আগামী ২০২৭ সালের এসএসসি ও সমমানের পরীক্ষা ৭ জানুয়ারি এবং এইচএসসি ও সমমানের পরীক্ষা ৬ জুন থেকে শুরু করার সম্ভাব্য সময়সূচি ঘোষণা হওয়ায় শিক্ষার্থী, অভিভাবক, শিক্ষক এবং শিক্ষা বোর্ডগুলোর মধ্যে নতুন করে আলোচনা শুরু হয়েছে। সরকার বলছে, সেশনজট কমানো এবং শিক্ষাজীবনের সময় অপচয় ঠেকাতেই এ উদ্যোগ। তবে মাঠপর্যায়ের বাস্তবতায় অনেকেই আশঙ্কা করছেন, প্রস্তুতির সময় কমে গেলে এর চাপ সবচেয়ে বেশি পড়বে পরীক্ষার্থীদের ওপর।
শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের ঘোষিত পরিকল্পনা অনুযায়ী, এসএসসি পরীক্ষা আগামী বছরের শুরুতেই নেওয়া হবে। প্রস্তাবিত সূচিতে বলা হয়েছে, এসএসসির তত্ত্বীয় পরীক্ষা চলবে ৬ ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত এবং ব্যবহারিক শেষ হবে ১১ ফেব্রুয়ারির মধ্যে। অন্যদিকে, এইচএসসির তত্ত্বীয় পরীক্ষা ১৩ জুলাই পর্যন্ত চলতে পারে, আর ব্যবহারিক শেষ করার লক্ষ্য ১৮ জুলাইয়ের মধ্যে।
এই সময়সূচি কার্যকর হলে, প্রচলিত ধারা থেকে এসএসসি পরীক্ষা তিন মাসেরও বেশি আগে চলে আসবে। ফলে যেসব শিক্ষার্থী এতদিন ফেব্রুয়ারি-মার্চ বা তার পরের সময়কে লক্ষ্য ধরে প্রস্তুতি নিচ্ছিল, তাদের পড়াশোনার পরিকল্পনায় বড় ধরনের পরিবর্তন আনতে হবে।
সরকারের যুক্তি হলো, দীর্ঘদিনের সেশনজটের কারণে শিক্ষার্থীদের শিক্ষাজীবন অকারণে দীর্ঘ হচ্ছে। নীতিনির্ধারকদের ভাষ্য, এসএসসি ও এইচএসসি—দুই পর্যায়ের পরীক্ষাই ধীরে ধীরে ডিসেম্বরের মধ্যে আনার পরিকল্পনা রয়েছে। এতে ফল প্রকাশ, ভর্তি কার্যক্রম ও পরবর্তী শ্রেণিতে উত্তরণ দ্রুত হবে। শিক্ষা-সংশ্লিষ্ট কয়েকজন বিশেষজ্ঞও মনে করছেন, দীর্ঘমেয়াদে এতে শিক্ষাজীবনের সময় সাশ্রয় হতে পারে এবং কর্মজীবনে প্রবেশও কিছুটা আগাবে।
তবে এই পরিকল্পনার সঙ্গে সবচেয়ে বড় যে প্রশ্নটি সামনে এসেছে, তা হলো প্রস্তুতির বাস্তবতা। শিক্ষার্থী ও অভিভাবকদের অভিযোগ, শিক্ষাবর্ষ শুরুর পর বই পেতে দেরি, মাঝপথে নীতিগত পরিবর্তন, শ্রেণিকক্ষে পাঠদানে বিঘ্ন, বিভিন্ন ছুটি এবং পূর্ণাঙ্গ সিলেবাসের চাপ—সব মিলিয়ে এবারকার ব্যাচ আগের মতো স্বাভাবিক ছন্দে এগোতে পারেনি। এমন অবস্থায় পরীক্ষা এগিয়ে আনলে সিলেবাস শেষ করা, পুনরাবৃত্তি এবং মডেল টেস্টের সুযোগ কমে যেতে পারে।
বিশেষ করে বিজ্ঞান বিভাগের শিক্ষার্থীদের মধ্যে উদ্বেগ তুলনামূলক বেশি। তাদের ভাষ্য, জটিল বিষয়গুলো ভালোভাবে বুঝে অনুশীলন করার জন্য যে সময় প্রয়োজন, তা কমে গেলে মুখস্থনির্ভর প্রস্তুতির প্রবণতা বাড়বে। এতে পরীক্ষায় পাসের চাপ থাকলেও প্রকৃত শেখার জায়গা দুর্বল হতে পারে।
অভিভাবকদের একাংশের আশঙ্কা, হঠাৎ সময়সূচি এগিয়ে এলে শিক্ষার্থীদের মানসিক চাপ আরও বাড়বে। অনেক পরিবার ইতোমধ্যে কোচিংনির্ভর হয়ে পড়ার ঝুঁকির কথাও বলছে। কারণ, স্কুলভিত্তিক প্রস্তুতির সময় কমে গেলে বাড়তি সহায়তার দিকে ঝোঁক বাড়তে পারে, যা একদিকে অর্থনৈতিক চাপ তৈরি করবে, অন্যদিকে শিক্ষায় বৈষম্যও বাড়াতে পারে।
শিক্ষকদের মধ্যেও মিশ্র প্রতিক্রিয়া দেখা যাচ্ছে। কেউ কেউ বলছেন, পরিবর্তন দরকার ছিল; কিন্তু তা ধাপে ধাপে হলে শিক্ষার্থী ও প্রতিষ্ঠান দুপক্ষই মানিয়ে নেওয়ার সময় পেত। আবার অনেকে মনে করছেন, হঠাৎ বড় পরিবর্তনের ফলে স্কুলগুলোতে প্রি-টেস্ট, টেস্ট পরীক্ষা, বিশেষ ক্লাস ও পুনরাবৃত্তিমূলক কার্যক্রম দ্রুত শেষ করার চাপ তৈরি হবে।
শুধু শিক্ষার্থী বা পরিবার নয়, বাড়তি চাপে পড়ছে শিক্ষা বোর্ডগুলোও। বোর্ডসংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের মতে, রেজিস্ট্রেশন, ফরম পূরণ, টেস্ট পরীক্ষার সময় নির্ধারণ, প্রশ্নপত্র প্রস্তুত, উত্তরপত্র ব্যবস্থাপনা, ব্যবহারিক পরীক্ষার সমন্বয়—এসব কাজ নির্দিষ্ট সময় ধরে পরিকল্পনা করে করতে হয়। সাধারণত এসব ধাপের প্রতিটিতে যথেষ্ট সময় প্রয়োজন হয়। কিন্তু পরীক্ষা দুই থেকে তিন মাস এগিয়ে এলে একই কাজ আরও কম সময়ে শেষ করতে হবে। এতে জনবল, প্রশাসনিক সক্ষমতা ও সমন্বয়—সব ক্ষেত্রেই চাপ বাড়বে।
বোর্ডের কর্মকর্তাদের আরেকটি বড় চিন্তা হলো, সময় কমে গেলে কোনো একটি ধাপের বিলম্ব পুরো পরীক্ষাপ্রক্রিয়াকে প্রভাবিত করতে পারে। বিশেষ করে নিবন্ধন, কেন্দ্র প্রস্তুতি, প্রশ্ন মুদ্রণ ও গোপনীয়তা রক্ষা—এসব কাজে বাড়তি সতর্কতা দরকার। ফলে দ্রুততার সঙ্গে মান বজায় রাখা বোর্ডগুলোর জন্য বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে উঠতে পারে।
যদিও শিক্ষা বোর্ডের কিছু দায়িত্বশীল কর্মকর্তা মনে করছেন, শিক্ষার্থীরা নবম-দশম বা একাদশ-দ্বাদশ—দুই বছর ধরেই পড়াশোনার সুযোগ পাচ্ছে, তাই সময় পুরোপুরি কমে গেছে—এমন কথা পুরোপুরি সঠিক নয়। তাদের মতে, শিক্ষাবর্ষকে যদি জানুয়ারি থেকে ডিসেম্বর হিসেবে ধরা হয়, তাহলে ডিসেম্বরের পর পরীক্ষা নেওয়া অস্বাভাবিক নয়। তবে এই যুক্তির বিপরীতে শিক্ষার্থী-অভিভাবকরা বলছেন, ক্যালেন্ডারের হিসাব আর বাস্তব প্রস্তুতির হিসাব এক নয়।
এ অবস্থায় সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠছে স্পষ্ট ও আগাম পরিকল্পনা। শিক্ষার্থীরা এখন জানতে চায়, পূর্ণাঙ্গ সিলেবাস অপরিবর্তিত থাকবে কি না, স্কুলগুলো কীভাবে বাড়তি সহায়তা দেবে, আর পরীক্ষার আগে প্রস্তুতির সময়কে কীভাবে কার্যকর করা হবে। একই সঙ্গে শিক্ষা প্রশাসনের কাছ থেকেও দরকার পরিষ্কার নির্দেশনা, যাতে স্কুল, কলেজ, বোর্ড ও পরীক্ষার্থীরা একই ছকে এগোতে পারে।
সামগ্রিকভাবে বলা যায়, পরীক্ষা এগিয়ে আনার সিদ্ধান্তের পেছনে দীর্ঘমেয়াদি একটি নীতিগত লক্ষ্য থাকলেও বাস্তব চ্যালেঞ্জও কম নয়। সেশনজট কমানো যেমন জরুরি, তেমনি শিক্ষার্থীদের মানসিক প্রস্তুতি, পাঠদানের গুণগত মান এবং বোর্ডগুলোর প্রশাসনিক সক্ষমতাও সমান গুরুত্বপূর্ণ। তাই এ পরিবর্তন কার্যকর করতে হলে শুধু সময়সূচি ঘোষণা যথেষ্ট হবে না; প্রয়োজন সুস্পষ্ট রূপরেখা, সমন্বিত প্রস্তুতি এবং শিক্ষার্থী-কেন্দ্রিক বাস্তবসম্মত সহায়তা।
