আন্তর্জাতিক সাক্ষরতা দিবস ২০২৪: বহুভাষিক শিক্ষার প্রসারে বাংলাদেশের অগ্রযাত্রা

আজ ৮ সেপ্টেম্বর বিশ্বব্যাপী পালিত হচ্ছে আন্তর্জাতিক সাক্ষরতা দিবস ২০২৪। বিশ্বের অন্যান্য দেশের মতো বাংলাদেশেও দিবসটি যথাযোগ্য মর্যাদায় জাতীয় ও স্থানীয় পর্যায়ে বিভিন্ন কর্মসূচির মাধ্যমে পালিত হচ্ছে। এবছর ইউনেস্কো নির্ধারিত প্রতিপাদ্য বিষয় হলো “বহু ভাষায় শিক্ষার প্রসার: পারস্পরিক সমঝোতা ও শান্তির জন্য সাক্ষরতা”।
আন্তর্জাতিক সাক্ষরতা দিবসের ইতিহাস ও তাৎপর্য

জাতিসংঘ শিক্ষা, বিজ্ঞান ও সংস্কৃতি সংস্থা (ইউনেস্কো) ১৯৬৫ খ্রিষ্টাব্দের ১৭ নভেম্বর ৮ সেপ্টেম্বরকে আন্তর্জাতিক সাক্ষরতা দিবস হিসেবে ঘোষণা করে। এর পরের বছর ১৯৬৬ খ্রিষ্টাব্দে বিশ্বে প্রথমবারের মতো দিবসটি উদযাপিত হয়। স্বাধীন বাংলাদেশে ১৯৭২ খ্রিষ্টাব্দে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের উদ্যোগে প্রথমবার এই দিবসটি পালিত হয়।

সাক্ষরতা দিবসের মূল উদ্দেশ্য হলো বিশ্বব্যাপী নিরক্ষরতা দূরীকরণ এবং সবার জন্য গুণগত শিক্ষার সুযোগ নিশ্চিত করা। এই দিবস প্রতি বছর বিশ্বের সরকার, শিক্ষা প্রতিষ্ঠান এবং উন্নয়ন সংস্থাগুলোকে সাক্ষরতা বৃদ্ধির গুরুত্ব সম্পর্কে সচেতনতা বাড়াতে অনুপ্রাণিত করে। দৈনিক শিক্ষা
বাংলাদেশে সাক্ষরতার বর্তমান অবস্থা

বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর সর্বশেষ প্রতিবেদন ‘বাংলাদেশ অর্থনৈতিক সমীক্ষা ২০২৪’ অনুযায়ী, দেশের সাত বছর ও তদূর্ধ্ব জনগোষ্ঠীর মধ্যে সাক্ষরতার হার ৭৭.৯ ভাগ। এর অর্থ হলো এখনও প্রায় ২২.১ ভাগ মানুষ নিরক্ষর রয়ে গেছে, যা প্রায় ৩ কোটি মানুষের সমান।

এই নিরক্ষর জনগোষ্ঠীর বড় একটি অংশ হলো বিদ্যালয়বহির্ভূত শিশু, ঝরে পড়া শিক্ষার্থী এবং শিক্ষা থেকে বঞ্চিত প্রাপ্তবয়স্ক নারী-পুরুষ। গত এক বছরে দেশে সাক্ষরতার হার বৃদ্ধিতে উল্লেখযোগ্য অগ্রগতি হয়নি, যা উদ্বেগের বিষয়। ইত্তেফাক
২০২৪ সালের প্রতিপাদ্য বিষয়ের গুরুত্ব

এবছরের প্রতিপাদ্য “বহু ভাষায় শিক্ষার প্রসার: পারস্পরিক সমঝোতা ও শান্তির জন্য সাক্ষরতা” বিশেষভাবে তাৎপর্যপূর্ণ। এই প্রতিপাদ্য বহুভাষিক শিক্ষার মাধ্যমে বিভিন্ন ভাষাভাষী মানুষের মধ্যে পারস্পরিক বোঝাপড়া এবং শান্তি প্রতিষ্ঠার গুরুত্বের ওপর আলোকপাত করে।

মাতৃভাষায় শিক্ষা শিশুদের জ্ঞানভিত্তিক বিকাশে অগ্রণী ভূমিকা পালন করে। একইসাথে দ্বিতীয় ভাষা হিসেবে ইংরেজি এবং অন্যান্য আন্তর্জাতিক ভাষা শেখার মাধ্যমে শিক্ষার্থীরা বিশ্বব্যাপী যোগাযোগে দক্ষ হয়ে উঠতে পারে।
প্রধান উপদেষ্টার দিকনির্দেশনা

আন্তর্জাতিক সাক্ষরতা দিবস উপলক্ষে বাণী দিয়েছেন প্রধান উপদেষ্টা অধ্যাপক ড. মুহাম্মদ ইউনূস। তিনি বলেন, “বর্তমান প্রতিযোগিতামূলক বিশ্বে টিকে থাকার জন্য কর্মমুখী ও দক্ষতাভিত্তিক শিক্ষার গুরুত্ব অপরিসীম।”

প্রধান উপদেষ্টা আরও জোর দিয়ে বলেন, “আমাদের শিক্ষা ব্যবস্থাকে এমনভাবে গড়ে তুলতে হবে, যেখানে প্রথাগত শিক্ষার পাশাপাশি ডিজিটাল দক্ষতা অর্জনের সুযোগ সবার জন্য উন্মুক্ত থাকবে। বিশেষ করে নারী, শিশু, প্রান্তিক জনগোষ্ঠী ও বিশেষ চাহিদাসম্পন্ন ব্যক্তিদের জন্য।”
ডিজিটাল যুগে সাক্ষরতার নতুন মাত্রা

আধুনিক যুগে সাক্ষরতার সংজ্ঞা শুধু পড়া-লেখা জানার মধ্যে সীমাবদ্ধ নেই। বর্তমানে ডিজিটাল সাক্ষরতা, আর্থিক সাক্ষরতা, এবং তথ্য প্রযুক্তির ব্যবহার জানাও সাক্ষরতার অংশ। বাংলাদেশে প্রযুক্তিভিত্তিক শিক্ষার প্রসার ঘটাতে হলে শিক্ষকদের ডিজিটাল প্রশিক্ষণ এবং শিক্ষার্থীদের হাতে প্রয়োজনীয় প্রযুক্তির সহজলভ্যতা নিশ্চিত করতে হবে।
বাংলাদেশে সাক্ষরতা বৃদ্ধির চ্যালেঞ্জ ও সমাধান

বাংলাদেশে নিরক্ষরতার প্রধান কারণগুলোর মধ্যে রয়েছে দারিদ্র্য, বাল্যবিবাহ, শিশুশ্রম, এবং সামাজিক কুসংস্কার। গ্রামাঞ্চলে অনেক পরিবার এখনও মনে করে যে মেয়েদের শিক্ষার প্রয়োজন নেই। এছাড়া অর্থনৈতিক অসচেতনতার কারণে অনেক শিশুকে কাজে পাঠিয়ে দেওয়া হয়।

এসব সমস্যা সমাধানে সরকারি উদ্যোগের পাশাপাশি সামাজিক সচেতনতা বাড়ানো প্রয়োজন। শিক্ষা উপবৃত্তি কর্মসূচি, বিনামূল্যে পাঠ্যপুস্তক বিতরণ, এবং মিড-ডে মিল কর্মসূচির মতো উদ্যোগ ইতিমধ্যে ইতিবাচক ফল দিচ্ছে।
বিশ্বব্যাপী সাক্ষরতা পরিস্থিতি

ইউনেস্কোর তথ্য অনুযায়ী, বিশ্বে এখনও ৭৭১ মিলিয়ন প্রাপ্তবয়স্ক মানুষ মৌলিক সাক্ষরতার অভাবে ভুগছে। এর মধ্যে দুই-তৃতীয়াংশই নারী। এশিয়া ও আফ্রিকার দেশগুলোতে এই সমস্যা বেশি প্রকট। তবে বাংলাদেশের মতো উন্নয়নশীল দেশগুলো সাক্ষরতা বৃদ্ধিতে উল্লেখযোগ্য অগ্রগতি অর্জন করেছে।
ভবিষ্যতের পথনির্দেশনা

টেকসই উন্নয়ন লক্ষ্য (এসডিজি-৪) অনুযায়ী ২০৩০ সালের মধ্যে সবার জন্য অন্তর্ভুক্তিমূলক ও গুণগত শিক্ষা নিশ্চিত করতে হবে। বাংলাদেশ এই লক্ষ্য অর্জনের জন্য জাতীয় শিক্ষানীতি ২০১০ বাস্তবায়নে কাজ করে যাচ্ছে।

কর্মমুখী শিক্ষা, বৃত্তিমূলক প্রশিক্ষণ, এবং উদ্যোক্তা উন্নয়ন কর্মসূচির মাধ্যমে সাক্ষরতা অর্জনকারীদের অর্থনৈতিক স্বাবলম্বী করে তোলা সম্ভব। এজন্য সরকারি-বেসরকারি অংশীদারিত্ব এবং আন্তর্জাতিক সহযোগিতা অপরিহার্য।
উপসংহার

আন্তর্জাতিক সাক্ষরতা দিবস ২০২৪ আমাদের স্মরণ করিয়ে দেয় যে সাক্ষরতা শুধু একটি দক্ষতা নয়, এটি মানবাধিকার এবং সামাজিক উন্নয়নের মূল চালিকাশক্তি। বহুভাষিক শিক্ষার প্রসার এবং প্রযুক্তিভিত্তিক সাক্ষরতা কার্যক্রমের মাধ্যমে বাংলাদেশ নিরক্ষরমুক্ত দেশ গঠনের স্বপ্ন বাস্তবায়ন করতে পারে।

সমাজের প্রতিটি স্তরের মানুষের সম্মিলিত প্রচেষ্টায় আমরা একটি শিক্ষিত ও দক্ষ বাংলাদেশ গড়ে তুলতে পারি, যেখানে জ্ঞানের আলোয় আলোকিত হবে প্রতিটি ঘর এবং পারস্পরিক সমঝোতা ও শান্তির মাধ্যমে প্রতিষ্ঠিত হবে একটি উন্নত সমাজ।

ইকরাম শেখ
ইকরাম শেখ
ইকরাম শেখ শিক্ষা খাতের বিভিন্ন আপডেট নিয়ে লেখালেখি করেন। তিনি সমাজবিজ্ঞান বিষয়ে স্নাতক সম্পন্ন করেছেন এবং তথ্য সংগ্রহ ও বিশ্লেষণে আগ্রহী। নতুন কোনো ভর্তি বা ফলাফল সংক্রান্ত তথ্য প্রকাশের আগে তিনি সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের প্রকাশিত নোটিশ যাচাই করেন। তিনি নির্ভরযোগ্য ও সময়োপযোগী তথ্য তুলে ধরতে সচেষ্ট।
রিলেটেড আরটিকেল

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here

- Advertisment -

জনপ্রিয় নিউজ