আজ রাতেই আকাশে ঘটতে চলেছে এক অসাধারণ মহাজাগতিক ঘটনা – পূর্ণগ্রাস চন্দ্রগ্রহণ। ঢাকাসহ সমগ্র বাংলাদেশ থেকে এই বিরল দৃশ্য খালি চোখে দেখা যাবে। বিজ্ঞানীরা জানিয়েছেন, এটি ২০২৫ সালের শেষ চন্দ্রগ্রহণ এবং আবহাওয়া পরিষ্কার থাকলে পুরো দেশ থেকেই এই অভূতপূর্ব দৃশ্য উপভোগ করা সম্ভব হবে।
ঢাকায় চন্দ্রগ্রহণের সম্পূর্ণ সময়সূচি
ঢাকা সময় অনুসারে আজ ৭ সেপ্টেম্বর রবিবার রাত থেকে শুরু হয়ে আগামীকাল ৮ সেপ্টেম্বর সোমবার ভোর পর্যন্ত চলবে এই চন্দ্রগ্রহণ। এখানে রয়েছে বিস্তারিত সময়সূচি:
পেনুম্ব্রাল গ্রহণ শুরু হবে রাত ৯টা ২৮ মিনিট ২৫ সেকেন্ডে। এই পর্যায়ে চাঁদের উজ্জ্বলতা কিছুটা কমে যেতে শুরু করবে। তারপর আংশিক চন্দ্রগ্রহণ শুরু হবে রাত ১০টা ২৭ মিনিট ০৯ সেকেন্ডে। এই সময় চাঁদের একাংশ পৃথিবীর ছায়ায় ঢুকে পড়বে।
সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ মুহূর্ত হবে রাত ১১টা ৩০ মিনিট ৪৮ সেকেন্ডে, যখন পূর্ণ চন্দ্রগ্রহণ শুরু হবে। সর্বোচ্চ গ্রহণ দেখা যাবে রাত ১২টা ১১ মিনিট ৪৭ সেকেন্ডে। এই সময়ই চাঁদ সবচেয়ে বেশি লাল রং ধারণ করবে।
পূর্ণ চন্দ্রগ্রহণ শেষ হবে রাত ১২টা ৫২ মিনিট ৫১ সেকেন্ডে। আংশিক গ্রহণ শেষ হবে রাত ১টা ৫৬ মিনিট ৩১ সেকেন্ডে। সবশেষে পেনুম্ব্রাল চন্দ্রগ্রহণ শেষ হবে রাত ২টা ৫৫ মিনিট ৮ সেকেন্ডে।
কেন চাঁদ লাল রং ধারণ করে? বৈজ্ঞানিক ব্যাখ্যা
অনেকেই জানতে চান, পূর্ণগ্রাস চন্দ্রগ্রহণের সময় চাঁদ কেন লাল রং ধারণ করে। এর পেছনে রয়েছে চমৎকার বৈজ্ঞানিক কারণ। চাঁদের নিজস্ব কোনো আলো নেই। সূর্যের আলো চাঁদে পড়ে এবং সেই আলো পৃথিবীতে প্রতিফলিত হয়ে আমরা চাঁদকে দেখতে পাই।
চন্দ্রগ্রহণের সময় চাঁদ এবং সূর্যের মাঝখানে পৃথিবী চলে আসে। ফলে সূর্যের সরাসরি আলো চাঁদে পৌঁছায় না। বদলে পৃথিবীর ছায়া পড়ে চাঁদের উপরে। তবে চাঁদ সম্পূর্ণ কালো হয়ে যায় না। এর কারণ হলো আলোর প্রতিসরণ।
পৃথিবীর বায়ুমণ্ডল যখন সূর্যের আলো গ্রহণ করে, তখন সূর্যরশ্মির লাল অংশ কম পরিমাণে প্রতিসরিত হয় এবং তা চাঁদের উপরে গিয়ে পড়ে। অন্যদিকে, সূর্যরশ্মির নীল অংশ চারদিকে ছড়িয়ে ছিটিয়ে পড়ে। এই কারণেই গ্রহণের সময় চাঁদকে গাঢ় লালচে দেখা যায়। এজন্যই একে ‘রক্ত চাঁদ’ বা ‘ব্লাড মুন’ বলা হয়।
ঢাকায় কোথায় দেখা যাবে চন্দ্রগ্রহণ
ঢাকার যেকোনো খোলা জায়গা থেকেই এই চন্দ্রগ্রহণ দেখা সম্ভব। তবে শহরের আলো কম এমন স্থান থেকে দেখলে আরও পরিষ্কার দেখা যাবে। ছাদ, পার্ক, খেলার মাঠ বা যেকোনো উঁচু স্থান থেকে চন্দ্রগ্রহণ উপভোগ করা যাবে।
বিশেষভাবে চন্দ্রগ্রহণ পর্যবেক্ষণ করতে চাইলে, কলাবাগান ক্রীড়া চক্রের সহযোগিতায় বাংলাদেশ অ্যাস্ট্রোনমিক্যাল এসোসিয়েশন একটি বিনামূল্যে পর্যবেক্ষণ ক্যাম্পের আয়োজন করেছে। এই ক্যাম্পে অংশগ্রহণের জন্য কোনো রেজিস্ট্রেশন ফি লাগবে না এবং আগে আসার ভিত্তিতে অংশগ্রহণ করা যাবে।
চন্দ্রগ্রহণ দেখার নিয়ম ও সতর্কতা
চন্দ্রগ্রহণ দেখা সম্পূর্ণ নিরাপদ। সূর্যগ্রহণের মতো এক্ষেত্রে বিশেষ কোনো চশমা বা ফিল্টারের প্রয়োজন নেই। খালি চোখেই চন্দ্রগ্রহণ দেখা যায় এবং এতে চোখের কোনো ক্ষতি হয় না। কারণ চাঁদ থেকে কোনো ক্ষতিকর রশ্মি নির্গত হয় না – এটি কেবল সূর্যের আলো প্রতিফলিত করে।
তবে দীর্ঘসময় ধরে চাঁদের দিকে তাকিয়ে থাকলে চোখে চাপ পড়তে পারে। তাই মাঝে মাঝে বিশ্রাম নিয়ে গ্রহণ উপভোগ করা ভালো। দূরবীন বা টেলিস্কোপ ব্যবহার করলে আরও স্পষ্ট এবং বিস্তারিত দেখা যাবে।
কেন এই চন্দ্রগ্রহণ বিশেষ?
এই পূর্ণগ্রাস চন্দ্রগ্রহণকে ‘সুপার ব্লাড মুন’ নামে আখ্যায়িত করা হয়েছে। আকারে এটি সাধারণ সময়ের চাঁদের থেকে সাত শতাংশ বড় এবং উজ্জ্বলতায় পনেরো শতাংশ বেশি হবে। এছাড়া এটি ২০২৫ সালের শেষ চন্দ্রগ্রহণ, যা এর গুরুত্ব আরও বাড়িয়ে দিয়েছে।
মোট সাত ঘণ্টা ২৭ মিনিট স্থায়ী হবে এই গ্রহণ। এশিয়া, অস্ট্রেলিয়া এবং আফ্রিকার বিভিন্ন অংশ থেকে এই চন্দ্রগ্রহণ দেখা যাবে। বাংলাদেশ এমন একটি অবস্থানে রয়েছে যেখান থেকে সম্পূর্ণ গ্রহণ প্রক্রিয়া শুরু থেকে শেষ পর্যন্ত দেখা সম্ভব।
চন্দ্রগ্রহণ সম্পর্কে গুরুত্বপূর্ণ তথ্য
চন্দ্রগ্রহণ একটি সম্পূর্ণ প্রাকৃতিক ঘটনা। এর সাথে কোনো অশুভ বা ক্ষতিকর প্রভাব জড়িত নেই। বিজ্ঞানের দৃষ্টিতে এটি একটি জ্যোতির্বৈজ্ঞানিক ঘটনা মাত্র। গর্ভবতী মহিলারা চন্দ্রগ্রহণ দেখতে পারেন এবং এতে কোনো সমস্যা নেই। খাওয়াদাওয়া স্বাভাবিকভাবে করা যায়।
ফটোগ্রাফি করতে চাইলে ক্যামেরার সেটিংস ঠিকমতো করে নিতে হবে। ম্যানুয়াল মোডে ISO বাড়িয়ে এবং শাটার স্পিড কমিয়ে ভালো ছবি তোলা সম্ভব।
উপসংহার
আজকের এই পূর্ণগ্রাস চন্দ্রগ্রহণ ঢাকাবাসীর জন্য একটি বিরল সুযোগ। রাত ১১টা ৩০ মিনিট থেকে রাত ১২টা ৫২ মিনিট পর্যন্ত পূর্ণ চন্দ্রগ্রহণ দেখা যাবে। এই সময়ে চাঁদ রক্তের মতো লাল রং ধারণ করবে এবং একটি অভূতপূর্ব দৃশ্যের জন্ম দেবে।
আকাশ মেঘমুক্ত থাকলে ঢাকার যেকোনো খোলা স্থান থেকেই এই দৃশ্য উপভোগ করা যাবে। পরিবার ও বন্ধুদের সাথে মিলে এই প্রাকৃতিক বিস্ময় দেখার এমন সুযোগ হয়তো আর শীঘ্রই আসবে না।
