আগামী অর্থবছরের বাজেট হতে পারে সোয়া ৮ লাখ কোটি টাকার: জেনে নিন সম্পূর্ণ বিস্তারিত

বাংলাদেশের ২০২৬-২৭ অর্থবছরের বাজেট নিয়ে ইতিমধ্যে প্রস্তুতি শুরু হয়ে গেছে। আগামী ১২ ফেব্রুয়ারি ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন অনুষ্ঠিত হওয়ার পর নতুন সরকার মাত্র সাড়ে তিন মাস সময় পাবে বাজেট তৈরি করতে। এই সীমিত সময়ের কথা মাথায় রেখে অন্তর্বর্তী সরকার ইতিমধ্যে বাজেটের রূপরেখা তৈরির কাজ শুরু করে দিয়েছে। সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, এবারের জাতীয় বাজেট (National Budget) হতে পারে সোয়া আট লাখ কোটি টাকার।

তিনটি বিকল্প বাজেট: কোনটি চূড়ান্ত হবে?

অর্থ বিভাগ তিনটি ভিন্ন দৃষ্টিকোণ থেকে বাজেটের আকার নির্ধারণের সুযোগ রাখছে। প্রথমটি হলো ব্যয় সাশ্রয়ী বাজেট (Austerity Budget), যার আকার হবে সোয়া আট লাখ কোটি টাকা। দ্বিতীয়টি হলো রাজনৈতিক উচ্চাকাঙ্ক্ষা বিবেচনায় বাজেট, যার আকার দাঁড়াতে পারে সাড়ে আট লাখ কোটি টাকা। আর তৃতীয় বিকল্পটি হলো মাঝামাঝি অবস্থান থেকে তৈরি বাজেট, যার আকার পৌনে ৯ লাখ কোটি টাকা পর্যন্ত হতে পারে।

অর্থ মন্ত্রণালয় (Ministry of Finance) এবং জাতীয় রাজস্ব বোর্ড (NBR – National Board of Revenue) ইতিমধ্যে ২০২৫ সালের শুরু থেকেই নতুন বাজেট প্রণয়নের কাজ শুরু করেছে। আগামী ফেব্রুয়ারি মাস থেকে বিভিন্ন স্টেকহোল্ডারদের সাথে বৈঠক শুরু হবে এবং তাদের সুপারিশ বাজেটে অন্তর্ভুক্ত করা হবে।

আগামী বাজেটের তিনটি সম্ভাব্য রূপরেখা

বাজেটের ধরন সম্ভাব্য আকার মূল বৈশিষ্ট্য
ব্যয় সাশ্রয়ী বাজেট ৮.২৫ লাখ কোটি টাকা মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণ ও অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতায় জোর
রাজনৈতিক বাজেট ৮.৭৫ লাখ কোটি টাকা কর্মসংস্থান ও প্রবৃদ্ধি বৃদ্ধিতে গুরুত্ব
মাঝামাঝি বাজেট ৮.৫০ লাখ কোটি টাকা ব্যয় সাশ্রয় ও প্রবৃদ্ধির ভারসাম্য

প্রধান উপদেষ্টা ড. ইউনূসের গুরুত্বপূর্ণ নির্দেশনা

প্রধান উপদেষ্টা ড. মুহাম্মদ ইউনূস বাজেট প্রণয়নে বেশ কিছু গুরুত্বপূর্ণ দিকনির্দেশনা দিয়েছেন। তিনি বলেছেন, দেশের নিজস্ব অর্থায়ন বৃদ্ধি করতে হবে এবং অপ্রয়োজনীয় বৈদেশিক ঋণ (Foreign Loan) এড়াতে হবে। এটি দেশের অর্থনৈতিক স্বাধীনতা রক্ষার জন্য অত্যন্ত জরুরি।

শিক্ষার গুণগত মান (Quality Education) বৃদ্ধির ওপর বিশেষ জোর দিয়েছেন প্রধান উপদেষ্টা। তিনি বলেছেন, গত কয়েক বছরে শিক্ষার পরিমাণ বাড়লেও মান কমে গেছে। তাই আগামী শিক্ষা বাজেটে (Education Budget) কোয়ালিটির ওপর বেশি মনোযোগ দিতে হবে। এছাড়া পল্লী উন্নয়ন, কৃষক সহায়তা, তরুণ জনগোষ্ঠী এবং নারী ক্ষমতায়নের ওপরও গুরুত্ব দেওয়ার নির্দেশনা দিয়েছেন তিনি।

এডিপির আকার কত হবে?

আগামী বাজেটে বার্ষিক উন্নয়ন কর্মসূচি (ADP – Annual Development Programme) এর সম্ভাব্য আকার ধরা হয়েছে আড়াই লাখ কোটি টাকা। তবে মূল বাজেটের আকার পরিবর্তন হলে এডিপিও সেই অনুপাতে সমন্বয় করা হবে। চলতি ২০২৫-২৬ অর্থবছরের সংশোধিত এডিপির আকার ২ লাখ কোটি টাকায় নামিয়ে আনা হয়েছে, কারণ অনেক উন্নয়ন প্রকল্প (Development Project) যথাসময়ে বাস্তবায়ন করা যায়নি।

মূল্যস্ফীতি ও জিডিপি প্রবৃদ্ধির লক্ষ্য

অর্থ মন্ত্রণালয় আগামী ২০২৬-২৭ অর্থবছরে ৬ শতাংশ মূল্যস্ফীতি (Inflation Rate) এবং ৬ শতাংশ জিডিপি প্রবৃদ্ধি (GDP Growth) প্রাক্কলন করেছে। বর্তমানে মূল্যস্ফীতি দুই অঙ্ক থেকে নেমে এলেও সাধারণ মানুষের কাছে স্বস্তি ফিরে আসেনি। দ্রব্যমূল্যের ঊর্ধ্বগতি এখনও একটি বড় চ্যালেঞ্জ।

চলতি ২০২৫-২৬ অর্থবছরে জিডিপি প্রবৃদ্ধির প্রাক্কলন সাড়ে ৫ শতাংশ থেকে কমিয়ে ৫ শতাংশ করা হয়েছে। দেশে কাক্সিক্ষত হারে বিনিয়োগ না হওয়ায় এই সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। দেশি-বিদেশি বিনিয়োগ (Investment) বৃদ্ধি করা এখন সবচেয়ে বড় প্রয়োজন।

অর্থনীতির বর্তমান চিত্র: চ্যালেঞ্জ ও সম্ভাবনা

অর্থনৈতিক সূচক বর্তমান অবস্থা ভবিষ্যৎ লক্ষ্য
রপ্তানি আয় কিছুটা চাপের মুখে বৈচিত্র্যকরণ ও বৃদ্ধি
রেমিট্যান্স ইতিবাচক ধারা অব্যাহত রিজার্ভ শক্তিশালীকরণ
বিনিয়োগ এক বছরের বেশি সময় ধরে মন্থর দেশি-বিদেশি বিনিয়োগ বৃদ্ধি
মূল্যস্ফীতি দুই অঙ্ক থেকে নেমে এসেছে ৬ শতাংশে নিয়ে আসা

ব্যয় সংকোচন নীতি: কতটা কার্যকর?

ব্যয় সংকোচন নীতি (Expenditure Contraction Policy) অনুসরণ করায় গত ২০২৪-২৫ অর্থবছরে সরকারের পাঁচ হাজার ৬৮৯ কোটি টাকা সাশ্রয় হয়েছে। অর্থ উপদেষ্টা ড. সালেহউদ্দিন আহমেদ আর্থিক, মুদ্রা ও মুদ্রা বিনিময় হার সংক্রান্ত কো-অর্ডিনেশন কাউন্সিলের বৈঠকে এই নীতি চলমান রাখার পক্ষে মত দিয়েছেন।

চলতি ২০২৫-২৬ অর্থবছরেও উল্লেখযোগ্য অঙ্কের সাশ্রয় হবে বলে আশা করছে অর্থ বিভাগ। এই বছর বাজেটের আকার কমিয়ে ধরা হয়েছে এবং জরুরি প্রয়োজন ছাড়া উন্নয়ন-অনুন্নয়ন উভয় খাতের ব্যয়ের লাগাম টেনে ধরা হয়েছে। আর্থিক খাতের দুরবস্থা ও বৈশ্বিক চ্যালেঞ্জের কারণে আরও অন্তত এক বছর এই নীতি অব্যাহত রাখার পরিকল্পনা রয়েছে।

চলতি বাজেটের সংশোধন

চলতি ২০২৫-২৬ অর্থবছরের বাজেটের আকার সাত লাখ ৯০ হাজার কোটি টাকা। প্রথমে এই বাজেট কাটছাঁট করে সাত লাখ ৭০ হাজার কোটি টাকায় নামিয়ে আনার চিন্তা ছিল। কিন্তু সুদ পরিশোধ, ভর্তুকি খাতে ব্যয় বৃদ্ধি, ব্যাংক একীভূতকরণে মূলধন সহায়তা এবং সরকারি চাকরিজীবীদের বিভিন্ন ভাতা বাড়ানোর কারণে বড় ধরনের কাটছাঁট সম্ভব হয়নি।

ইতিমধ্যে দুই হাজার কোটি টাকা কমিয়ে সংশোধিত বাজেটের আকার নির্ধারণ করা হয়েছে সাত লাখ ৮৮ হাজার কোটি টাকা। অন্যদিকে সংশোধিত বাজেটে বার্ষিক উন্নয়ন কর্মসূচির আকার কমানো হয়েছে ৩০ হাজার কোটি টাকা। প্রকল্প বাস্তবায়িত না হওয়ায় প্রতিবারের মতো এবারও এই কাটছাঁটের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।

রপ্তানি ও রেমিট্যান্স: অর্থনীতির দুই স্তম্ভ

বাংলাদেশের অর্থনীতির প্রধান চালিকাশক্তি রপ্তানি আয় (Export Earnings) এখন কিছুটা চাপের মুখে রয়েছে। বৈশ্বিক অর্থনৈতিক মন্দা ও ক্রেতাদের চাহিদা হ্রাসের কারণে রপ্তানিতে প্রত্যাশিত প্রবৃদ্ধি অর্জন করা কঠিন হয়ে পড়েছে। তবে আশার কথা হলো, রেমিট্যান্স আয়ে (Remittance Income) ইতিবাচক ধারা অব্যাহত থাকায় স্বস্তি ফিরে এসেছে বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভে (Foreign Exchange Reserve)।

প্রবাসী বাংলাদেশিরা দেশে নিয়মিত অর্থ পাঠাচ্ছেন, যা দেশের অর্থনীতিকে সচল রাখতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করছে। তবে দীর্ঘমেয়াদী অর্থনৈতিক উন্নয়নের জন্য রপ্তানি বৈচিত্র্যকরণ এবং নতুন বাজার খোঁজা জরুরি।

সংস্কার কমিশনের সুপারিশ বাস্তবায়ন

আগামী বাজেট বক্তৃতায় (Budget Speech) বিভিন্ন খাতে নেওয়া সংস্কার কমিশন ও কমিটিগুলোর সুপারিশ বাস্তবায়নের কথা থাকবে। দেশের বিভিন্ন সেক্টরে দুর্নীতি কমানো, স্বচ্ছতা বৃদ্ধি এবং সুশাসন প্রতিষ্ঠার জন্য এসব সংস্কার অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। প্রাতিষ্ঠানিক সংস্কার ছাড়া শুধু বাজেট বৃদ্ধি করে টেকসই উন্নয়ন সম্ভব নয়।

শিক্ষার্থীদের জন্য কী আছে বাজেটে?

শিক্ষার্থী ও তরুণদের জন্য আগামী বাজেটে বিশেষ গুরুত্ব দেওয়া হবে বলে জানা গেছে। শিক্ষা খাতে বরাদ্দ বৃদ্ধির পাশাপাশি শিক্ষার মান উন্নয়নে পদক্ষেপ নেওয়া হবে। বৃত্তি কর্মসূচি (Scholarship Programme), দক্ষতা উন্নয়ন (Skill Development), এবং কর্মসংস্থান সৃষ্টিতে (Employment Generation) জোর দেওয়া হবে। প্রধান উপদেষ্টা তরুণদের প্রতি বিশেষ ফোকাস রাখার নির্দেশনা দিয়েছেন, কারণ বাংলাদেশের তরুণ জনগোষ্ঠী দেশের সবচেয়ে বড় সম্পদ।

প্রায়শই জিজ্ঞাসিত প্রশ্নাবলী (FAQ)

১. ২০২৬-২৭ অর্থবছরের বাজেটের আকার কত হবে?

আগামী অর্থবছরের বাজেটের আকার হতে পারে সোয়া আট লাখ কোটি টাকা থেকে পৌনে ৯ লাখ কোটি টাকা। তিনটি বিকল্প বিবেচনা করা হচ্ছে: ব্যয় সাশ্রয়ী বাজেট (৮.২৫ লাখ কোটি), মাঝামাঝি বাজেট (৮.৫০ লাখ কোটি), এবং রাজনৈতিক বাজেট (৮.৭৫ লাখ কোটি টাকা)।

২. বাজেট কবে ঘোষণা করা হবে?

১২ ফেব্রুয়ারি ২০২৬ নির্বাচনের পর নতুন সরকার গঠিত হলে তারা চূড়ান্ত বাজেট প্রণয়ন করবে। সাধারণত জুন মাসের প্রথম সপ্তাহে জাতীয় বাজেট ঘোষণা করা হয়।

৩. শিক্ষা খাতে কতটুকু বরাদ্দ বাড়বে?

প্রধান উপদেষ্টা ড. ইউনূস শিক্ষার গুণগত মান বৃদ্ধির ওপর বিশেষ জোর দিয়েছেন। শিক্ষা বাজেট বৃদ্ধির পাশাপাশি কোয়ালিটি এডুকেশন নিশ্চিত করার ওপর মনোযোগ দেওয়া হবে। সুনির্দিষ্ট পরিমাণ চূড়ান্ত বাজেটে ঘোষণা করা হবে।

৪. এডিপি কী এবং এর আকার কত হবে?

এডিপি বা বার্ষিক উন্নয়ন কর্মসূচি হলো সরকারের বছরওয়ারি উন্নয়ন প্রকল্পের জন্য বরাদ্দকৃত অর্থ। আগামী অর্থবছরে এডিপির আকার হতে পারে আড়াই লাখ কোটি টাকা। তবে মূল বাজেটের আকার পরিবর্তন হলে এটিও সমন্বয় করা হবে।

৫. মূল্যস্ফীতি কমানোর জন্য কী পদক্ষেপ নেওয়া হবে?

সরকার আগামী অর্থবছরে মূল্যস্ফীতি ৬ শতাংশে নিয়ে আসার লক্ষ্য নির্ধারণ করেছে। ব্যয় সংকোচন নীতি অব্যাহত রাখা, অপ্রয়োজনীয় খরচ কমানো, এবং বাজার মনিটরিং জোরদার করা হবে।

৬. ব্যয় সংকোচন নীতি কী এবং কেন এটি গুরুত্বপূর্ণ?

ব্যয় সংকোচন নীতি হলো সরকারি খরচ কমিয়ে অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতা আনার একটি কৌশল। গত বছর এই নীতি অনুসরণ করে ৫,৬৮৯ কোটি টাকা সাশ্রয় হয়েছে। মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণ ও বৈদেশিক ঋণের চাপ কমাতে এটি অত্যন্ত জরুরি।

৭. তরুণদের জন্য বাজেটে কী কী সুবিধা থাকবে?

প্রধান উপদেষ্টা তরুণদের প্রতি বিশেষ ফোকাস রাখার নির্দেশনা দিয়েছেন। কর্মসংস্থান সৃষ্টি, দক্ষতা উন্নয়ন প্রশিক্ষণ, উদ্যোক্তা উন্নয়ন, এবং তথ্যপ্রযুক্তি খাতে বিনিয়োগ বৃদ্ধির পরিকল্পনা রয়েছে। বাংলাদেশের তরুণ জনগোষ্ঠী দেশের সবচেয়ে বড় সম্পদ।

৮. কৃষক ও গ্রামীণ জনগণের জন্য কী ব্যবস্থা থাকবে?

পল্লী উন্নয়ন ও কৃষক সহায়তা বৃদ্ধির ওপর গুরুত্ব দেওয়া হবে। কৃষি ভর্তুকি, সে█

ইকরাম শেখ
ইকরাম শেখ
ইকরাম শেখ শিক্ষা খাতের বিভিন্ন আপডেট নিয়ে লেখালেখি করেন। তিনি সমাজবিজ্ঞান বিষয়ে স্নাতক সম্পন্ন করেছেন এবং তথ্য সংগ্রহ ও বিশ্লেষণে আগ্রহী। নতুন কোনো ভর্তি বা ফলাফল সংক্রান্ত তথ্য প্রকাশের আগে তিনি সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের প্রকাশিত নোটিশ যাচাই করেন। তিনি নির্ভরযোগ্য ও সময়োপযোগী তথ্য তুলে ধরতে সচেষ্ট।
রিলেটেড আরটিকেল

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here

- Advertisment -

জনপ্রিয় নিউজ