ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের কেন্দ্রীয় ছাত্র সংসদ (ডাকসু) নির্বাচনে চাঞ্চল্যকর ফলাফল বেরিয়েছে। ১৬টি হলের ভোট গণনা শেষে সহসভাপতি (ভিপি) পদে ইসলামী ছাত্রশিবিরের সমর্থিত সাদিক কায়েম এবং বাংলাদেশ ছাত্রদলের সমর্থিত আবিদুল ইসলাম খানের মধ্যে ভোটের ব্যবধান দাঁড়িয়েছে ৭৪৫৩ ভোট।
মঙ্গলবার সকাল ৯টা থেকে বিকাল ৫টা পর্যন্ত অনুষ্ঠিত ডাকসু নির্বাচনে অভূতপূর্ব উৎসাহ-উদ্দীপনা দেখা গেছে। রাত পর্যন্ত পাওয়া তথ্য অনুযায়ী, সাদিক কায়েম পেয়েছেন ১২ হাজার ৬৭৪ ভোট, যেখানে আবিদুল ইসলাম খান পেয়েছেন ৫ হাজার ২২১ ভোট। এই বিপুল ব্যবধান ডাকসু নির্বাচনের ইতিহাসে এক নতুন মাত্রা যোগ করেছে।
বিস্তারিত ফলাফল বিশ্লেষণ
অমর একুশে হলে ভিপি পদে সাদিক কায়েম ৬৪৪ ভোট পেয়ে আবিদুল ইসলামের ১৪১ ভোটকে ৫০৩ ভোটের ব্যবধানে পেছনে ফেলে দিয়েছেন। সুফিয়া কামাল হলে এই ব্যবধান আরও বেশি – সাদিক কায়েম ১২৭০ ভোট পেয়েছেন, আবিদুল পেয়েছেন ৪২৩ ভোট।
ফজলুল হক হলে সাদিক কায়েম ৮৪১ ভোট এবং আবিদুল ইসলাম ১৮১ ভোট পেয়েছেন। শহীদুল্লাহ হলে সাদিক কায়েম ৯৬৬ এবং আবিদুল ইসলাম ১৯৯ ভোট পেয়েছেন। এভাবে প্রায় সব হলেই ইসলামী ছাত্রশিবিরের প্রার্থী এগিয়ে রয়েছেন।
তবে জগন্নাথ হলে একমাত্র ব্যতিক্রম। এই হলে আবিদুল ইসলাম ১২৭৬ ভোট পেয়ে সাদিক কায়েমের ১০ ভোটকে বিপুল ব্যবধানে হারিয়ে দিয়েছেন। এটি দেখায় যে নির্বাচনে বিভিন্ন হলের রাজনৈতিক পছন্দ আলাদা।
প্রতিটি হলের বিস্তারিত পরিসংখ্যান
শামসুন নাহার হলে সাদিক কায়েম ১১১৪ ভোট পেয়ে আবিদুল ইসলামের ৪৩৪ ভোটের তুলনায় ৬৮০ ভোটের ব্যবধানে এগিয়ে। জহুরুল হক হলে সাদিক ৮৯৬ এবং আবিদ ৩১ৄ ভোট পেয়েছেন। রোকেয়া হলে সাদিক কায়েম সবচেয়ে বেশি ১৪৭২ ভোট পেয়েছেন, আবিদুল পেয়েছেন ৫৭৫ ভোট।
সলিমুল্লাহ মুসলিম হলে সাদিক কায়েম ৩০৩ এবং আবিদুল ইসলাম ১১০ ভোট পেয়েছেন। স্যার এফ রহমান হলে সাদিক ৬০২ এবং আবিদ ১৮৬ ভোট। বিজয় একাত্তর হলে সাদিক ৯৯১ এবং আবিদ ২৭৮ ভোট পেয়েছেন।
জসিমউদ্দিন হলে সাদিক কায়েম ৬৪৭ এবং আবিদুল ইসলাম ১৮৭ ভোট পেয়েছেন। শেখ মুজিব হলে সাদিক ৮৪২ এবং আবিদ ২৩৮ ভোট। মাস্টারদা সূর্যসেন হলে সাদিক ৭৬৯ এবং আবিদ ২১০ ভোট পেয়েছেন।
সাধারণ সম্পাদক পদের প্রতিযোগিতা
সাধারণ সম্পাদক (জিএস) পদেও ইসলামী ছাত্রশিবিরের সমর্থিত এসএম ফরহাদ এগিয়ে রয়েছেন। বিভিন্ন হলে তিনি উল্লেখযোগ্য ভোট পেয়েছেন। রোকেয়া হলে ফরহাদ ১১২০ ভোট পেয়েছেন, যেখানে ছাত্রদলের তানভীর বারী হামীম পেয়েছেন ৪৪৭ ভোট।
তবে জগন্নাথ হলে জিএস পদে বাম সমর্থিত মেঘমল্লার বসু ১১৭০ ভোট পেয়ে এগিয়ে রয়েছেন। ফরহাদ এই হলে মাত্র ৫ ভোট পেয়েছেন।
নির্বাচনী পরিবেশ ও গুরুত্ব
২০১৯ সালের পর এই প্রথম ডাকসু নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়েছে। দীর্ঘ বিরতির পর এই নির্বাচনে ছাত্র-ছাত্রীদের ব্যাপক অংশগ্রহণ দেখা গেছে। বিভিন্ন ভোটকেন্দ্রে ৭০ শতাংশের বেশি ভোট পড়েছে বলে জানিয়েছেন বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য।
মোট আটটি ভোটকেন্দ্রে ১৮টি হলের শিক্ষার্থীরা ভোট দিয়েছেন। এই কেন্দ্রগুলো হলো কার্জন হল কেন্দ্র, শারীরিক শিক্ষা কেন্দ্র, টিএসসি, ভূতত্ত্ব বিভাগ কেন্দ্র, ইউ ল্যাব স্কুল অ্যান্ড কলেজ কেন্দ্র, সিনেট ভবন কেন্দ্র, উদয়ন স্কুল অ্যান্ড কলেজ কেন্দ্র এবং ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় ক্লাব কেন্দ্র।
রাজনৈতিক বিশ্লেষণ
এই নির্বাচনের ফলাফল দেশের ছাত্র রাজনীতিতে এক নতুন দিগন্ত উন্মোচন করেছে। ইসলামী ছাত্রশিবিরের এই সাফল্য তাদের দীর্ঘদিনের সংগঠনিক কাজের ফল বলে মনে করা হচ্ছে। অন্যদিকে বাংলাদেশ ছাত্রদল জগন্নাথ হল ছাড়া অন্যান্য হলে তাদের প্রত্যাশিত ফল পায়নি।
তৃতীয় প্রার্থী উমামা ফাতেমা কয়েকটি হলে উল্লেখযোগ্য ভোট পেয়েছেন, যা নির্বাচনে স্বতন্ত্র প্রার্থীদের ভূমিকা তুলে ধরে। শামীম হোসেন এবং আবদুল কাদেরও বিভিন্ন হলে যুক্তিসঙ্গত ভোট পেয়েছেন।
আগামীর পরিকল্পনা
চূড়ান্ত ফলাফল ঘোষণার অপেক্ষায় রয়েছে সবাই। বাকি দুটি ভোটকেন্দ্রের ফল এলে পূর্ণাঙ্গ চিত্র পাওয়া যাবে। তবে এখনও পর্যন্ত পাওয়া ফলাফল অনুযায়ী সাদিক কায়েম এবং এসএম ফরহাদের জয় প্রায় নিশ্চিত।
ডাকসু নির্বাচনের এই ফলাফল ভবিষ্যতে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র কল্যাণমূলক কার্যক্রমে নতুন দিক নির্দেশনা দেবে। নব নির্বাচিত নেতৃত্ব কীভাবে ছাত্র-ছাত্রীদের সমস্যা সমাধানে কাজ করবে, তা দেখার বিষয়।
