গণ বিশ্ববিদ্যালয়ে প্রথমবারের মতো শিক্ষার্থীদের জন্য পরিবহন সেবা চালু করা হলো। দীর্ঘদিনের অপেক্ষার পর আজ ১৫ সেপ্টেম্বর থেকে এই বাস সেবা শুরু হয়েছে। তবে নির্ধারিত ভাড়ার তালিকা প্রকাশের পরই শিক্ষার্থীদের মধ্যে তীব্র অসন্তোষ দেখা দিয়েছে। অনেকেই বলছেন যে, লোকাল বাসের তুলনায় বিশ্ববিদ্যালয়ের বাসের ভাড়া বেশি হওয়ায় এটি তাদের জন্য অতিরিক্ত আর্থিক চাপ তৈরি করবে।
নতুন পরিবহন সেবার শুরু
গণ বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন দীর্ঘ প্রতীক্ষার অবসান ঘটিয়ে শিক্ষার্থীদের জন্য দুইটি বাস চালুর সিদ্ধান্ত নিয়েছে। এই বাসগুলো মানিকগঞ্জ ও চন্দ্রা রুটে চলাচল করবে। গত ৯ সেপ্টেম্বর বিশ্ববিদ্যালয়ের রেজিস্ট্রার প্রকৌশলী মো. ওহিদুজ্জামান স্বাক্ষরিত একটি বিজ্ঞপ্তিতে বাস সেবার তারিখ এবং ভাড়ার বিস্তারিত তালিকা প্রকাশ করা হয়।
এই পরিবহন সেবা চালুর মূল উদ্দেশ্য ছিল শিক্ষার্থীদের যাতায়াতের সুবিধা নিশ্চিত করা এবং তাদের দৈনিক ভোগান্তি কমানো। বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষের মতে, এই উদ্যোগের মাধ্যমে শিক্ষার্থীরা নিরাপদ এবং নিয়মিত পরিবহন সেবা পাবেন।
ভাড়ার বিস্তারিত তালিকা
মানিকগঞ্জ রুটে বিভিন্ন স্থান থেকে আলাদা ভাড়া নির্ধারণ করা হয়েছে। বাথুলি, নয়াডিঙ্গি ও মানিকগঞ্জ থেকে মাসিক ভাড়া ধরা হয়েছে ১৮০০ টাকা। কালামপুর থেকে ভাড়া ১২০০ টাকা এবং ইসলামপুর-ঢুলিভাটা থেকে ৬০০ টাকা। বিশেষ বিষয় হলো, শিক্ষার্থীদের ২ মাস ১৫ দিনের অগ্রিম ভাড়া জমা দিতে হবে।
চন্দ্রা রুটের ক্ষেত্রেও আলাদা ভাড়া কাঠামো রয়েছে। বাড়ইপাড়া ও চন্দ্রা থেকে মাসিক ভাড়া ১২০০ টাকা এবং বাইপাইল, শ্রীপুর, জিরানী, কবিরপুর থেকে ৬০০ টাকা। এই রুটেও অগ্রিম ভাড়া হিসেবে যথাক্রমে ৩০০০ ও ১৫০০ টাকা জমা দিতে হবে।
শিক্ষার্থীদের ক্ষোভের কারণ
ভাড়া নির্ধারণের পর থেকেই শিক্ষার্থীদের মধ্যে ব্যাপক অসন্তোষ দেখা দিয়েছে। তাদের প্রধান অভিযোগ হলো, লোকাল বাসের তুলনায় বিশ্ববিদ্যালয়ের বাসের ভাড়া বেশি হওয়ায় এটি তাদের আর্থিক সাশ্রয়ের পরিবর্তে অতিরিক্ত খরচ বাড়াবে।
আরো পড়ুনঃ এইচএসসি পরীক্ষার ফলাফল দেখুন
ইংরেজি বিভাগের চতুর্থ বর্ষের শিক্ষার্থী তাহামিদ ইসলাম তার ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেছেন, বিশ্ববিদ্যালয়ের বাস সেবাকে কেন্দ্র করে এক ধরনের নাটক চলছে। তিনি আরও বলেন যে, শিক্ষার্থীদের সুবিধার কথা ভেবে পদক্ষেপ নেওয়ার কথা থাকলেও প্রশাসনের সিদ্ধান্ত উল্টো ভোগান্তি বাড়াচ্ছে।
আর্থিক চাপের অভিযোগ
বায়োকেমিস্ট্রি বিভাগের প্রথম বর্ষের শিক্ষার্থী সামজিদা রাখি জানিয়েছেন যে, পরিবারের ব্যয় সামলাতেই হিমশিম খেতে হয়। তার মতে, লোকাল বাসের চেয়ে বেশি ভাড়া দিয়ে বিশ্ববিদ্যালয়ের বাস ব্যবহার করা শিক্ষার্থীদের জন্য বাড়তি চাপ সৃষ্টি করবে।
রসায়ন বিভাগের শিক্ষার্থী আলিফ আক্তার ওলিভ একটি সুনির্দিষ্ট তুলনা উপস্থাপন করেছেন। তিনি জানিয়েছেন যে, মানিকগঞ্জ থেকে লোকাল বাসে প্রতিদিন খরচ হয় ৬০ টাকা, অথচ বিশ্ববিদ্যালয়ের বাসে একই রুটে ভাড়া পড়ছে ৯২ টাকা। এতে করে মাস শেষে প্রায় ৬০০ টাকা বেশি গুনতে হবে।
শিক্ষার্থীবান্ধব সেবার দাবি
আইন বিভাগের তৃতীয় বর্ষের শিক্ষার্থী জিহাদ হাসান বলেছেন যে, লোকাল বাসে মাসিক খরচ যে পরিমাণ, বিশ্ববিদ্যালয়ের বাসে তার চেয়েও বেশি। তিনি জোর দিয়ে বলেছেন যে, এটি একটি সেবামূলক প্রতিষ্ঠান এবং এখানে এমন ভাড়া শিক্ষার্থীবান্ধব নয়। তার দাবি হলো প্রশাসনকে সামঞ্জস্যপূর্ণ ভাড়া নির্ধারণ করতে হবে।
প্রশাসনের ব্যাখ্যা ও যুক্তি
বাস পরিচালনা কমিটির সভাপতি অধ্যাপক নিরঞ্জন বিশ্বাস ভাড়া নির্ধারণের যুক্তি দিয়েছেন। তিনি জানিয়েছেন যে, বাস স্টাফদের বেতন, মেরামত ও অন্যান্য খরচ বিবেচনা করে ভাড়া নির্ধারণ করা হয়েছে। তিনি আরও বলেছেন যে, আড়াই মাস পরীক্ষামূলকভাবে দুইটি বাস চালু থাকবে এবং পরবর্তীতে পরিস্থিতি অনুযায়ী ভাড়া কমানো বা বাড়ানো হবে।
বিশ্ববিদ্যালয়ের রেজিস্ট্রার প্রকৌশলী মো. ওহিদুজ্জামান জানিয়েছেন যে, ভাড়া পরিবহন শাখার কমিটির আলোচনার ভিত্তিতে নির্ধারণ করা হয়েছে। তবে তিনি শিক্ষার্থীদের অসন্তোষ সম্পর্কে অবগত নন বলে দাবি করেছেন।
পরীক্ষামূলক পর্যায় ও ভবিষ্যৎ পরিকল্পনা
এই বাস সেবা প্রথমে পরীক্ষামূলকভাবে চালু করা হয়েছে। প্রশাসনের পরিকল্পনা অনুযায়ী, আড়াই মাস এই সেবা চালিয়ে দেখা হবে যে আর্থিক দিক থেকে এটি টেকসই কি না। যদি শিক্ষার্থীদের ভাড়া থেকে ভর্তুকির প্রয়োজন না হয় তাহলে ভাড়া কমানো হবে, আর প্রয়োজন হলে আরও বাড়ানো হতে পারে।
সমস্যার সমাধানে করণীয়
এই পরিস্থিতিতে শিক্ষার্থী ও প্রশাসনের মধ্যে একটি কার্যকর সংলাপের প্রয়োজন রয়েছে। বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন যদি সত্যিকার অর্থে শিক্ষার্থীবান্ধব সেবা দিতে চায়, তাহলে তাদের উচিত ভাড়ার কাঠামো পুনর্বিবেচনা করা। একইসাথে শিক্ষার্থীদের আর্থিক সামর্থ্য এবং সেবার মান উভয়টিকেই বিবেচনায় রাখতে হবে।
গণ বিশ্ববিদ্যালয়ে প্রথমবার পরিবহন সেবা চালু হওয়া নিঃসন্দেহে একটি ইতিবাচক পদক্ষেপ। কিন্তু ভাড়া নিয়ে শিক্ষার্থীদের ক্ষোভ থাকায় এই উদ্যোগের সাফল্য নির্ভর করবে প্রশাসনের সমস্যা সমাধানের দক্ষতার ওপর। আশা করা যায় যে, পরীক্ষামূলক পর্যায়ে প্রাপ্ত অভিজ্ঞতার ভিত্তিতে প্রশাসন আরও যুক্তিসংগত ভাড়া কাঠামো প্রণয়ন করবে।
