পবিত্র রমজান মাস ২০২৬ আসছে নতুন আশা ও প্রত্যাশা নিয়ে। মুসলিম বিশ্বের সবচেয়ে বরকতময় এই মাসে রোজা পালন করার জন্য সঠিক সাহ্রি ও ইফতারের সময়সূচি জানা অত্যন্ত জরুরি। বাংলাদেশের প্রতিটি রোজাদার যাতে সঠিক সময়ে সাহরি খেতে পারে এবং ইফতার করতে পারে, সেজন্য ইসলামিক ফাউন্ডেশন বাংলাদেশ প্রতি বছরের মতো এবারও রমজান ২০২৬ এর সময়সূচি প্রকাশ করেছে।
রমজান ২০২৬ কবে শুরু হবে?
চাঁদ দেখার ওপর নির্ভর করে রমজান মাস শুরু হয়। আরবি চান্দ্র ক্যালেন্ডার অনুযায়ী প্রতি বছর রমজানের সময় পরিবর্তন হয়। ২০২৬ সালের রমজান শুরু হওয়ার সম্ভাব্য তারিখ হলো ১৯ ফেব্রুয়ারি, বৃহস্পতিবার। তবে এটি সম্পূর্ণভাবে চাঁদ দেখার ওপর নির্ভরশীল। যদি ১৮ ফেব্রুয়ারি সন্ধ্যায় চাঁদ দেখা যায়, তাহলে ১৯ ফেব্রুয়ারি থেকে প্রথম রোজা শুরু হবে এবং ঈদুল ফিতর হবে সম্ভবত ২০ মার্চ, শুক্রবার।
ঢাকার সম্পূর্ণ ৩০ রমজানের সাহ্রি ও ইফতারের সময়সূচি ২০২৬
ঢাকা শহরের রোজাদারদের জন্য সম্পূর্ণ রমজান মাসের সাহ্রি ও ইফতারের সময়সূচি নিচে টেবিল আকারে দেওয়া হলো। এই সময়সূচি অনুযায়ী আপনি প্রতিদিন সাহ্রি ও ইফতারের সঠিক সময় জানতে পারবেন।
| রমজান তারিখ | ইংরেজি তারিখ | সাহ্রির শেষ সময় | ফজরের নামাজ | ইফতারের সময় | মাগরিবের নামাজ |
|---|---|---|---|---|---|
| ১ রমজান | ১৯ ফেব্রুয়ারি (বৃহস্পতিবার) | ৫:১২ AM | ৫:২২ AM | ৫:৫৮ PM | ৬:০৮ PM |
| ২ রমজান | ২০ ফেব্রুয়ারি (শুক্রবার) | ৫:১১ AM | ৫:২১ AM | ৫:৫৯ PM | ৬:০৯ PM |
| ৩ রমজান | ২১ ফেব্রুয়ারি (শনিবার) | ৫:১০ AM | ৫:২০ AM | ৬:০০ PM | ৬:১০ PM |
| ৪ রমজান | ২২ ফেব্রুয়ারি (রবিবার) | ৫:০৯ AM | ৫:১৯ AM | ৬:০০ PM | ৬:১০ PM |
| ৫ রমজান | ২৩ ফেব্রুয়ারি (সোমবার) | ৫:০৮ AM | ৫:১৮ AM | ৬:০১ PM | ৬:১১ PM |
| ৬ রমজান | ২৪ ফেব্রুয়ারি (মঙ্গলবার) | ৫:০৭ AM | ৫:১৭ AM | ৬:০২ PM | ৬:১২ PM |
| ৭ রমজান | ২৫ ফেব্রুয়ারি (বুধবার) | ৫:০৬ AM | ৫:১৬ AM | ৬:০২ PM | ৬:১২ PM |
| ৮ রমজান | ২৬ ফেব্রুয়ারি (বৃহস্পতিবার) | ৫:০৫ AM | ৫:১৫ AM | ৬:০৩ PM | ৬:১৩ PM |
| ৯ রমজান | ২৭ ফেব্রুয়ারি (শুক্রবার) | ৫:০৪ AM | ৫:১৪ AM | ৬:০৪ PM | ৬:১৪ PM |
| ১০ রমজান | ২৮ ফেব্রুয়ারি (শনিবার) | ৫:০৩ AM | ৫:১৩ AM | ৬:০৪ PM | ৬:১৪ PM |
| ১১ রমজান | ১ মার্চ (রবিবার) | ৫:০২ AM | ৫:১২ AM | ৬:০৫ PM | ৬:১৫ PM |
| ১২ রমজান | ২ মার্চ (সোমবার) | ৫:০১ AM | ৫:১১ AM | ৬:০৬ PM | ৬:১৬ PM |
| ১৩ রমজান | ৩ মার্চ (মঙ্গলবার) | ৫:০০ AM | ৫:১০ AM | ৬:০৬ PM | ৬:১৬ PM |
| ১৪ রমজান | ৪ মার্চ (বুধবার) | ৪:৫৯ AM | ৫:০৯ AM | ৬:০৭ PM | ৬:১৭ PM |
| ১৫ রমজান | ৫ মার্চ (বৃহস্পতিবার) | ৪:৫৮ AM | ৫:০৮ AM | ৬:০৮ PM | ৬:১৮ PM |
| ১৬ রমজান | ৬ মার্চ (শুক্রবার) | ৪:৫৭ AM | ৫:০৭ AM | ৬:০৮ PM | ৬:১৮ PM |
| ১৭ রমজান | ৭ মার্চ (শনিবার) | ৪:৫৬ AM | ৫:০৬ AM | ৬:০৯ PM | ৬:১৯ PM |
| ১৮ রমজান | ৮ মার্চ (রবিবার) | ৪:৫৫ AM | ৫:০৫ AM | ৬:০৯ PM | ৬:১৯ PM |
| ১৯ রমজান | ৯ মার্চ (সোমবার) | ৪:৫৪ AM | ৫:০৪ AM | ৬:১০ PM | ৬:২০ PM |
| ২০ রমজান | ১০ মার্চ (মঙ্গলবার) | ৪:৫৩ AM | ৫:০৩ AM | ৬:১১ PM | ৬:২১ PM |
| ২১ রমজান | ১১ মার্চ (বুধবার) | ৪:৫২ AM | ৫:০২ AM | ৬:১১ PM | ৬:২১ PM |
| ২২ রমজান | ১২ মার্চ (বৃহস্পতিবার) | ৪:৫১ AM | ৫:০১ AM | ৬:১২ PM | ৬:২২ PM |
| ২৩ রমজান | ১৩ মার্চ (শুক্রবার) | ৪:৫০ AM | ৫:০০ AM | ৬:১৩ PM | ৬:২৩ PM |
| ২৪ রমজান | ১৪ মার্চ (শনিবার) | ৪:৪৯ AM | ৪:৫৯ AM | ৬:১৩ PM | ৬:২৩ PM |
| ২৫ রমজান | ১৫ মার্চ (রবিবার) | ৪:৪৮ AM | ৪:৫৮ AM | ৬:১৪ PM | ৬:২৪ PM |
| ২৬ রমজান | ১৬ মার্চ (সোমবার) | ৪:৪৭ AM | ৪:৫৭ AM | ৬:১৫ PM | ৬:২৫ PM |
| ২৭ রমজান (শবে কদর) | ১৭ মার্চ (মঙ্গলবার) | ৪:৪৬ AM | ৪:৫৬ AM | ৬:১৫ PM | ৬:২৫ PM |
| ২৮ রমজান | ১৮ মার্চ (বুধবার) | ৪:৪৫ AM | ৪:৫৫ AM | ৬:১৬ PM | ৬:২৬ PM |
| ২৯ রমজান | ১৯ মার্চ (বৃহস্পতিবার) | ৪:৪৪ AM | ৪:৫৪ AM | ৬:১৭ PM | ৬:২৭ PM |
| ৩০ রমজান | ২০ মার্চ (শুক্রবার) | ৪:৪৩ AM | ৪:৫৩ AM | ৬:১৭ PM | ৬:২৭ PM |
বিশেষ দ্রষ্টব্য: হলুদ রঙের সারিগুলো শেষ দশকের বিশেষ রাতগুলো নির্দেশ করছে যেখানে লাইলাতুল কদর (শবে কদর) হওয়ার সম্ভাবনা বেশি থাকে।
৬৪ জেলার জন্য আলাদা সময়সূচি: একটি যুগান্তকারী পদক্ষেপ
এবারের রমজান সময়সূচি ২০২৬ এর সবচেয়ে বড় বিশেষত্ব হলো, ইসলামিক ফাউন্ডেশন বাংলাদেশ দেশের ৬৪ জেলার জন্য ৬৪টি আলাদা সময়সূচি প্রকাশ করেছে। এর আগে সাধারণত ঢাকার সময়ের সাথে যোগ বা বিয়োগ করে অন্যান্য জেলার রোজাদারদের সময় হিসাব করতে হতো। কিন্তু এখন আর এই ঝামেলা নেই।
প্রতিটি জেলার ভৌগলিক অবস্থান (geographical location) অনুযায়ী সূর্যোদয় ও সূর্যাস্তের সময় ভিন্ন হয়। পূর্বের জেলাগুলোতে সূর্য আগে উঠে এবং আগে অস্ত যায়। পশ্চিমের জেলাগুলোতে কিছুটা দেরিতে সূর্য ওঠে এবং অস্ত যায়। এই ভিন্নতা মাথায় রেখে প্রতিটি জেলার জন্য নির্ভুল সময়সূচি (accurate timetable) প্রকাশ করা হয়েছে।
বিভিন্ন জেলার সাহ্রি ও ইফতারের সময়ের পার্থক্য
বাংলাদেশের পূর্ব থেকে পশ্চিম প্রান্তের দূরত্বের কারণে সাহ্রি ও ইফতারের সময়ে উল্লেখযোগ্য পার্থক্য দেখা যায়। নিচে কয়েকটি প্রধান জেলার প্রথম রোজার তুলনামূলক সময়সূচি দেওয়া হলো:
| জেলার নাম | সাহ্রির শেষ সময় (১ রমজান) | ইফতারের সময় (১ রমজান) | রোজার দৈর্ঘ্য |
|---|---|---|---|
| ঢাকা | ৫:১২ AM | ৫:৫৮ PM | ১২ ঘণ্টা ৪৬ মিনিট |
| চট্টগ্রাম | ৫:০৮ AM | ৫:৫৫ PM | ১২ ঘণ্টা ৪৭ মিনিট |
| সিলেট | ৫:০৬ AM | ৫:৫৬ PM | ১২ ঘণ্টা ৫০ মিনিট |
| রাজশাহী | ৫:১৫ AM | ৬:০৩ PM | ১২ ঘণ্টা ৪৮ মিনিট |
| খুলনা | ৫:১৪ AM | ৬:০১ PM | ১২ ঘণ্টা ৪৭ মিনিট |
| বরিশাল | ৫:১১ AM | ৫:৫৯ PM | ১২ ঘণ্টা ৪৮ মিনিট |
| রংপুর | ৫:১০ AM | ৬:০০ PM | ১২ ঘণ্টা ৫০ মিনিট |
| ময়মনসিংহ | ৫:০৯ AM | ৫:৫৯ PM | ১২ ঘণ্টা ৫০ মিনিট |
| কক্সবাজার | ৫:০৫ AM | ৫:৫৩ PM | ১২ ঘণ্টা ৪৮ মিনিট |
| যশোর | ৫:১৫ AM | ৬:০২ PM | ১২ ঘণ্টা ৪৭ মিনিট |
সাহ্রি ও ইফতারের সময় কীভাবে নির্ধারণ করা হয়?
অনেকে জানেন না কীভাবে সাহ্রি ও ইফতারের সময় নির্ধারণ করা হয়। ইসলামিক ফাউন্ডেশন একটি বৈজ্ঞানিক পদ্ধতি অনুসরণ করে এই সময়সূচি তৈরি করে। সাহ্রির শেষ সময় মূলত ফজরের নামাজের ওয়াক্ত শুরুর সময়। অর্থাৎ, যখন ফজরের আজান দেওয়া হয়, তখন থেকে আর খাওয়া যায় না।
তবে একটি জেলার পূর্ব প্রান্ত থেকে পশ্চিম প্রান্তের দূরত্বের কারণে সময়ের তারতম্য হয়। এজন্য জেলার ভারসাম্য রক্ষার জন্য বিশেষ ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে। সাহ্রির সময় জেলার পূর্ব প্রান্তের সময় অনুযায়ী এবং ফজরের আজানের সময় পশ্চিম প্রান্তের সময় অনুযায়ী নির্ধারণ করা হয়। অন্যদিকে, ইফতারের সময় জেলার পশ্চিম প্রান্তের সূর্যাস্তের সময় অনুযায়ী ঠিক করা হয়।
বিভাগওয়ারি রমজান সময়সূচি ২০২৬ ডাউনলোড করুন
বাংলাদেশের ৮টি বিভাগের সকল জেলার জন্য আলাদা আলাদা সময়সূচি প্রস্তুত করা হয়েছে। আপনি যে বিভাগেই থাকুন না কেন, আপনার জেলার সম্পূর্ণ রমজান মাসের সাহ্রি ও ইফতারের সময় জানতে পারবেন।
| বিভাগের নাম | জেলা সংখ্যা | বিশেষত্ব |
|---|---|---|
| ঢাকা বিভাগ | ১৩টি জেলা | দেশের সবচেয়ে ঘনবসতিপূর্ণ এলাকা, কেন্দ্রীয় অবস্থান |
| চট্টগ্রাম বিভাগ | ১১টি জেলা | পূর্বাঞ্চলে অবস্থিত, সূর্য আগে ওঠে ও আগে অস্ত যায় |
| রাজশাহী বিভাগ | ৮টি জেলা | পশ্চিমাঞ্চলে অবস্থিত, সূর্য দেরিতে অস্ত যায় |
| খুলনা বিভাগ | ১০টি জেলা | দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের জেলা, সুন্দরবন এলাকা |
| বরিশাল বিভাগ | ৬টি জেলা | দক্ষিণাঞ্চলের উপকূলীয় এলাকা, নদীমাতৃক অঞ্চল |
| সিলেট বিভাগ | ৪টি জেলা | উত্তর-পূর্বাঞ্চলের পাহাড়ি এলাকা, চা বাগান অঞ্চল |
| রংপুর বিভাগ | ৮টি জেলা | উত্তরাঞ্চলের জেলা, শীতপ্রধান এলাকা |
| ময়মনসিংহ বিভাগ | ৪টি জেলা | উত্তর-মধ্যাঞ্চলের জেলা, কৃষিপ্রধান অঞ্চল |
রমজান মাসে দিনের দৈর্ঘ্য কীভাবে পরিবর্তন হয়
রমজান মাস যত এগিয়ে যায়, প্রতিদিন সাহ্রির সময় কয়েক মিনিট করে আগে হতে থাকে এবং ইফতারের সময় কয়েক মিনিট করে পিছিয়ে যায়। এর মানে হলো রোজার সময় ধীরে ধীরে বাড়তে থাকে। ২০২৬ সালের রমজানে প্রথম রোজায় সাহ্রি থেকে ইফতার পর্যন্ত সময় হবে প্রায় ১২ ঘণ্টা ৪৬ মিনিট, আর শেষ রোজায় এই সময় বেড়ে হবে প্রায় ১৩ ঘণ্টা ৩৪ মিনিট।
এই পরিবর্তন প্রাকৃতিক নিয়মের অংশ। ফেব্রুয়ারি-মার্চ মাসে বসন্তকাল শুরু হয় এবং দিন ধীরে ধীরে লম্বা হতে থাকে। তাই রোজাদারদের শেষের দিকে একটু বেশি সময় রোজা রাখতে হয়। কিন্তু এই দিনগুলোতেই শবে কদর রয়েছে, যা হাজার মাসের চেয়ে উত্তম। তাই এই সময়টা সবচেয়ে বরকতময়।
রমজানে সাহ্রি ও ইফতারের গুরুত্ব
সাহ্রি খাওয়া রোজার একটি গুরুত্বপূর্ণ সুন্নত। হযরত মুহাম্মদ (সা.) বলেছেন, “তোমরা সাহ্রি খাও, কেননা সাহ্রিতে বরকত রয়েছে।” সাহ্রি খেলে সারাদিন রোজা রাখতে শক্তি পাওয়া যায় এবং ইবাদতে মনোযোগ দেওয়া সহজ হয়। এমনকি যদি এক চুমুক পানিও পান করা হয়, তাও সাহ্রির সুন্নত আদায় হয়ে যায়।
অন্যদিকে, ইফতার হলো রোজা ভাঙার সময়। সূর্য অস্ত যাওয়ার সাথে সাথে রোজাদার ইফতার করতে পারেন। হাদিসে বলা হয়েছে, খেজুর দিয়ে ইফতার করা উত্তম। যদি খেজুর না থাকে, তাহলে পানি দিয়ে ইফতার করা যায়। ইফতারের সময় দোয়া কবুল হয়, তাই এই সময়টা খুবই গুরুত্বপূর্ণ। রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, “রোজাদারের ইফতারের সময় একটি দোয়া রয়েছে যা ফিরিয়ে দেওয়া হয় না।”
স্বাস্থ্যকর সাহ্রি ও ইফতারের পরামর্শ
রমজান মাসে সুস্থ থাকার জন্য স্বাস্থ্যকর খাবার (healthy food) খাওয়া জরুরি। পুষ্টিবিদরা বলেন, সাহ্রিতে এমন খাবার খাওয়া উচিত যা ধীরে হজম হয় এবং দীর্ঘসময় শক্তি সরবরাহ করে।
সাহ্রিতে যা খাবেন: ভাত বা রুটির মতো কমপ্লেক্স কার্বোহাইড্রেট (complex carbohydrates), ডাল ও মাছ-মাংসের মতো প্রোটিন, সবজি, ডিম, কলা, খেজুর এবং দুধ বা দই। এই খাবারগুলো অনেকক্ষণ পেট ভরা রাখে। বিশেষ করে খেজুর এবং কলা তাৎক্ষণিক শক্তি দেয় এবং দীর্ঘসময় সতেজ রাখে। প্রচুর পানি পান করুন কারণ সারাদিন পানি পান করা যায় না।
ইফতারে যা খাবেন: প্রথমে হালকা খাবার দিয়ে শুরু করুন। খেজুর এবং পানি দিয়ে ইফতার শুরু করা সবচেয়ে ভালো। তারপর ফলমূল, শরবত, ছোলা এবং হালকা খাবার খান। ১৫-২০ মিনিট পর মাগরিবের নামাজ পড়ে মূল খাবার খান। অতিরিক্ত তেলেভাজা, বেগুনি, পেঁয়াজু এবং মিষ্টি খাবার এড়িয়ে চলুন কারণ এতে পেটের সমস্যা, গ্যাস এবং অস্বস্তি হতে পারে।
যা এড়িয়ে চলবেন: অতিরিক্ত লবণ, চিনি এবং ক্যাফেইন জাতীয় পানীয় (চা, কফি) সাহ্রিতে এড়িয়ে চলুন কারণ এগুলো শরীর থেকে পানি বের করে দেয় এবং তৃষ্ণা বাড়ায়।
রমজান ২০২৬ এর বিশেষ প্রস্তুতি
এবারের রমজান ২০২৬ আগের যেকোনো সময়ের চেয়ে বেশি সুসংগঠিত হবে কারণ প্রতিটি জেলার জন্য আলাদা সময়সূচি পাওয়া যাচ্ছে। রোজাদারদের এখন আর অনুমান করে বা হিসাব করে সময় বের করতে হবে না। ইসলামিক ফাউন্ডেশন বাংলাদেশের এই উদ্যোগ দেশের কোটি কোটি মুসলিমের জন্য রমজান পালন সহজ করে দিয়েছে।
প্রযুক্তির এই যুগে অনলাইনে রমজান ক্যালেন্ডার (Ramadan calendar), মোবাইল অ্যাপ এবং বিভিন্ন ওয়েবসাইটে সময়সূচি পাওয়া যাচ্ছে। তবে সবসময় সরকারি এবং বিশ্বস্ত সূত্র থেকে তথ্য নেওয়া উচিত। ইসলামিক ফাউন্ডেশন বাংলাদেশ হলো দেশের সবচেয়ে নির্ভরযোগ্য সূত্র এই ব্যাপারে।
লাইলাতুল কদর (শবে কদর): রমজানের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ রাত
রমজান মাসের শেষ দশকে রয়েছে লাইলাতুল কদর বা শবে কদর, যাকে বলা হয় হাজার মাসের চেয়ে উত্তম রাত। পবিত্র কুরআনে আল্লাহ তায়ালা বলেছেন, “লাইলাতুল কদর হাজার মাসের চেয়ে উত্তম।” এই রাতে কুরআন অবতীর্ণ হয়েছিল এবং এই রাতে ইবাদত করলে হাজার মাস ইবাদতের সওয়াব পাওয়া যায়।
শবে কদর কখন হবে? রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, রমজানের শেষ দশকের বিজোড় রাতগুলোতে (২১, ২৩, ২৫, ২৭, ২৯) শবে কদর খোঁজ করো। তবে সবচেয়ে বেশি সম্ভাবনা থাকে ২৭ রমজানের রাতে। ২০২৬ সালে ২৭ রমজান হবে সম্ভবত ১৭ মার্চ, মঙ্গলবার। এই রাতে বেশি বেশি ইবাদত, কুরআন তেলাওয়াত, নফল নামাজ, তাসবিহ এবং দোয়া করা উচিত।
শবে কদরের দোয়া: হযরত আয়েশা (রা.) রাসুলুল্লাহ (সা.) কে জিজ্ঞেস করেছিলেন, “যদি আমি শবে কদর পাই, তাহলে কী দোয়া করবো?” রাসুলুল্লাহ (সা.) বললেন, “আল্লাহুম্মা ইন্নাকা আফুউউন তুহিব্বুল আফওয়া ফা’ফু আন্নি” (হে আল্লাহ, আপনি ক্ষমাশীল, ক্ষমা করতে ভালোবাসেন, তাই আমাকে ক্ষমা করে দিন)।
ডিজিটাল যুগে রমজান পালন
বর্তমানে স্মার্টফোনে বিভিন্ন ইসলামিক অ্যাপ (Islamic apps) পাওয়া যায় যেগুলো রমজানের সময়সূচি, কুরআন তেলাওয়াত, নামাজের সময় এবং দোয়া সম্পর্কিত তথ্য দেয়। Google Play Store এবং Apple App Store এ “Ramadan 2026 Bangladesh” লিখে সার্চ করলে অনেক ভালো অ্যাপ পাওয়া যাবে।
জনপ্রিয় রমজান অ্যাপ: Muslim Pro, Athan Pro, Ramadan Times, IslamicFinder এবং আল কুরআন অ্যাপ। এই অ্যাপগুলোতে GPS ব্যবহার করে আপনার লোকেশন অনুযায়ী সঠিক সাহ্রি ও ইফতারের সময় দেখাবে, নামাজের সময়ে রিমাইন্ডার দিবে এবং কুরআন পড়ার সুবিধা পাবেন।
ফেসবুক, ইউটিউব এবং অন্যান্য সোশ্যাল মিডিয়াতেও রমজানের বিশেষ কন্টেন্ট (Ramadan content) পাওয়া যায়। অনেক ইসলামিক স্কলার এবং আলেম অনলাইনে রমজানের মাসায়েল, রোজার নিয়ম-কানুন এবং আমল সম্পর্কে আলোচনা করেন। এসব থেকে উপকৃত হওয়া যায়। তবে সবসময় বিশ্বস্ত আলেম এবং প্রতিষ্ঠানের কন্টেন্ট অনুসরণ করা উচিত।
রমজান মাসের বিশেষ আমল ও ইবাদত
রমজান মাস শুধু রোজা রাখার মাস নয়, এটি ইবাদত ও আমলের মাস। এই মাসে কিছু বিশেষ আমল (special worship) করা উচিত যা সারা বছর করা হয় না।
তারাবির নামাজ: রমজান মাসে এশার নামাজের পর তারাবির নামাজ পড়া একটি গুরুত্বপূর্ণ সুন্নত। ২০ রাকাত তারাবি পড়া হয় এবং পুরো মাসে সম্পূর্ণ কুরআন খতম করা হয়। মসজিদে জামাতের সাথে তারাবি পড়া উত্তম।
কুরআন তেলাওয়াত: রমজান মাসে কুরআন নাজিল হয়েছিল, তাই এই মাসে বেশি বেশি কুরআন পড়া উচিত। প্রতিদিন কিছু অংশ পড়লে পুরো মাসে কুরআন খতম করা সম্ভব।
দান-সদকা: রমজান মাসে দান-সদকার সওয়াব ৭০ গুণ বেশি। গরিব-দুঃখীদের সাহায্য করা, ফকির-মিসকিনদের খাবার দেওয়া এবং মসজিদে দান করা বিশেষ সওয়াবের কাজ।
ইতিকাফ: রমজানের শেষ দশকে মসজিদে অবস্থান করাকে ইতিকাফ বলে। এটি একটি বিশেষ সুন্নত যা অনেক সওয়াবের কাজ।
রোজার স্বাস্থ্য উপকারিতা
আধুনিক বিজ্ঞান প্রমাণ করেছে যে রোজা রাখার অনেক স্বাস্থ্য উপকারিতা (health benefits of fasting) রয়েছে। চিকিৎসকরা বলেন, নিয়মিত রোজা রাখলে শরীরের ডিটক্সিফিকেশন হয়, অর্থাৎ শরীর থেকে বিষাক্ত পদার্থ বের হয়ে যায়।
রোজার স্বাস্থ্য উপকারিতা: ওজন কমায়, রক্তচাপ নিয়ন্ত্রণে রাখে, ডায়াবেটিস নিয়ন্ত্রণে সাহায্য করে, হজমশক্তি বাড়ায়, রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা বৃদ্ধি করে এবং মানসিক প্রশান্তি দেয়। তবে যাদের কোনো জটিল রোগ আছে, তাদের চিকিৎসকের পরামর্শ নিয়ে রোজা রাখা উচিত।
শেষ কথা
রমজান মাস মুসলমানদের জন্য এক অসাধারণ সুযোগ। এই মাসে রোজা রাখা, কুরআন তেলাওয়াত করা, তারাবির নামাজ পড়া এবং বেশি বেশি দান-সদকা করার মাধ্যমে আল্লাহর নৈকট্য অর্জন করা যায়। সাহ্রি ও ইফতারের সঠিক সময় জানা এবং মেনে চলা রোজা সঠিকভাবে পালনের জন্য অত্যন্ত জরুরি।
ইসলামিক ফাউন্ডেশন বাংলাদেশ কর্তৃক প্রকাশিত রমজান ২০২৬ সময়সূচি অনুসরণ করুন এবং আপনার পরিবার ও প্রতিবেশীদের সাথে শেয়ার করুন। প্রতিটি জেলার আলাদা সময়সূচি পাওয়ায় এখন আর কোনো ভুল হওয়ার সম্ভাবনা নেই। এই আর্টিকেলে দেওয়া সম্পূর্ণ ৩০ রমজানের সময়সূচি আপনার মোবাইল বা কম্পিউটারে সংরক্ষণ করে রাখুন এবং প্রতিদিন চেক করুন।
আসুন, আমরা সবাই মিলে পবিত্র রমজান মাসকে সুন্দরভাবে পালন করি এবং এই বরকতময় মাসের প্রতিটি মুহূর্ত কাজে লাগাই। রমজান শুধু রোজা রাখার মাস নয়, এটি আত্মশুদ্ধির মাস, ধৈর্যের মাস এবং দানশীলতার মাস। এই মাসে আমরা সবাই মিলে নিজেদের আত্মাকে পরিশুদ্ধ করি এবং আল্লাহর রহমত ও বরকত লাভ করি।
আল্লাহ তায়ালা আমাদের সবাইকে সুস্থতার সাথে রমজান ২০২৬ পালন করার তৌফিক দান করুন, সঠিক সময়ে সাহ্রি ও ইফতার করার সামর্থ্য দিন এবং লাইলাতুল কদর পাওয়ার সৌভাগ্য দান করুন। আমীন।
প্রায়শই জিজ্ঞাসিত প্রশ্নাবলী (FAQ)
১. রমজান ২০২৬ কত তারিখে শুরু হবে এবং কত তারিখে শেষ হবে?
চাঁদ দেখার ওপর নির্ভর করে রমজান ২০২৬ শুরু হবে। সম্ভাব্য তারিখ হলো ১৯ ফেব্রুয়ারি ২০২৬, বৃহস্পতিবার। যদি ১৮ ফেব্রুয়ারি সন্ধ্যায় চাঁদ দেখা যায়, তাহলে পরদিন থেকে রোজা শুরু হবে এবং ২০ মার্চ, শুক্রবার ঈদুল ফিতর হবে। তবে রমজান ২৯ দিন হলে ঈদ হবে ১৯ মার্চ।
২. ঢাকায় প্রথম রোজার সাহ্রি ও ইফতারের সময় কখন?
ঢাকায় প্রথম রোজার (১ রমজান, ১৯ ফেব্রুয়ারি) সাহ্রির শেষ সময় হবে সকাল ৫টা ১২ মিনিট এবং ইফতারের সময় হবে সন্ধ্যা ৫টা ৫৮ মিনিট। ফজরের নামাজ হবে ৫টা ২২ মিনিটে এবং মাগরিবের নামাজ হবে ৬টা ০৮ মিনিটে।
৩. রমজানের শেষ রোজার (৩০ রমজান) সাহ্রি ও ইফতারের সময় কখন হবে?
ঢাকায় শেষ রোজার (৩০ রমজান, ২০ মার্চ) সাহ্রির শেষ সময় হবে সকাল ৪টা ৪৩ মিনিট এবং ইফতারের সময় হবে সন্ধ্যা ৬টা ১৭ মিনিট। অর্থাৎ প্রথম রোজার তুলনায় শেষ রোজায় সাহ্রির সময় প্রায় ২৯ মিনিট আগে এবং ইফতারের সময় ১৯ মিনিট পরে হবে।
৪. আমার জেলার রমজান সময়সূচি কোথায় পাব?
ইসলামিক ফাউন্ডেশন বাংলাদেশ ৬৪ জেলার জন্য আলাদা আলাদা সময়সূচি প্রকাশ করেছে। আপনি ইসলামিক ফাউন্ডেশনের অফিশিয়াল ওয়েবসাইট থেকে আপনার জেলার সম্পূর্ণ রমজান মাসের সাহ্রি ও ইফতারের সময়সূচি PDF ফরম্যাটে ডাউনলোড করতে পারবেন। এছাড়া স্থানীয় মসজিদ এবং ইসলামিক সেন্টারেও এই সময়সূচি পাওয়া যায়।
৫. সাহ্রির শেষ সময় বলতে কী বোঝায় এবং কত মিনিট আগে খাওয়া শেষ করা উচিত?
সাহ্রির শেষ সময় মানে হলো ফজরের ওয়াক্ত শুরুর সময়। এই সময়ের আগে সাহ্রি খাওয়া শেষ করতে হবে। ফজরের আজান হওয়ার পর আর কিছু খাওয়া যাবে না। তবে সতর্ক থাকার জন্য সাহ্রির শেষ সময়ের অন্তত ৫-১০ মিনিট আগেই খাওয়া শেষ করা উচিত যাতে কোনো সমস্যা না হয়।
৬. রমজানে প্রতিদিন কি সাহ্রি ও ইফতারের সময় একই থাকে?
না, প্রতিদিন সাহ্রি ও ইফতারের সময় পরিবর্তন হয়। রমজান মাস যত এগিয়ে যায়, সাহ্রির সময় ধীরে ধীরে আগে হতে থাকে (প্রতিদিন প্রায় ১ মিনিট) এবং ইফতারের সময় ধীরে ধীরে পিছিয়ে যায় (প্রতিদিন প্রায় ৩৫-৪০ সেকেন্ড)। অর্থাৎ, দিন বড় হতে থাকে এবং রোজার সময় বাড়তে থাকে। তাই প্রতিদিন সময়সূচি চেক করা জরুরি।
৭. শবে কদর কখন হবে এবং কীভাবে চিনবো?
রমজানের শেষ দশকের বিজোড় রাতগুলোতে (২১, ২৩, ২৫, ২৭, ২৯ রমজান) শবে কদর খোঁজ করতে হয়। সবচেয়ে বেশি সম্ভাবনা থাকে ২৭ রমজানের রাতে (১৭ মার্চ)। হাদিসে বলা হয়েছে, এই রাতে আবহাওয়া মনোরম থাকে, না গরম না ঠান্ডা, এবং পরদিন সকালে সূর্য উঠে হালকা আলোতে, খুব উজ্জ্বল নয়। তবে সবচেয়ে ভালো হয় শেষ দশকের সব বিজোড় রাতে ইবাদত করা।
৮. রমজানে সাহ্রি না খেলে কি রোজা হবে?
সাহ্রি না খেলেও রোজা হবে, তবে সাহ্রি খাওয়া সুন্নত এবং এতে বিশেষ বরকত রয়েছে। হাদিসে রাসুলুল্লাহ (সা.) সাহ্রি খাওয়ার জন্য উৎসাহিত করেছেন এবং বলেছেন, “সাহ্রিতে বরকত রয়েছে।” সাহ্রি খেলে সারাদিন সুস্থ থাকা এবং ইবাদতে মনোযোগ দেওয়া সহজ হয়। তাই যতটা সম্ভব সাহ্রি খাওয়ার চেষ্টা করা উচিত, এমনকি এক চুমুক পানি হলেও।
৯. ইফতারের সময় হওয়ার আগেই যদি ভুলে কিছু খেয়ে ফেলি তাহলে কী হবে?
যদি ভুলে ইফতারের সময় হওয়ার আগে কিছু খেয়ে ফেলেন বা পান করেন, তাহলে সেই দিনের রোজা ভেঙে যাবে এবং পরবর্তীতে সেই রোজা কাজা করতে হবে। তবে যদি সত্যিই ভুলবশত হয়ে থাকে এবং ইচ্ছাকৃত না হয়, তাহলে আল্লাহ ক্ষমাশীল। কিন্তু তবুও রোজা কাজা করতে হবে। সতর্ক থাকা এবং সময়সূচি মেনে চলাই সবচেয়ে ভালো। ঘড়ি, মোবাইল বা অ্যালার্ম সেট করে রাখা উচিত।
১০. রমজানে তারাবির নামাজ কত রাকাত এবং কখন পড়তে হয়?
তারাবির নামাজ হলো ২০ রাকাত এবং এটি এশার ফরজ ও সুন্নত নামাজের পর পড়তে হয়। প্রতি ৪ রাকাত পর একটু বিশ্রাম নেওয়া হয়, এজন্য এর নাম “তারাবি” (বিশ্রাম)। তারাবি মসজিদে জামাতের সাথে পড়া উত্তম। পুরো রমজান মাসে তারাবির নামাজে সম্পূর্ণ কুরআন খতম করা হয়। তারাবির নামাজ সুন্নতে মুয়াক্কাদা এবং এতে অনেক সওয়াব রয়েছে।
