বাংলাদেশে চিকিৎসা খাতে ক্যারিয়ার গড়তে চান? তাহলে আপনার জন্য রয়েছে চমৎকার সুযোগ। ইনস্টিটিউট অব হেলথ টেকনোলজি (আইএইচটি) এবং মেডিক্যাল অ্যাসিস্ট্যান্ট ট্রেনিং স্কুলে (ম্যাটস) ২০২৫ সালের ভর্তি প্রক্রিয়া শুরু হয়েছে। এবারে মোট ৩ হাজার ৪৩টি আসনে শিক্ষার্থী ভর্তির সুযোগ রয়েছে, যা স্বাস্থ্য সেবা খাতে আগ্রহী তরুণ প্রজন্মের জন্য একটি সুবর্ণ সুযোগ।
কোন কোন কোর্সে ভর্তির সুযোগ রয়েছে?
এবারের ভর্তি প্রক্রিয়ায় দুটি গুরুত্বপূর্ণ কোর্সে আবেদন করার সুযোগ রয়েছে। প্রথমটি হলো ডিপ্লোমা ইন মেডিক্যাল টেকনোলজি যা চার বছর মেয়াদি একটি কোর্স। এই কোর্সটি আইএইচটিতে পড়ানো হয় এবং এখানে আধুনিক চিকিৎসা প্রযুক্তির বিভিন্ন বিষয় শেখানো হয়। দ্বিতীয়টি হলো ডিপ্লোমা ইন মেডিক্যাল অ্যাসিস্ট্যান্ট ট্রেনিং যা ম্যাটসে পড়ানো হয় এবং এটিও চার বছরের কোর্স।
সারাদেশের ৯টি আইএইচটিতে মোট ২ হাজার ৩৭৯টি আসন রয়েছে। অন্যদিকে ৭টি ম্যাটসে রয়েছে ৬৬৪টি আসন। এই দুই মিলিয়ে মোট আসন সংখ্যা দাঁড়িয়েছে ৩ হাজার ৪ৃটি, যা বিগত বছরগুলোর তুলনায় একটি উল্লেখযোগ্য সংখ্যা।
কারা আবেদন করতে পারবেন?
আইএইচটি ও ম্যাটসে ভর্তির জন্য কিছু নির্দিষ্ট যোগ্যতা প্রয়োজন। সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ শর্ত হলো আপনাকে ২০২১ থেকে ২০২৫ সালের মধ্যে এসএসসি বা সমমানের পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হতে হবে। এর মানে হলো আপনি যদি এই সময়ের মধ্যে এসএসসি পাশ করে থাকেন, তাহলে আবেদন করতে পারবেন।
আরও একটি গুরুত্বপূর্ণ শর্ত হলো আপনাকে অবশ্যই বিজ্ঞান বিভাগ থেকে এসএসসি পাশ করতে হবে এবং ন্যূনতম জিপিএ ৩.০০ পেতে হবে। জীববিজ্ঞান বিষয়টি আপনার এসএসসিতে থাকতেই হবে এবং জীববিজ্ঞানে কমপক্ষে জিপিএ ২.০০ থাকতে হবে। এই শর্তগুলো মূলত এজন্য রাখা হয়েছে যে, চিকিৎসা প্রযুক্তির কাজে বিজ্ঞান ও জীববিজ্ঞানের ভালো ভিত্তি প্রয়োজন।
বিদেশি সিলেবাসে পড়া শিক্ষার্থীরাও আবেদন করতে পারবেন। যদি আপনি ও লেভেল এবং এ লেভেল পাশ করে থাকেন, তাহলে প্রথমে আপনার সমমানের সনদপত্র বা Equivalence Certificate সংগ্রহ করতে হবে। এটি বাংলাদেশের শিক্ষা বোর্ড থেকে নিতে হয় যেখানে আপনার বিদেশি গ্রেডগুলো বাংলাদেশি জিপিএতে রূপান্তরিত করা হয়।
পরীক্ষার বিস্তারিত তথ্য
ভর্তি পরীক্ষার ফি মাত্র ৭০০ টাকা। এই টাকা আপনাকে টেলিটক প্রিপেইড নম্বর ব্যবহার করে প্রদান করতে হবে। অনেক পারিবারিক আর্থিক অবস্থার কথা বিবেচনা করে এই ফি বেশ সাশ্রয়ী রাখা হয়েছে।
ভর্তি পরীক্ষা হবে এমসিকিউ পদ্ধতিতে এবং মোট ১০০ নম্বরের। পরীক্ষার সময় থাকবে মাত্র এক ঘণ্টা, যার মানে আপনাকে দ্রুত এবং নির্ভুলভাবে উত্তর দিতে হবে। পাশ নম্বর নির্ধারণ করা হয়েছে ৪০, অর্থাৎ ১০০ নম্বরের মধ্যে কমপক্ষে ৪০ নম্বর পেতে হবে।
পরীক্ষায় মোট সাতটি বিষয় থাকবে। বাংলা, ইংরেজি, গণিত, পদার্থবিজ্ঞান, রসায়ন এবং জীববিজ্ঞান – এই ছয়টি বিষয়ে প্রতিটিতে ১৫ নম্বর করে মোট ৯০ নম্বর। আর সাধারণ জ্ঞানে থাকবে ১০ নম্বর। সব প্রশ্ন হবে এসএসসি সিলেবাস অনুযায়ী, তাই আপনার এসএসসির পড়া ভালো করে রিভিশন দিলেই যথেষ্ট।
কিভাবে প্রার্থী নির্বাচিত হবেন?
প্রার্থী নির্বাচনের পদ্ধতিটি বেশ আকর্ষণীয়। শুধু ভর্তি পরীক্ষার নম্বর দিয়েই নয়, বরং আপনার এসএসসির রেজাল্টও বিবেচনা করা হবে। ভর্তি পরীক্ষায় পাওয়া ১০০ নম্বরের সাথে এসএসসির জিপিএ থেকে অতিরিক্ত নম্বর যোগ করা হবে। এসএসসির জিপিএ ৫.০০ কে দ্বিগুণ করে মোট ১০ নম্বর পর্যন্ত যোগ করা হবে।
উদাহরণস্বরূপ, যদি আপনার এসএসসিতে জিপিএ ৪.৫০ থাকে, তাহলে ৪.৫০ × ২ = ৯ নম্বর অতিরিক্ত পাবেন। আর যদি জিপিএ ৫.০০ থাকে, তাহলে পূর্ণ ১০ নম্বর অতিরিক্ত পাবেন। এই সম্মিলিত নম্বরের ভিত্তিতে জাতীয় মেধাতালিকা প্রস্তুত করে প্রার্থী নির্বাচন করা হবে। উল্লেখ্য যে, কোনো মৌখিক পরীক্ষা অনুষ্ঠিত হবে না।
গুরুত্বপূর্ণ তারিখসমূহ
অনলাইন আবেদন ইতিমধ্যে শুরু হয়ে গেছে ১৪ আগস্ট ২০২৫ থেকে। আপনি ২৭ আগস্ট ২০২৫ রাত ১১.৫৯ পর্যন্ত আবেদন করতে পারবেন। পরীক্ষার ফি জমা দেওয়ার সময় আরেকদিন বেশি, অর্থাৎ ২৮ আগস্ট ২০২৫ রাত ১১.৫৯ পর্যন্ত।
প্রবেশপত্র ডাউনলোড করতে পারবেন ১৪ থেকে ১৬ সেপ্টেম্বর ২০২৫ পর্যন্ত। আর প্রকৃত পরীক্ষা অনুষ্ঠিত হবে ১৯ সেপ্টেম্বর ২০২৫ শুক্রবার সকাল ১০টা থেকে ১১টা পর্যন্ত। এই সময়সূচি মেনে চলা খুবই গুরুত্বপূর্ণ, কারণ নির্ধারিত সময়ের পরে কোনো আবেদন বা ফি জমা গ্রহণ করা হবে না।
কোথা থেকে বিস্তারিত জানবেন?
আইএইচটি ও ম্যাটস ভর্তি সংক্রান্ত সকল তথ্য পাবেন সরকারি ওয়েবসাইটগুলোতে। স্বাস্থ্য শিক্ষা ও পরিবার কল্যাণ বিভাগের ওয়েবসাইট www.mefwd.gov.bd, স্বাস্থ্য শিক্ষা অধিদপ্তরের ওয়েবসাইট www.dgme.gov.bd থেকে নিয়মিত আপডেট পাবেন। এছাড়া টেলিটকের বিশেষ ওয়েবসাইট http://dgme.teletalk.com.bd থেকে অনলাইন আবেদন এবং ফি প্রদান করতে পারবেন।
কেন এই কোর্সগুলো গুরুত্বপূর্ণ?
চিকিৎসা প্রযুক্তি বর্তমান যুগের একটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ এবং সম্ভাবনাময় ক্ষেত্র। হাসপাতাল, ক্লিনিক, ডায়াগনস্টিক সেন্টার থেকে শুরু করে গবেষণাগার পর্যন্ত সব জায়গায় দক্ষ মেডিক্যাল টেকনোলজিস্ট ও মেডিক্যাল অ্যাসিস্ট্যান্টের চাহিদা রয়েছে। এই কোর্স সম্পন্ন করার পর আপনি সরকারি ও বেসরকারি উভয় খাতে কাজের সুযোগ পাবেন।
বাংলাদেশে স্বাস্থ্যসেবার মান ক্রমাগত উন্নতি হচ্ছে এবং আধুনিক চিকিৎসা যন্ত্রপাতির ব্যবহার বাড়ছে। এই পরিস্থিতিতে প্রশিক্ষিত স্বাস্থ্যকর্মীর চাহিদা দিন দিন বাড়ছে। আইএইচটি ও ম্যাটস থেকে পাশ করা শিক্ষার্থীরা এই ক্রমবর্ধমান চাহিদা মেটাতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করতে পারবেন।
প্রস্তুতির জন্য পরামর্শ
ভর্তি পরীক্ষার প্রস্তুতির জন্য আপনার এসএসসির সিলেবাস ভালো করে পড়ুন। বিশেষ করে বিজ্ঞানের বিষয়গুলো যেমন পদার্থবিজ্ঞান, রসায়ন এবং জীববিজ্ঞানে বেশি গুরুত্ব দিন। বাংলা ও ইংরেজি ব্যাকরণ এবং গণিতের মূল নীতিগুলো রিভিশন দিন। সাধারণ জ্ঞানের জন্য সাম্প্রতিক ঘটনা, বাংলাদেশের ইতিহাস, ভূগোল এবং বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিষয়ক তথ্য পড়ুন।
মনে রাখবেন, সময় ব্যবস্থাপনা খুবই গুরুত্বপূর্ণ। এক ঘণ্টায় ১০০টি প্রশ্নের উত্তর দিতে হবে, মানে প্রতি প্রশ্নে গড়ে ৩৬ সেকেন্ড সময় পাবেন। তাই দ্রুত ও নির্ভুলভাবে উত্তর দেওয়ার অনুশীলন করুন।
শেষ কথা
আইএইচটি ও ম্যাটসে ভর্তি বাংলাদেশের স্বাস্থ্য সেবা খাতে ক্যারিয়ার গড়ার একটি দুর্দান্ত সুযোগ। ৩ হাজারের বেশি আসন নিয়ে এবারের এই ভর্তি প্রক্রিয়া অনেক শিক্ষার্থীর স্বপ্ন পূরণের পথ দেখাবে। সময়মতো আবেদন করুন, ভালো প্রস্তুতি নিন এবং আত্মবিশ্বাসের সাথে পরীক্ষায় অংশগ্রহণ করুন। সফলতা আপনার অপেক্ষায় রয়েছে।
