নবম পে-স্কেল কার্যকর হবে যেভাবে: ধাপে ধাপে বাড়বে বেতন-ভাতা

সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারীদের বহুল আলোচিত নবম পে-স্কেল একসঙ্গে নয়, ধাপে ধাপে কার্যকর করার পরিকল্পনা নিয়ে কাজ চলছে। সংশ্লিষ্ট সূত্রগুলোর তথ্য অনুযায়ী, আসন্ন জাতীয় বাজেটে এ খাতে বিশেষ বরাদ্দ রাখার প্রস্তুতি নেওয়া হচ্ছে। প্রাথমিকভাবে মূল বেতন বাড়ানো দিয়ে প্রক্রিয়া শুরু হতে পারে, পরে পর্যায়ক্রমে বিভিন্ন ভাতা ও সুযোগ-সুবিধা সমন্বয় করা হবে।

সরকারি আর্থিক ব্যবস্থাপনার ওপর একবারে বড় চাপ এড়াতে নতুন বেতন কাঠামো বাস্তবায়নে ধীর ও হিসাবি পথ নেওয়ার দিকেই ঝুঁকছে নীতিনির্ধারণী মহল। এ কারণে পূর্ণাঙ্গ সুবিধা একসঙ্গে কার্যকর না করে কয়েক অর্থবছরে ভাগ করে বাস্তবায়নের আলোচনা গুরুত্ব পাচ্ছে।

বাজেটে থাকতে পারে বড় বরাদ্দ

নতুন পে-স্কেল বাস্তবায়নের প্রাথমিক প্রস্তুতি হিসেবে আগামী ২০২৬-২৭ অর্থবছরের বাজেটে প্রায় ৩৫ হাজার কোটি টাকার সম্ভাব্য বরাদ্দ নিয়ে কাজ চলছে বলে জানা গেছে। অর্থ মন্ত্রণালয়-সংশ্লিষ্ট সূত্র বলছে, পে-স্কেল কার্যকর করতে গেলে সরকারের নিয়মিত ব্যয়ের পরিমাণ উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়ে যাবে। তাই বাজেট ঘোষণার সময় বিষয়টি নীতিগতভাবে সামনে আনা হতে পারে।

এবারের পরিকল্পনায় শুধু কর্মরত সরকারি চাকরিজীবীরাই নন, পেনশনভোগীরাও আর্থিকভাবে প্রভাবিত হবেন। হিসাব অনুযায়ী, প্রায় ১৪ লাখ কর্মরত সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারী এবং প্রায় ৯ লাখ পেনশনভোগী এই নতুন কাঠামোর আওতায় আসতে পারেন।

কার্যকর হবে কয়েক ধাপে

সংশ্লিষ্টদের মতে, পে-স্কেল বাস্তবায়নের প্রথম ধাপে মূল বেতন বা বেসিক বাড়ানোর দিকে গুরুত্ব দেওয়া হতে পারে। এরপর পরবর্তী ধাপগুলোতে চিকিৎসা ভাতা, বাড়িভাড়া, টিফিন ভাতা, শিক্ষা ভাতা, বৈশাখী ভাতাসহ অন্যান্য সুবিধা সমন্বয়ের উদ্যোগ নেওয়া হবে।

নীতিনির্ধারণী পর্যায়ে দুটি পদ্ধতি নিয়ে আলোচনা হচ্ছে বলে জানা গেছে। একটি হলো তিন ধাপে বাস্তবায়ন, অন্যটি হলো পরবর্তী দুই বা তিন অর্থবছরে পর্যায়ক্রমে বেতন ও ভাতা সমন্বয় করা। অর্থাৎ শুরুতেই পুরো সুবিধা না দিয়ে ধাপে ধাপে আর্থিক চাপ সামলে বাস্তবায়ন এগোতে পারে।

কখন থেকে শুরু হতে পারে

বাজেট প্রক্রিয়ার সঙ্গে বিষয়টি যুক্ত থাকায় জাতীয় বাজেট ঘোষণার পরই পে-স্কেল বাস্তবায়নের আনুষ্ঠানিক রূপরেখা স্পষ্ট হতে পারে। বিভিন্ন সূত্রে আভাস মিলেছে, সবকিছু চূড়ান্ত হলে প্রথম ধাপ আগামী জুলাই থেকেই শুরু হওয়ার সম্ভাবনা আছে। তবে এ জন্য সরকারের উচ্চপর্যায়ের চূড়ান্ত অনুমোদন প্রয়োজন হবে।

এ কারণে এখনই নির্দিষ্ট তারিখকে চূড়ান্ত ধরে নেওয়ার সুযোগ নেই। বরং বলা যায়, বাজেট-পরবর্তী সিদ্ধান্তই নির্ধারণ করবে কবে থেকে সরকারি চাকরিজীবীরা নতুন কাঠামোর সুবিধা হাতে পাবেন।

প্রস্তাবিত বেতন কাঠামোয় কী আছে

নবম পে-স্কেল সংক্রান্ত আলোচনায় যে প্রস্তাবগুলো সামনে এসেছে, তার মধ্যে সবচেয়ে বেশি আলোচনায় রয়েছে সর্বনিম্ন বেতন বৃদ্ধি। প্রস্তাব অনুযায়ী, ২০তম গ্রেডে সর্বনিম্ন মূল বেতন ৮ হাজার ২৫০ টাকা থেকে বাড়িয়ে ২০ হাজার টাকা করার সুপারিশ রয়েছে। একইভাবে সর্বোচ্চ বেতন ১ লাখ ৬০ হাজার টাকা পর্যন্ত নির্ধারণের কথাও এসেছে।

বেতন বৈষম্য কমাতে সর্বনিম্ন ও সর্বোচ্চ বেতনের অনুপাত ১:৮ রাখার সুপারিশও গুরুত্ব পাচ্ছে। এতে নিম্ন গ্রেডের কর্মচারীরা তুলনামূলক বেশি সুবিধা পেতে পারেন, আর উচ্চ গ্রেডে বৃদ্ধির হার কিছুটা সংযত রাখা হতে পারে।

বিশেষ ভাতায়ও আসতে পারে পরিবর্তন

শুধু মূল বেতন নয়, কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ ভাতাও বাড়ানোর প্রস্তাব আলোচনায় আছে। এর মধ্যে বৈশাখী ভাতা বর্তমানের তুলনায় বাড়ানো, ১১ থেকে ২০তম গ্রেডের কর্মচারীদের টিফিন ভাতা বাড়ানো এবং সন্তানদের জন্য শিক্ষা ভাতা সমন্বয়ের বিষয়টি গুরুত্ব পাচ্ছে।

এ ছাড়া চিকিৎসা ভাতা ও অন্যান্য প্রাপ্য সুবিধাও ধাপে ধাপে বাস্তবায়নের অংশ হতে পারে। তবে কোন ভাতা কোন ধাপে কার্যকর হবে, সেটি এখনো চূড়ান্তভাবে ঘোষণা হয়নি।

কেন ধাপে ধাপে বাস্তবায়নের চিন্তা

বর্তমান অর্থনৈতিক বাস্তবতায় একবারে পুরো পে-স্কেল চালু করলে সরকারের ব্যয় অনেক বেড়ে যাবে। মুদ্রাস্ফীতি, রাজস্ব আহরণের চাপ, উন্নয়ন ব্যয় এবং নিয়মিত প্রশাসনিক খরচ—সবকিছু বিবেচনায় নিয়েই ধাপে ধাপে বাস্তবায়নের চিন্তা সামনে এসেছে।

সরকারি হিসাব অনুযায়ী, পূর্ণাঙ্গ বাস্তবায়নে বিপুল অতিরিক্ত অর্থের প্রয়োজন হতে পারে। সে কারণেই প্রথমে আংশিক বাস্তবায়ন, পরে পরিপূর্ণ বাস্তবায়নের পথে হাঁটার আলোচনা চলছে। এ পরিকল্পনা বাস্তবায়িত হলে ২০২৮-২৯ অর্থবছরের মধ্যে পূর্ণ সুবিধা কার্যকর করার লক্ষ্য ধরা হতে পারে।

২০১৫ সালের অভিজ্ঞতাও থাকছে বিবেচনায়

সবশেষ ২০১৫ সালে অষ্টম জাতীয় পে-স্কেল কার্যকর হয়েছিল। তখনও কিছু ক্ষেত্রে ধাপে ধাপে বাস্তবায়নের পদ্ধতি অনুসরণ করা হয়েছিল। এবারও একই ধরনের কাঠামো অনুসরণ করার ইঙ্গিত মিলছে। অর্থাৎ প্রথমে বেসিক বেতন, পরে অন্যান্য আর্থিক সুবিধা—এমন মডেলই সবচেয়ে সম্ভাব্য হিসেবে দেখা হচ্ছে।

চাকরিজীবীদের জন্য কী বার্তা

নতুন পে-স্কেল নিয়ে সরকারি চাকরিজীবীদের দীর্ঘদিনের অপেক্ষা রয়েছে। বাজারদর, বাসাভাড়া, চিকিৎসা ব্যয় ও দৈনন্দিন খরচ বেড়ে যাওয়ার প্রেক্ষাপটে নতুন বেতন কাঠামো এখন অনেকের কাছেই প্রয়োজনীয় হয়ে উঠেছে। এ অবস্থায় ধাপে ধাপে হলেও পে-স্কেল বাস্তবায়নের অগ্রগতি চাকরিজীবীদের জন্য গুরুত্বপূর্ণ বার্তা বহন করছে।

সব মিলিয়ে বলা যায়, নবম পে-স্কেল কার্যকর হচ্ছে এমন নয় যে একদিনেই পুরো পরিবর্তন দেখা যাবে; বরং এটি হবে একটি পর্যায়ক্রমিক প্রক্রিয়া। বাজেটে বরাদ্দ, সরকারের নীতিগত সিদ্ধান্ত এবং চূড়ান্ত অনুমোদনের ওপর নির্ভর করেই নির্ধারিত হবে কে কখন কতটা সুবিধা পাবেন। তাই এখন নজর থাকবে বাজেট ঘোষণার পর সরকারের আনুষ্ঠানিক সিদ্ধান্তের দিকে।

নিলয় আহমেদ
নিলয় আহমেদ
নিলয় আহম্মেদ শিক্ষা বিষয়ক প্রতিবেদক। তিনি বাংলা বিষয়ে স্নাতকোত্তর সম্পন্ন করেছেন। পরীক্ষা, ভর্তি ও শিক্ষানীতি সংক্রান্ত তথ্য নিয়ে কাজ করেন। তথ্য যাচাই করে সংক্ষিপ্ত ও পরিষ্কারভাবে উপস্থাপন করাই তার প্রধান দায়িত্ব।
রিলেটেড আরটিকেল

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here

- Advertisment -

জনপ্রিয় নিউজ