বৃহস্পতিবার সকাল ১০টায় যখন এইচএসসি ২০২৫ ফলাফল প্রকাশ হলো, তখন পুরো দেশে একটি চাঞ্চল্যকর তথ্য সামনে এসেছে। এবারের উচ্চমাধ্যমিক সার্টিফিকেট পরীক্ষায় দেশের মোট ২০২টি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান থেকে একজন শিক্ষার্থীও পাস করতে পারেনি। এই সংখ্যাটি গত বছরের তুলনায় অনেক বেশি, যা শিক্ষাক্ষেত্রে নতুন করে ভাবনার জন্ম দিয়েছে।
গতবছরের তুলনায় কত বেড়েছে শূন্য পাস প্রতিষ্ঠানের সংখ্যা?
২০২৪ সালের এইচএসসি পরীক্ষায় যেখানে মাত্র ৬৫টি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে কেউ পাস করতে পারেনি, সেখানে এবার সেই সংখ্যা বেড়ে দাঁড়িয়েছে ২০২টিতে। অর্থাৎ মাত্র এক বছরের ব্যবধানে শূন্য পাস কলেজের সংখ্যা বৃদ্ধি পেয়েছে ১৩৭টি। এই বিশাল বৃদ্ধি শিক্ষা বিশেষজ্ঞ এবং অভিভাবকদের মধ্যে উদ্বেগের সৃষ্টি করেছে। অনেক শিক্ষার্থী ও অভিভাবক প্রশ্ন তুলছেন, কেন এত বেশি সংখ্যক প্রতিষ্ঠানে শিক্ষার্থীরা পাস করতে ব্যর্থ হলো।
এইচএসসি ২০২৫ পরীক্ষায় কতজন শিক্ষার্থী অংশ নিয়েছিল?
এবারের পরীক্ষায় ১১টি শিক্ষা বোর্ডের অধীনে মোট ১২ লাখ ৫১ হাজার ১১১ জন শিক্ষার্থী অংশগ্রহণ করেছিল। এর মধ্যে ৬ লাখ ১৮ হাজার ১৫ জন ছেলে এবং ৬ লাখ ৩৩ হাজার ৯৬ জন মেয়ে শিক্ষার্থী ছিল। সারা দেশে ২ হাজার ৭৯৭টি কেন্দ্রে এই পরীক্ষা অনুষ্ঠিত হয়েছিল। পরীক্ষাটি শুরু হয়েছিল গত ২৬ জুন এবং কিছু বিষয়ের পরীক্ষা স্থগিত হওয়ার পর ১৯ আগস্ট শেষ হয়। এরপর ২১ থেকে ৩১ আগস্ট পর্যন্ত ব্যবহারিক পরীক্ষা অনুষ্ঠিত হয়েছিল।
এবারের পাসের হার কেমন হয়েছে?
২০২৫ সালের এইচএসসি ও সমমান পরীক্ষায় সারা দেশে গড় পাসের হার দাঁড়িয়েছে ৫৮.৮৩ শতাংশ, যা গত বছরের তুলনায় ১৮.৯৫ শতাংশ কম। এই হ্রাস শিক্ষাব্যবস্থায় একটি বড় ধরনের সংকেত বলে মনে করছেন শিক্ষা বিশ্লেষকরা। পাসের হার কমার সাথে সাথে জিপিএ-৫ প্রাপ্তির সংখ্যাও অনেক কমে গেছে। এবার মাত্র ৬৯ হাজার ৯৭ জন শিক্ষার্থী জিপিএ-৫ পেয়েছে, যেখানে গত বছর এই সংখ্যা ছিল ১ লাখ ৩১ হাজার। অর্থাৎ জিপিএ-৫ প্রাপ্তির সংখ্যা প্রায় অর্ধেক কমে গেছে।
কোন শিক্ষা বোর্ডে পাসের হার সবচেয়ে ভালো?
বিভিন্ন শিক্ষা বোর্ডের মধ্যে ঢাকা বোর্ডে পাসের হার সবচেয়ে বেশি, যা ৬৪.৬২ শতাংশ। এছাড়া দিনাজপুর শিক্ষা বোর্ডে পাসের হার ৫৭.৪৯ শতাংশ রেকর্ড করা হয়েছে। তবে কুমিল্লা বোর্ডে পাসের হার তুলনামূলক কম বলে জানানো হয়েছে। প্রতিটি বোর্ডের শিক্ষার্থীরা তাদের বোর্ডের ওয়েবসাইট এবং এসএমএসের মাধ্যমে ফলাফল জানতে পারছে।
কেন এত বেশি প্রতিষ্ঠানে শতভাগ ফেল হলো?
শিক্ষা বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন, একসঙ্গে এত বেশি সংখ্যক প্রতিষ্ঠানে শূন্য পাসের পেছনে একাধিক কারণ থাকতে পারে। প্রথমত, অনেক শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে পর্যাপ্ত শিক্ষক এবং শিক্ষা উপকরণের অভাব রয়েছে। দ্বিতীয়ত, শিক্ষার্থীদের নিয়মিত ক্লাসে উপস্থিতি এবং পড়াশোনায় মনোযোগের ঘাটতি রয়েছে। তৃতীয়ত, এবারের পরীক্ষা যেহেতু বেশ কিছু বিষয়ে স্থগিত হয়েছিল এবং পুনরায় নেওয়া হয়েছিল, তাতে শিক্ষার্থীদের প্রস্তুতিতেও প্রভাব পড়েছে বলে ধারণা করা হচ্ছে। এছাড়া করোনা মহামারীর পরবর্তী প্রভাবও এখনো শিক্ষাব্যবস্থায় দেখা যাচ্ছে।
শিক্ষার্থী ও অভিভাবকদের জন্য পরামর্শ
যে সমস্ত শিক্ষার্থীরা এবার পাস করতে পারেনি, তাদের জন্য হতাশ না হয়ে আবার চেষ্টা করা জরুরি। পরীক্ষার্থী খারাপ ফল করলে বাবা-মা এবং শিক্ষকদের উচিত তাদের মানসিকভাবে সহায়তা করা। ফলাফল খারাপ হলে শিক্ষার্থীকে দোষারোপ না করে তার দুর্বলতাগুলো চিহ্নিত করে সেগুলো কাটিয়ে উঠতে সাহায্য করা উচিত। নিয়মিত পড়াশোনা, শিক্ষকদের সাথে যোগাযোগ রাখা এবং প্রয়োজনে অতিরিক্ত কোচিংয়ের ব্যবস্থা করা যেতে পারে। অভিভাবকদের উচিত সন্তানদের পড়াশোনার পরিবেশ নিশ্চিত করা এবং তাদের উৎসাহ দেওয়া।
ফলাফল দেখার সহজ পদ্ধতি
শিক্ষার্থীরা তাদের এইচএসসি ফলাফল দেখতে পারবে সংশ্লিষ্ট শিক্ষা বোর্ডের অফিসিয়াল ওয়েবসাইটে গিয়ে। ওয়েবসাইটের রেজাল্ট কর্নারে ক্লিক করে বোর্ড এবং শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের EIIN নম্বর দিয়ে ফলাফল ডাউনলোড করা যাবে। এছাড়া এসএমএসের মাধ্যমেও ফলাফল জানা সম্ভব। শিক্ষার্থীরা তাদের নিজ নিজ কলেজ এবং পরীক্ষা কেন্দ্র থেকেও ফলাফল সংগ্রহ করতে পারবে।
শিক্ষাব্যবস্থার উন্নয়নে কী করা যেতে পারে?
এই পরিস্থিতি থেকে উত্তরণের জন্য শিক্ষা মন্ত্রণালয় এবং সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের উচিত জরুরি পদক্ষেপ নেওয়া। প্রথমত, যে সমস্ত প্রতিষ্ঠানে শূন্য পাস হয়েছে, সেগুলোর বিশেষ তদারকি প্রয়োজন। দ্বিতীয়ত, শিক্ষক নিয়োগ বৃদ্ধি এবং তাদের প্রশিক্ষণের ব্যবস্থা করা জরুরি। তৃতীয়ত, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলোতে পর্যাপ্ত শিক্ষা উপকরণ সরবরাহ নিশ্চিত করতে হবে। চতুর্থত, শিক্ষার্থীদের নিয়মিত উপস্থিতি নিশ্চিত করার জন্য কার্যকর পদক্ষেপ নিতে হবে। সর্বোপরি, শিক্ষার মান উন্নয়নে সরকারি এবং বেসরকারি উভয় পর্যায়ে একযোগে কাজ করার প্রয়োজন।
উপসংহার
এইচএসসি ২০২৫ পরীক্ষার ফলাফলে ২০২টি প্রতিষ্ঠানে শূন্য পাস এবং সামগ্রিকভাবে পাসের হার হ্রাস বাংলাদেশের শিক্ষাব্যবস্থায় একটি গুরুতর সতর্কবাণী। এই পরিস্থিতি মোকাবেলায় শিক্ষার্থী, অভিভাবক, শিক্ষক এবং সরকার সবাইকে একসাথে কাজ করতে হবে। শিক্ষাই জাতির মেরুদণ্ড, আর সেই মেরুদণ্ড মজবুত করতে হলে মানসম্মত শিক্ষার কোনো বিকল্প নেই। যে সমস্ত শিক্ষার্থীরা এবার ভালো ফল করতে পারেনি, তাদের জন্য আবারও সুযোগ রয়েছে। হতাশ না হয়ে নতুন উদ্যমে চেষ্টা চালিয়ে যেতে হবে।
