এইচএসসিতে কোন বোর্ডে পাসের হার কত ২০২৫ – সম্পূর্ণ তথ্য এক নজরে

২০২৫ সালের এইচএসসি পরীক্ষার ফলাফল আজ প্রকাশিত হয়েছে এবং দেশজুড়ে লাখো শিক্ষার্থী ও তাদের অভিভাবকরা উদগ্রীব হয়ে জানতে চাইছেন কোন বোর্ডে পাসের হার কত হয়েছে। এবছর বৃহস্পতিবার (১৬ অক্টোবর) সকাল ১০টায় সারাদেশের সব শিক্ষা বোর্ডের ফলাফল একযোগে প্রকাশ করা হয়। চলুন বিস্তারিতভাবে জেনে নিই প্রতিটি বোর্ডের পাসের হার এবং এবছরের ফলাফলের গুরুত্বপূর্ণ তথ্য।

২০২৫ সালের এইচএসসি পরীক্ষার সামগ্রিক চিত্র

বাংলাদেশ আন্তঃশিক্ষা বোর্ড সমন্বয় কমিটির সভাপতি অধ্যাপক ড. খন্দোকার এহসানুল হক রাজধানীর বকশীবাজারে ঢাকা শিক্ষা বোর্ডে ব্রিফিং করে ফলাফল ঘোষণা করেছেন। এবার দেশের ১১টি শিক্ষা বোর্ডে গড় পাসের হার দাঁড়িয়েছে ৫৮.৮৩ শতাংশ, যা গতবারের তুলনায় প্রায় ১৯ শতাংশ কম। ২০২৪ সালের এইচএসসি পরীক্ষায় পাসের হার ছিল ৭৭.৭৮ শতাংশ।

এবছর মোট ১২ লাখ ৫১ হাজার ১১১ জন শিক্ষার্থী পরীক্ষায় অংশগ্রহণ করেছে, যার মধ্যে ছাত্র ছিল ৬ লাখ ১৮ হাজার ১৫ জন এবং ছাত্রী ৬ লাখ ৩৩ হাজার ৯৬ জন। সারাদেশের ২ হাজার ৭৯৭টি পরীক্ষা কেন্দ্রে এই পরীক্ষা অনুষ্ঠিত হয়েছে।

প্রতিটি বোর্ডের পাসের হার বিস্তারিত

ঢাকা শিক্ষা বোর্ড এবছর সবচেয়ে ভালো ফলাফল করেছে ৬৪.৬২ শতাংশ পাসের হার নিয়ে। এই বোর্ডে মোট ২ লাখ ৯১ হাজার ২৪১ জন শিক্ষার্থী পরীক্ষা দিয়েছে। রাজধানী ঢাকাসহ আশেপাশের জেলাগুলোর শিক্ষার্থীরা এই বোর্ডের অধীনে পরীক্ষা দিয়ে থাকে।

রাজশাহী শিক্ষা বোর্ড উত্তরবঙ্গের অন্যতম প্রধান বোর্ড হিসেবে ৫৯.৪০ শতাংশ পাসের হার অর্জন করেছে। এই বোর্ডে ১ লাখ ৩৩ হাজার ২৪২ জন পরীক্ষার্থী অংশ নিয়েছে। রাজশাহী অঞ্চলের শিক্ষার মান সবসময়ই প্রশংসিত এবং এবছরও তারা ভালো ফল করেছে।

কুমিল্লা শিক্ষা বোর্ড এবছর ৪৮.৮৬ শতাংশ পাসের হার নিয়ে তুলনামূলক কম ফলাফল করেছে। ১ লাখ ১ হাজার ৭৫০ জন শিক্ষার্থী এই বোর্ডে পরীক্ষা দিয়েছে। পূর্ববঙ্গের কুমিল্লা অঞ্চলের শিক্ষার্থীদের জন্য এটি একটি গুরুত্বপূর্ণ বোর্ড।

যশোর শিক্ষা বোর্ড দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের শিক্ষার্থীদের জন্য ৫০.২০ শতাংশ পাসের হার অর্জন করেছে। এই বোর্ডে মোট ১ লাখ ১৬ হাজার ৩১৭ জন পরীক্ষার্থী অংশগ্রহণ করেছে। যশোর, খুলনা ও আশেপাশের অঞ্চলের শিক্ষার্থীরা এই বোর্ডের অধীনে পরীক্ষা দেয়।

চট্টগ্রাম শিক্ষা বোর্ড বন্দর নগরীর বোর্ড হিসেবে ৫২.৫৭ শতাংশ পাসের হার নিয়ে মধ্যম অবস্থানে রয়েছে। এই বোর্ডে ১ লাখ ৩৫ জন পরীক্ষার্থী পরীক্ষা দিয়েছে। চট্টগ্রাম ও পার্বত্য অঞ্চলের শিক্ষার্থীরা এই বোর্ডের অধীনে থাকে।

বরিশাল শিক্ষা বোর্ড দক্ষিণাঞ্চলের প্রধান বোর্ড হিসেবে চমৎকার ফলাফল করেছে ৬২.৫৭ শতাংশ পাসের হার নিয়ে। এই বোর্ডে ৬১ হাজার ২৫ জন শিক্ষার্থী অংশ নিয়েছে। উপকূলীয় অঞ্চলের শিক্ষার্থীরা এই বোর্ডে পরীক্ষা দিয়ে থাকে।

সিলেট শিক্ষা বোর্ড পূর্বাঞ্চলের শিক্ষার্থীদের জন্য ৫১.৮৬ শতাংশ পাসের হার অর্জন করেছে। এই বোর্ডে ৬৯ হাজার ৬৮৩ জন পরীক্ষার্থী পরীক্ষা দিয়েছে। সিলেট বিভাগের চা বাগান অঞ্চলসহ বিভিন্ন এলাকার শিক্ষার্থীরা এখানে পরীক্ষা দেয়।

দিনাজপুর শিক্ষা বোর্ড উত্তরবঙ্গের আরেকটি প্রধান বোর্ড হিসেবে ৫৭.৪৯ শতাংশ পাসের হার নিয়ে ভালো ফল করেছে। ১ লাখ ৩ হাজার ৮৩২ জন শিক্ষার্থী এই বোর্ডে অংশগ্রহণ করেছে। রংপুর বিভাগের শিক্ষার্থীরা প্রধানত এই বোর্ডের অধীনে পরীক্ষা দেয়।

ময়মনসিংহ শিক্ষা বোর্ড দেশের নতুন বোর্ডগুলোর মধ্যে অন্যতম এবং ৫১.৫৪ শতাংশ পাসের হার অর্জন করেছে। এই বোর্ডে ৭৮ হাজার ২৭৩ জন পরীক্ষার্থী পরীক্ষা দিয়েছে। ময়মনসিংহ বিভাগের শিক্ষার্থীরা এই বোর্ডে পরীক্ষা দিয়ে থাকে।

মাদরাসা শিক্ষা বোর্ড এবছর সবচেয়ে উজ্জ্বল ফলাফল করেছে ৭৫.৬১ শতাংশ পাসের হার নিয়ে। ৮৬ হাজার ১০২ জন আলিম পরীক্ষার্থী এই বোর্ডে অংশ নিয়েছে। দেশজুড়ে মাদরাসা শিক্ষায় শিক্ষিত শিক্ষার্থীরা এই বোর্ডের অধীনে পরীক্ষা দেয় এবং তাদের ধারাবাহিক সফলতা প্রশংসনীয়।

কারিগরি শিক্ষা বোর্ড প্রযুক্তিগত শিক্ষার ক্ষেত্রে ৬২.৬৭ শতাংশ পাসের হার অর্জন করেছে। ১ লাখ ৯ হাজার ৬১১ জন পরীক্ষার্থী এই বোর্ডে পরীক্ষা দিয়েছে। দেশের পলিটেকনিক ইনস্টিটিউট এবং টেকনিক্যাল স্কুলের শিক্ষার্থীরা এই বোর্ডের অধীনে থাকে।

জিপিএ-৫ প্রাপ্তদের সংখ্যা

এবছর মোট ৬৯ হাজার ৯৭ জন শিক্ষার্থী জিপিএ-৫ পেয়েছে, যা গতবারের তুলনায় উল্লেখযোগ্য কম। ২০২৪ সালে জিপিএ-৫ প্রাপ্তদের সংখ্যা ছিল ১ লাখ ৪৫ হাজার ৯১১ জন। এই হ্রাসের কারণ হিসেবে অনেক শিক্ষা বিশেষজ্ঞ বলছেন যে এবছরের প্রশ্নপত্র তুলনামূলক কঠিন ছিল এবং মূল্যায়ন পদ্ধতি আরও কঠোর ছিল।

পরীক্ষা কখন হয়েছিল

এবছরের এইচএসসি ও সমমান পরীক্ষার লিখিত অংশ গত ১৯ আগস্ট শেষ হয়েছে। এরপর ২১ থেকে ৩১ আগস্ট পর্যন্ত ব্যবহারিক পরীক্ষা অনুষ্ঠিত হয়। পরীক্ষা শেষ হওয়ার প্রায় দুই মাসের মধ্যে ফলাফল প্রকাশ করা হয়েছে, যা শিক্ষা বোর্ডগুলোর দক্ষতার প্রমাণ।

কীভাবে ফলাফল দেখবেন

শিক্ষার্থীরা বিভিন্ন মাধ্যমে তাদের এইচএসসি ফলাফল জানতে পারবেন। সবচেয়ে সহজ উপায় হলো শিক্ষা বোর্ডের অফিসিয়াল ওয়েবসাইট www.educationboardresults.gov.bd ভিজিট করা। এখানে রোল নম্বর, রেজিস্ট্রেশন নম্বর এবং বোর্ডের নাম দিয়ে খুব সহজেই ফলাফল দেখা যায়।

এছাড়াও মোবাইল ফোনের মাধ্যমে এসএমএস করেও ফল জানা যাবে। এজন্য নির্ধারিত শর্ট কোড ১৬২২২ নম্বরে নির্দিষ্ট ফরম্যাটে এসএমএস পাঠাতে হবে। শিক্ষা প্রতিষ্ঠানগুলোও তাদের EIIN নম্বর ব্যবহার করে প্রতিষ্ঠানের সকল শিক্ষার্থীর ফলাফল একসাথে ডাউনলোড করতে পারবে।

পুনঃনিরীক্ষণের আবেদন প্রক্রিয়া

যেসব শিক্ষার্থী তাদের ফলাফল নিয়ে সন্তুষ্ট নন এবং পুনঃনিরীক্ষণ করাতে চান, তাদের জন্য সুযোগ রয়েছে। আগামী ১৭ অক্টোবর থেকে ২৩ অক্টোবর পর্যন্ত https://rescrutiny.eduboardresults.gov.bd ওয়েবসাইটের মাধ্যমে পুনঃনিরীক্ষণের আবেদন গ্রহণ করা হবে। বিস্তারিত আবেদন পদ্ধতি শিক্ষা বোর্ডগুলোর ওয়েবসাইটে এবং পত্রিকায় বিজ্ঞপ্তির মাধ্যমে জানানো হবে।

পাসের হার কমার সম্ভাব্য কারণ

এবছর পাসের হার উল্লেখযোগ্যভাবে কমে যাওয়ার পেছনে বেশ কিছু কারণ থাকতে পারে। শিক্ষা বিশেষজ্ঞরা মনে করেন যে করোনা পরবর্তী শিক্ষা ব্যবস্থার স্বাভাবিকীকরণ প্রক্রিয়ায় মূল্যায়ন পদ্ধতি আরও মানসম্মত এবং কঠোর করা হয়েছে। এছাড়া প্রশ্নপত্র তৈরিতে আরও গভীর জ্ঞান যাচাইয়ের চেষ্টা করা হয়েছে, যা শিক্ষার্থীদের জন্য চ্যালেঞ্জিং ছিল।

অনেক শিক্ষক মনে করেন যে শিক্ষার্থীরা কোচিং নির্ভরতা থেকে বের হয়ে মূল পাঠ্যবই এবং গভীর পড়াশোনার দিকে বেশি মনোযোগী হলে ভবিষ্যতে আরও ভালো ফলাফল করতে পারবে। শিক্ষার্থীদের মৌলিক বিষয়গুলো ভালোভাবে বুঝে পড়াশোনা করা উচিত।

শিক্ষার্থী ও অভিভাবকদের জন্য পরামর্শ

যেসব শিক্ষার্থী এইচএসসি পরীক্ষায় পাস করেছে, তাদের জন্য এখন উচ্চশিক্ষার পথ খোলা রয়েছে। বিশ্ববিদ্যালয় ভর্তি পরীক্ষার প্রস্তুতি এখন থেকেই শুরু করা উচিত। যারা কাঙ্ক্ষিত ফলাফল পায়নি, তাদের হতাশ না হয়ে পুনঃনিরীক্ষণের সুযোগ নেওয়া উচিত।

অভিভাবকদের উচিত সন্তানদের পাশে থাকা এবং তাদের মানসিক সাহস জোগানো। মনে রাখতে হবে যে একটি পরীক্ষার ফলাফল জীবনের শেষ কথা নয়। ধৈর্য, পরিশ্রম এবং সঠিক পরিকল্পনার মাধ্যমে যেকোনো শিক্ষার্থী তার লক্ষ্যে পৌঁছাতে পারে।

ভবিষ্যৎ পরিকল্পনা

এইচএসসি পাসের পর শিক্ষার্থীদের সামনে বিভিন্ন পথ খোলা থাকে। কেউ চিকিৎসা শাস্ত্র, কেউ প্রকৌশল বিদ্যা, কেউ বিজ্ঞান, কেউ মানবিক বা ব্যবসায় শিক্ষায় উচ্চশিক্ষা নিতে পারেন। বর্তমান যুগে প্রযুক্তিগত শিক্ষা এবং দক্ষতা উন্নয়নের ওপর বিশেষ গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে। শিক্ষার্থীদের উচিত নিজের আগ্রহ এবং সামর্থ্য অনুযায়ী বিষয় নির্বাচন করা।

যারা উচ্চশিক্ষায় যেতে চান না, তাদের জন্যও বিভিন্ন কারিগরি প্রশিক্ষণ এবং স্বল্প মেয়াদী কোর্সের সুযোগ রয়েছে। সরকার এবং বিভিন্ন বেসরকারি প্রতিষ্ঠান দক্ষতা উন্নয়ন কর্মসূচি পরিচালনা করছে, যা শিক্ষার্থীদের কর্মসংস্থানের পথ সুগম করতে পারে।

শেষ কথা

২০২৫ সালের এইচএসসি পরীক্ষার ফলাফল প্রকাশিত হয়েছে এবং লাখো শিক্ষার্থীর ভাগ্য নির্ধারিত হয়েছে। বিভিন্ন শিক্ষা বোর্ডের পাসের হার বিশ্লেষণ করলে দেখা যায় যে মাদরাসা শিক্ষা বোর্ড সবচেয়ে ভালো ফলাফল করেছে এবং ঢাকা শিক্ষা বোর্ড সাধারণ বোর্ডগুলোর মধ্যে শীর্ষে রয়েছে।

যদিও গতবারের তুলনায় পাসের হার কমেছে, তবুও যারা পাস করেছে তাদের জন্য এটি একটি গুরুত্বপূর্ণ অর্জন। প্রতিটি শিক্ষার্থীর উচিত ভবিষ্যতের জন্য পরিকল্পনা করা এবং নিজের লক্ষ্য অর্জনে মনোনিবেশ করা। শিক্ষা জীবনের একটি ধাপ মাত্র, এর পরেও অনেক সুযোগ এবং সম্ভাবনা অপেক্ষা করছে।

আমরা সকল শিক্ষার্থীকে তাদের ফলাফলের জন্য অভিনন্দন জানাই এবং ভবিষ্যৎ জীবনে সফলতা কামনা করি। শিক্ষার পথে এগিয়ে যাওয়াই হোক সবার লক্ষ্য।

শাকিল আহম্মেদ
শাকিল আহম্মেদhttps://porasonablog.com
মোঃ শাকিল আহাম্মেদ শিক্ষা বিষয়ক সংবাদ নিয়ে নিয়মিত কাজ করছেন এবং ভর্তি, রেজাল্ট ও বিভিন্ন পরীক্ষার আপডেট সংগ্রহ ও যাচাই করেন। তিনি অর্থনীতি বিষয়ে স্নাতক সম্পন্ন করেছেন। তথ্য প্রকাশের আগে তিনি সংশ্লিষ্ট শিক্ষা বোর্ড, বিশ্ববিদ্যালয়ের অফিসিয়াল নোটিশ ও নির্ভরযোগ্য সূত্র মিলিয়ে দেখেন। শিক্ষার্থীদের জন্য দ্রুত ও নির্ভুল তথ্য পৌঁছে দেওয়াই তার প্রধান লক্ষ্য।
রিলেটেড আরটিকেল

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here

- Advertisment -

জনপ্রিয় নিউজ