্নবীর পবিত্র অর্থ
ঈদে মিলাদুন্নবী শব্দটি তিনটি আরবি শব্দের সমন্বয়ে গঠিত। ঈদ অর্থ আনন্দোৎসব, মিলাদ অর্থ জন্মদিন এবং নবী অর্থ আল্লাহর প্রেরিত দূত। অর্থাৎ এই দিনটি হচ্ছে বিশ্বনবী হযরত মুহাম্মদ (সা.)-এর জন্মদিনের আনন্দোৎসব।
৫৭০ খ্রিস্টাব্দের এই দিনেই আরবের পবিত্র মক্কা নগরীতে সম্ভ্রান্ত কুরাইশ বংশে মা আমিনার কোল আলো করে জন্মগ্রহণ করেছিলেন রহমাতুল্লিল আলামীন হযরত মুহাম্মদ (সা.)। তিনি শুধু মুসলমানদের জন্যই নয়, বরং সমগ্র বিশ্বমানবতার জন্য আলোর দিশারী হিসেবে এসেছিলেন।
কুরআনে বর্ণিত আনন্দোৎসবের বিধান
পবিত্র কুরআনে আল্লাহ তা’আলা স্পষ্টভাবে ঘোষণা করেছেন যে, তাঁর নেয়ামত ও রহমত পেলে মানুষের আনন্দিত হওয়া উচিত। সূরা ইউনুসের ৫৮ নম্বর আয়াতে বলা হয়েছে: “আল্লাহর অনুগ্রহে ও তাঁর দয়ায়। সুতরাং এতে তারা আনন্দিত হোক।”
হযরত আবদুল্লাহ ইবনে আব্বাস (রা.)-এর ব্যাখ্যা অনুযায়ী, এখানে আল্লাহর অনুগ্রহ বলতে ইসলাম এবং রহমত বলতে হযরত মুহাম্মদ (সা.)-কে বোঝানো হয়েছে। কারণ আল্লাহ তা’আলা বলেছেন: “আমি তোমাকে বিশ্বজগতের প্রতি কেবল রহমতরূপেই প্রেরণ করেছি।”
বাংলাদেশে ঈদে মিলাদুন্নবী উদযাপন
বাংলাদেশে আজ সরকারি ছুটির দিন হিসেবে পালিত হচ্ছে ঈদে মিলাদুন্নবী। সারাদেশের মসজিদ-মাদ্রাসায় বিশেষ দোয়া ও মিলাদ মাহফিলের আয়োজন করা হয়েছে। নাত-কাসিদা, কুরআন তিলাওয়াত, এবং নবীজির জীবনী আলোচনার মাধ্যমে দিনটি উদযাপিত হচ্ছে।
বিভিন্ন ধর্মীয় সংগঠন ও মসজিদ কমিটি রঙিন কাগজ, ব্যানার ও আলোকসজ্জার মাধ্যমে তাদের এলাকাগুলো সাজিয়েছে। অনেক স্থানে বিনামূল্যে খাবার বিতরণ এবং দাতব্য কার্যক্রমের আয়োজন করা হয়েছে।
নবীজির জীবন থেকে শিক্ষা
ঈদে মিলাদুন্নবী পালনের মূল উদ্দেশ্য হচ্ছে নবীজির আদর্শ জীবন থেকে শিক্ষা নিয়ে নিজেদের জীবনকে সুন্দর করে গড়ে তোলা। তিনি ছিলেন সত্যবাদিতা, ন্যায়পরায়ণতা, দয়া ও ক্ষমার মূর্ত প্রতীক। তাঁর জীবনাদর্শ অনুসরণ করে আমরা আমাদের পারিবারিক, সামাজিক ও রাষ্ট্রীয় জীবনে শান্তি ও সমৃদ্ধি আনতে পারি।
ইসলামিক স্কলারদের মতামত
বিশিষ্ট ইসলামি পণ্ডিত আবদুল হক মুহাদ্দেসে দেহলভী (রহ.) তাঁর ‘মা সাবাতা মিনাসসুন্নাহ’ গ্রন্থে লিখেছেন: “লাইলাতুল কাদর, শবে বরাত, শবে মেরাজ এ সবই রাহমাতুল্লিল আলামীনকে দান করা হয়েছে। যাঁকে এত মর্যাদা দেওয়া হয়েছে, তাঁর আগমন দিবস যে কত লক্ষ-কোটি দিবসের চেয়ে উত্তম তাতে সন্দেহের অবকাশ নেই।”
বিশ্বব্যাপী উদযাপন
বাংলাদেশ ছাড়াও বিশ্বের অধিকাংশ মুসলিম দেশে ঈদে মিলাদুন্নবী পালিত হয়। পাকিস্তানে এই দিন ৩১ বন্দুকের স্যালুট দেওয়া হয়। ইন্দোনেশিয়ায় এর গুরুত্ব ঈদুল ফিতর ও ঈদুল আযহার মতোই। তুরস্কে একে ‘মেভলিদ কান্দিলি’ বলা হয়। ভারতের হায়দ্রাবাদে বিশাল শোভাযাত্রা ও ধর্মীয় সমাবেশের আয়োজন করা হয়।
আধুনিক যুগে ঈদে মিলাদুন্নবীর প্রাসঙ্গিকতা
আজকের অশান্ত বিশ্বে নবীজির শিক্ষা আরও বেশি প্রাসঙ্গিক। তিনি শিখিয়েছিলেন মানবিক মূল্যবোধ, ধর্মীয় সহনশীলতা, সামাজিক ন্যায়বিচার এবং পারস্পরিক ভ্রাতৃত্বের কথা। বিশ্বশান্তি প্রতিষ্ঠার জন্য তাঁর আদর্শ অনুসরণ অপরিহার্য।
করণীয় ও বর্জনীয়
এই পবিত্র দিনে মুসলমানদের উচিত অধিক ইবাদত-বন্দেগি করা, দরূদ শরীফ পাঠ করা, গরিব-দুঃখীদের সাহায্য করা এবং নবীজির সুন্নত অনুসরণের দৃঢ় অঙ্গীকার করা। একই সাথে সব ধরনের অপচয় ও অতিরঞ্জন থেকে বিরত থাকা প্রয়োজন।
উপসংহার
পবিত্র ঈদে মিলাদুন্নবী (সা.) কেবল একটি উৎসবের দিন নয়, বরং এটি আমাদের আত্মশুদ্ধি ও চরিত্র গঠনের দিন। এই দিনের মাধ্যমে আমরা নতুন করে নবীজির আদর্শে নিজেদের জীবন গড়ার অঙ্গীকার করি। আল্লাহ তা’আলা আমাদের সবাইকে নবীজির সত্যিকারের উম্মত হিসেবে কবুল করুন।
