১৮ বছরের শিক্ষকতার অভিজ্ঞতা ছাড়া প্রতিষ্ঠানপ্রধান নয় — শিক্ষামন্ত্রীর কড়া নির্দেশনা আসছে

বেসরকারি স্কুল-কলেজ, কারিগরি ও মাদ্রাসা শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে প্রতিষ্ঠানপ্রধান বা সহকারী প্রধান পদে নিয়োগ পেতে হলে এখন থেকে ন্যূনতম ১৮ বছরের শিক্ষকতার অভিজ্ঞতা বাধ্যতামূলক হতে যাচ্ছে। শিক্ষামন্ত্রী ড. আ ন ম এহছানুল হক মিলন এ বিষয়ে কড়া নির্দেশনা দিয়েছেন এবং বেসরকারি শিক্ষক নিবন্ধন ও প্রত্যয়ন কর্তৃপক্ষ (এনটিআরসিএ)-কে দু-একদিনের মধ্যেই সংশোধিত বিজ্ঞপ্তি প্রকাশ করতে বলা হয়েছে। শিক্ষা মন্ত্রণালয় সূত্রে জানা গেছে, মঙ্গলবার (৩ মার্চ) এ বিষয়ে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নেওয়া হতে পারে।

সহজ করে বললে — এতদিন কম অভিজ্ঞতা থাকলেও অনেকে প্রধান শিক্ষক বা অধ্যক্ষ পদে আবেদন করতে পারতেন। কিন্তু এখন থেকে সেই সুযোগ বন্ধ হয়ে যাচ্ছে। ১৮ বছরের কম শিক্ষকতার অভিজ্ঞতা থাকলে কেউ আর কলেজের অধ্যক্ষ, উপাধ্যক্ষ, হাইস্কুলের প্রধান শিক্ষক বা সহকারী প্রধান শিক্ষক পদে আবেদন করতে পারবেন না। একই নিয়ম মাদ্রাসার সুপারিনটেনডেন্ট বা প্রধান পদের জন্যও কার্যকর হবে বলে জানা গেছে।

সোমবার শিক্ষামন্ত্রী ড. মিলন এনটিআরসিএর কর্মকর্তাদের নিজ দপ্তরে ডেকে এই নির্দেশনা দেন। মন্ত্রী স্পষ্ট জানিয়ে দেন, দীর্ঘ অভিজ্ঞতাসম্পন্ন ও যোগ্য শিক্ষকদের নেতৃত্বে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের মানোন্নয়ন নিশ্চিত করতেই এই সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। একইসঙ্গে মন্ত্রী সহকারী অধ্যাপক ও সিনিয়র শিক্ষক ক্যাটাগরির ‘অপশন’ বাতিল করতে বলেছেন, যাতে আবেদনের যোগ্যতা নিয়ে কোনো বিভ্রান্তি বা বিশেষ সুবিধা নেওয়ার সুযোগ না থাকে।

এই সিদ্ধান্তের পটভূমিতে আছে একটি বিতর্কিত ঘটনা। জানা গেছে, সদ্য অপসারিত মাধ্যমিক ও উচ্চশিক্ষা সচিব রেহানা পারভীনের নেতৃত্বে প্রণীত আগের নীতিমালায় অধ্যক্ষ পদে মাত্র ১৫ বছর এবং উপাধ্যক্ষ পদে মাত্র ১২ বছরের শিক্ষকতার অভিজ্ঞতার শর্ত রাখা হয়েছিল। শিক্ষক সংগঠনগুলোর অভিযোগ ছিল, এসব শর্ত এমনভাবে সাজানো হয়েছিল যাতে নির্দিষ্ট সময়কালে নিযুক্ত শিক্ষকরাই বেশি সুবিধা পান। সেই বিতর্কের পরিপ্রেক্ষিতেই শিক্ষামন্ত্রী নতুন ও কঠোর শর্ত নির্ধারণের উদ্যোগ নিয়েছেন।

বিভিন্ন পদের জন্য শিক্ষকতার অভিজ্ঞতার শর্ত একটু ভিন্ন। নিম্ন-মাধ্যমিক বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক পদে আবেদন করতে হলে স্নাতক ডিগ্রির সঙ্গে বিএড ডিগ্রি এবং ন্যূনতম ১০ বছরের এমপিওভুক্ত শিক্ষকতার অভিজ্ঞতা লাগবে। মাধ্যমিক বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক পদের জন্য সহকারী প্রধান শিক্ষক হিসেবে ন্যূনতম ৩ বছরের অভিজ্ঞতাসহ মোট ১৫ বছরের শিক্ষকতার অভিজ্ঞতা থাকতে হবে। তবে সিনিয়র শিক্ষক হিসেবে ৩ বছরের অভিজ্ঞতাসহ মোট ১৭ বছরের অভিজ্ঞতা থাকলেও আবেদন করা যাবে। আর কলেজের উপাধ্যক্ষ পদে আবেদনের জন্য স্নাতকোত্তর ডিগ্রি এবং সহকারী অধ্যাপক হিসেবে ৩ বছরের অভিজ্ঞতাসহ মোট ১২ বছরের শিক্ষকতার অভিজ্ঞতার শর্ত প্রস্তাব করা হয়েছিল — তবে নতুন নির্দেশনায় তা বাড়িয়ে ১৮ বছর করা হচ্ছে।

কারিগরি ও মাদ্রাসা শিক্ষা বিভাগের সচিব মুহাম্মদ রফিকুল ইসলাম জানিয়েছেন, “বিষয়টি এখনো চূড়ান্ত হয়নি। মঙ্গলবার (৩ মার্চ) এ বিষয়ে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নেওয়া হতে পারে।” এর মানে হলো, শিক্ষা মন্ত্রণালয় এখনো আলোচনা করছে এবং যেকোনো সময় আনুষ্ঠানিক ঘোষণা আসতে পারে।

বেসরকারি শিক্ষক সমিতির নেতা নজরুল ইসলাম এ প্রসঙ্গে বলেন, “এনটিআরসিএ একটি স্বায়ত্তশাসিত নিয়োগ সুপারিশকারী প্রতিষ্ঠান। তারা চাইলে শিক্ষামন্ত্রীর মতামত নিয়েই যোগ্যতা নির্ধারণ করতে পারতেন। কিন্তু কেরানীনির্ভর ব্যাখ্যার ওপর ভিত্তি করে শর্ত নির্ধারণ করায় বিতর্ক তৈরি হয়েছে।” তিনি আরও জানান, এমপিও নীতিমালায় বারবার নতুন শর্ত যুক্ত করায় শিক্ষক সমাজে অসন্তোষ দেখা দিচ্ছে।

শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের একজন কর্মকর্তা জানান, “প্রতিষ্ঠান পরিচালনা শুধু প্রশাসনিক কাজ নয়। এতে একাডেমিক দিকনির্দেশনা, মানবসম্পদ ব্যবস্থাপনা ও আর্থিক স্বচ্ছতা নিশ্চিত করার দক্ষতা দরকার। দীর্ঘ অভিজ্ঞতা এ ক্ষেত্রে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।” তবে একটি অংশের শিক্ষকেরা মনে করছেন, ১৮ বছরের শর্ত মেধাবী তরুণ শিক্ষকদের জন্য পথ সংকুচিত করে দিতে পারে এবং পদোন্নতির গতি ধীর হয়ে যাবে।

উল্লেখ্য, এবারই প্রথম এনটিআরসিএর মাধ্যমে বেসরকারি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের প্রধান ও সহকারী প্রধান পদে নিয়োগ প্রক্রিয়া চলছে। ইতিমধ্যে ১৩ হাজার ৫৯৯টি শূন্য পদের বিপরীতে ৮০ হাজারেরও বেশি শিক্ষক আবেদন করেছেন। ঈদুল ফিতরের পর এই নিয়োগ পরীক্ষা অনুষ্ঠিত হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে বলে সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে।

এই নতুন শর্ত কার্যকর হলে আগের নীতিমালার ভিত্তিতে প্রস্তুতি নেওয়া অনেক শিক্ষককে নতুন করে পরিকল্পনা করতে হবে। শিক্ষক মহলে এখন মূল প্রশ্ন একটাই — এই নতুন শর্ত কি সত্যিই শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের মান বাড়াবে, নাকি পদোন্নতির সুযোগ সীমিত করে নতুন বিতর্কের জন্ম দেবে? শিক্ষা প্রশাসনে স্বচ্ছতা ও মেধার ভারসাম্য রক্ষা করাই এখন সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।

নিলয় আহমেদ
নিলয় আহমেদ
নিলয় আহম্মেদ শিক্ষা বিষয়ক প্রতিবেদক। তিনি বাংলা বিষয়ে স্নাতকোত্তর সম্পন্ন করেছেন। পরীক্ষা, ভর্তি ও শিক্ষানীতি সংক্রান্ত তথ্য নিয়ে কাজ করেন। তথ্য যাচাই করে সংক্ষিপ্ত ও পরিষ্কারভাবে উপস্থাপন করাই তার প্রধান দায়িত্ব।
রিলেটেড আরটিকেল

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here

- Advertisment -

জনপ্রিয় নিউজ