নতুন বাজেটে কোন বিশ্ববিদ্যালয় কত বরাদ্দ পেল, শীর্ষে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়

দেশের ৫৮টি পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয় ও বিশ্ববিদ্যালয় মঞ্জুরি কমিশনের (ইউজিসি) জন্য আসছে ২০২৬-২৭ অর্থবছরে মোট ১২ হাজার ৩০০ কোটি ৪ লাখ টাকার বাজেট অনুমোদন দেওয়া হয়েছে। নতুন বাজেটে কোন বিশ্ববিদ্যালয় কত বরাদ্দ পেল—সেই হিসাব এখন শিক্ষার্থী, শিক্ষক ও অভিভাবক মহলে আলোচনার কেন্দ্রবিন্দুতে। এবারও সর্বোচ্চ রাজস্ব বরাদ্দ পেয়েছে দেশের শীর্ষ বিদ্যাপীঠ ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়।

গত ১১ জুন বৃহস্পতিবার ইউজিসির ১৮৭তম পূর্ণ কমিশন সভায় এই বাজেট চূড়ান্ত অনুমোদন পায়। মোট অনুমোদিত অর্থের মধ্যে ৫৮টি পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ের জন্য বরাদ্দ ধরা হয়েছে ১২ হাজার ১ কোটি ৮২ লাখ টাকা, আর ইউজিসির পরিচালন ব্যয়ের জন্য রাখা হয়েছে ২৯৮ কোটি ৫৮ লাখ টাকা। বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর মোট বাজেটের মধ্যে রাজস্ব ব্যয় ধরা হয়েছে ৭ হাজার ৪১২ কোটি ৪৩ লাখ টাকা এবং ৪৩টি চলমান উন্নয়ন প্রকল্পের জন্য বরাদ্দ রাখা হয়েছে ৪ হাজার ৫৭৩ কোটি ৩৯ লাখ টাকা।

চলতি ২০২৫-২৬ অর্থবছরে ৫৭টি পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ের সংশোধিত বাজেট ছিল ১০ হাজার ৮০২ কোটি ২১ লাখ টাকা। সেই হিসাবে আসছে অর্থবছরে বিশ্ববিদ্যালয় খাতে বরাদ্দ আগের তুলনায় উল্লেখযোগ্য পরিমাণে বেড়েছে। নতুন অর্থবছরে আরও একটি বিশ্ববিদ্যালয় যুক্ত হয়ে মোট প্রতিষ্ঠানের সংখ্যা দাঁড়িয়েছে ৫৮-এ।

সর্বোচ্চ বরাদ্দ পেল ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়

প্রতিবারের মতো এবারও সর্বোচ্চ রাজস্ব বাজেট পেয়েছে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়। প্রতিষ্ঠানটির জন্য বরাদ্দ রাখা হয়েছে ৯৪৯ কোটি ৩৬ লাখ টাকা। এরপর রয়েছে রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয় ৫৪৩ কোটি ৫৮ লাখ টাকা এবং চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয় ৫০৩ কোটি ৪৭ লাখ টাকা। জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের জন্য ধরা হয়েছে ৩৪৮ কোটি ৭০ লাখ টাকা, বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়ের (বুয়েট) জন্য ২৮০ কোটি ৪৭ লাখ টাকা এবং বাংলাদেশ কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ের জন্য বরাদ্দ ৩৫২ কোটি ১২ লাখ টাকা।

সাধারণ ও সমজাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ের চিত্র

সাধারণ ক্যাটাগরির বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর মধ্যে ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয় পাচ্ছে ১৮৮ কোটি ৪০ লাখ টাকা, খুলনা বিশ্ববিদ্যালয় ১৮২ কোটি ৯২ লাখ টাকা, জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয় ১৮৬ কোটি ৬০ লাখ টাকা, বরিশাল বিশ্ববিদ্যালয় ৬২ কোটি ৮৭ লাখ টাকা, কুমিল্লা বিশ্ববিদ্যালয় ৭৯ কোটি ৭২ লাখ টাকা এবং জাতীয় কবি কাজী নজরুল ইসলাম বিশ্ববিদ্যালয় ৭৫ কোটি ২০ লাখ টাকা। বেগম রোকেয়া বিশ্ববিদ্যালয় পাচ্ছে ৮২ কোটি ৮১ লাখ টাকা।

নতুন প্রতিষ্ঠিত বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর মধ্যে নেত্রকোণা বিশ্ববিদ্যালয় ১৪৭ কোটি ৪৭ লাখ টাকা, কিশোরগঞ্জ বিশ্ববিদ্যালয় ১১০ কোটি ৩৭ লাখ টাকা, নওগাঁ বিশ্ববিদ্যালয় ৯৭ কোটি ৬৪ লাখ টাকা, মেহেরপুর বিশ্ববিদ্যালয় ৮৬ কোটি ১৮ লাখ টাকা, ঠাকুরগাঁও বিশ্ববিদ্যালয় ৯১ কোটি ২০ লাখ টাকা এবং রবীন্দ্র বিশ্ববিদ্যালয় পাচ্ছে ২১১ কোটি ৬৯ লাখ টাকা। বাংলাদেশ ইউনিভার্সিটি অব প্রফেশনালসের (বিইউপি) জন্য বরাদ্দ ১৪৯ কোটি ৩৪ লাখ টাকা।

বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ে বরাদ্দ

বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি ক্যাটাগরির বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর মধ্যে সর্বোচ্চ বরাদ্দ পেয়েছে জামালপুর বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়—২১৯ কোটি ৪০ লাখ টাকা। শাহজালাল বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয় পাচ্ছে ১৮৬ কোটি ৬৬ লাখ টাকা, হাজী মোহাম্মদ দানেশ বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয় ১৩৩ কোটি ৪১ লাখ টাকা, মাওলানা ভাসানী বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয় ১১৫ কোটি ৭২ লাখ টাকা, পটুয়াখালী বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয় ১২১ কোটি ২৯ লাখ টাকা, নোয়াখালী বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয় ১১৮ কোটি ৩৪ লাখ টাকা এবং যশোর বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের জন্য ৯৮ কোটি ৭৯ লাখ টাকা।

এ ছাড়া পাবনা বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের জন্য ৬৮ কোটি ৫৪ লাখ টাকা, গোপালগঞ্জ বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের জন্য ৭৮ কোটি ৭৪ লাখ টাকা, রাঙ্গামাটি বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের জন্য ৪৮ কোটি ৫৩ লাখ, সুনামগঞ্জ বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের জন্য ৮৭ কোটি ৩২ লাখ, পিরোজপুর বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের জন্য ৯৬ কোটি ৭৫ লাখ, চাঁদপুর বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের জন্য ৬৫ কোটি ৯ লাখ এবং বগুড়া বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের জন্য ৭১ কোটি ৮৬ লাখ টাকা বরাদ্দ রাখা হয়েছে।

প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়ের বরাদ্দ

প্রকৌশল ধারার শীর্ষে রয়েছে বাংলাদেশ প্রকৌশল ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয় (বুয়েট), যার জন্য বরাদ্দ ২৮০ কোটি ৪৭ লাখ টাকা। এরপর খুলনা প্রকৌশল ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয় (কুয়েট) পাচ্ছে ১২৭ কোটি ৪৫ লাখ টাকা, চট্টগ্রাম প্রকৌশল ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয় (চুয়েট) ১১০ কোটি ৪০ লাখ, ঢাকা প্রকৌশল ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয় (ডুয়েট) ৯৭ কোটি ৬ লাখ এবং রাজশাহী প্রকৌশল ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয় (রুয়েট) পাচ্ছে ৯৬ কোটি ৩৩ লাখ টাকা।

কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ের বরাদ্দ

কৃষি শিক্ষা ও গবেষণার অন্যতম কেন্দ্র বাংলাদেশ কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ের জন্য বরাদ্দ রাখা হয়েছে ৩৫২ কোটি ১২ লাখ টাকা। খুলনা কৃষি বিশ্ববিদ্যালয় পাচ্ছে ৩০৭ কোটি ৫৬ লাখ টাকা, হবিগঞ্জ কৃষি বিশ্ববিদ্যালয় ১৭৫ কোটি ৭ লাখ, কুড়িগ্রাম কৃষি বিশ্ববিদ্যালয় ১৫৩ কোটি ১৫ লাখ, শেরে বাংলা কৃষি বিশ্ববিদ্যালয় ১৪২ কোটি ৮৯ লাখ, গাজীপুর কৃষি বিশ্ববিদ্যালয় ১০২ কোটি ৮২ লাখ এবং সিলেট কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ের জন্য ৮৯ কোটি ৮৩ লাখ টাকা।

মেডিকেল ও বিশেষায়িত বিশ্ববিদ্যালয়

চিকিৎসা শিক্ষার সর্বোচ্চ প্রতিষ্ঠান বাংলাদেশ মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয়ের জন্য বরাদ্দ রাখা হয়েছে ১৭৯ কোটি ২৫ লাখ টাকা। সদ্য প্রতিষ্ঠিত রাজশাহী মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয় পাচ্ছে ১৩ কোটি ৭৮ লাখ, চট্টগ্রাম মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয় ১৩ কোটি ৩৪ লাখ, খুলনা মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয় ৮ কোটি ১৮ লাখ এবং সিলেট মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয়ের জন্য ৬ কোটি ৩০ লাখ টাকা। অন্যদিকে বাংলাদেশ উন্মুক্ত বিশ্ববিদ্যালয়ের জন্য রাখা হয়েছে ২৭৩ কোটি ৩২ লাখ টাকা, যা দূরশিক্ষণ ক্যাটাগরিতে সর্বোচ্চ। জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ের জন্য বরাদ্দ ৪৮১ কোটি ৪৭ লাখ টাকা।

বিশেষায়িত বিশ্ববিদ্যালয়ের মধ্যে চট্টগ্রাম ভেটেরিনারি ও এনিমেল সাইন্সেস বিশ্ববিদ্যালয় পাচ্ছে ৬৮ কোটি ৩৬ লাখ, বাংলাদেশ টেক্সটাইল বিশ্ববিদ্যালয় ৬২ কোটি ৮৮ লাখ, বাংলাদেশ মেরিটাইম বিশ্ববিদ্যালয় ৫১ কোটি ৯৫ লাখ এবং ইসলামি আরবি বিশ্ববিদ্যালয়ের জন্য ১৩ কোটি ৩৫ লাখ টাকা।

গবেষণায় কেন্দ্রীভূত বরাদ্দ

এবারের বাজেটে একটি বড় পরিবর্তন এসেছে গবেষণা খাতে। অর্থ ব্যয়ে দ্বৈততা এড়াতে বিশ্ববিদ্যালয় ও ইউজিসির গবেষণা বাজেট একীভূত করা হয়েছে। ২০২৬ সালের ৪ এপ্রিল অনুষ্ঠিত মাধ্যমিক ও উচ্চ শিক্ষা বিভাগের মধ্যমেয়াদি বাজেট কাঠামো সংক্রান্ত ত্রিপক্ষীয় সভায় এ সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়। ফলে বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর গবেষণা খাতের ২০০ কোটি টাকা সরাসরি ইউজিসির বাজেটে অন্তর্ভুক্ত হয়েছে। এতে ইউজিসির গবেষণা খাতে মোট বরাদ্দ দাঁড়িয়েছে ২২৬ কোটি টাকা। বৈদেশিক স্কলারশিপ খাতের ১২ কোটি টাকা যোগ করলে ইউজিসির গবেষণা ও স্কলারশিপ মিলিয়ে মোট বরাদ্দ হচ্ছে ২৩৮ কোটি টাকা।

উন্নয়ন প্রকল্পে গুরুত্ব

আসছে অর্থবছরে পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর জন্য ৪৩টি উন্নয়ন প্রকল্পে মোট ৪ হাজার ৫৭৩ কোটি ৩৯ লাখ টাকা বরাদ্দ রাখা হয়েছে। এই অর্থ একাডেমিক ভবন নির্মাণ, ল্যাবরেটরি আধুনিকায়ন, ছাত্রাবাস, ডিজিটাল অবকাঠামো ও গবেষণা সক্ষমতা বাড়ানোর কাজে ব্যয় হবে বলে কমিশন সূত্রে জানা গেছে। দ্রুত বর্ধনশীল নতুন বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর অবকাঠামো প্রস্তুতে এই বরাদ্দ গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে।

শিক্ষার্থীদের জন্য কী বার্তা

মোটের ওপর নতুন বাজেট পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীদের জন্য কিছুটা স্বস্তির বার্তা নিয়ে এসেছে। তবে শিক্ষাবিদরা বরাবরের মতোই বলছেন, মোট বাজেটের তুলনায় গবেষণা খাতের বরাদ্দ এখনো কম। মানসম্পন্ন উচ্চশিক্ষা নিশ্চিত করতে গবেষণায় বরাদ্দ আরও বাড়ানো জরুরি। অন্যদিকে নতুন প্রতিষ্ঠিত বিশ্ববিদ্যালয়গুলো বরাদ্দ পাওয়ায় তাদের অবকাঠামো নির্মাণ ও শিক্ষক নিয়োগ প্রক্রিয়া ত্বরান্বিত হওয়ার সম্ভাবনা তৈরি হয়েছে।

শেষ কথা

২০২৬-২৭ অর্থবছরের এই বাজেট দেশের উচ্চশিক্ষা খাতের জন্য একটি গুরুত্বপূর্ণ দলিল হয়ে থাকছে। ১২ হাজার ৩০০ কোটি টাকার এই বরাদ্দ বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর পরিচালন ব্যয়, উন্নয়ন প্রকল্প ও গবেষণা কার্যক্রমকে নতুন গতি দেবে বলে আশা করা হচ্ছে। শিক্ষার্থী, শিক্ষক এবং সংশ্লিষ্ট সবার জন্য সবচেয়ে আগ্রহের বিষয় ছিল—নতুন বাজেটে কোন বিশ্ববিদ্যালয় কত বরাদ্দ পেল। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় শীর্ষে থাকলেও আঞ্চলিক ও নতুন বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর জন্যও যথেষ্ট অর্থ রাখার বিষয়টি ইতিবাচক। আগামী দিনে এই অর্থের সঠিক ব্যবহার নিশ্চিত হলে দেশের উচ্চশিক্ষা মান আরও এক ধাপ এগিয়ে যাবে—এটাই সবার প্রত্যাশা।

তাসনিম লাবু
তাসনিম লাবু
তাসনিম আক্তার লাবনি শিক্ষা ও ভর্তি সংক্রান্ত সংবাদ সহজভাবে উপস্থাপনের জন্য কাজ করেন। তিনি ইংরেজি বিষয়ে স্নাতকোত্তর সম্পন্ন করেছেন এবং জটিল নোটিশকে পরিষ্কার ভাষায় ব্যাখ্যা করতে দক্ষ। তিনি সবসময় তথ্যের নির্ভুলতা নিশ্চিত করতে অফিসিয়াল সার্কুলার ও বিশ্বস্ত উৎস যাচাই করেন। তার লেখার উদ্দেশ্য হলো শিক্ষার্থীদের বিভ্রান্তি কমানো।
রিলেটেড আরটিকেল

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here

- Advertisment -

জনপ্রিয় নিউজ