বাংলাদেশের শিক্ষাক্ষেত্রে এক গুরুত্বপূর্ণ পরিবর্তন এসেছে। শিক্ষাবর্ষের আট মাস পর বৃত্তি পরীক্ষার সিদ্ধান্ত নিয়েছে শিক্ষা মন্ত্রণালয়। এই জুনিয়র বৃত্তি পরীক্ষা অষ্টম শ্রেণির শিক্ষার্থীদের জন্য একটি নতুন সুযোগ হলেও একইসাথে নিয়ে এসেছে নানা প্রশ্ন ও আশঙ্কা।
কেন এলো এই পরীক্ষার সিদ্ধান্ত?
শিক্ষাবর্ষের আট মাস শেষ হওয়ার পর এই বৃত্তি পরীক্ষার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। আগে জুনিয়র স্কুল সার্টিফিকেট (জেএসসি) পরীক্ষার মাধ্যমে সব শিক্ষার্থী বৃত্তির জন্য প্রতিযোগিতা করতে পারত। কিন্তু করোনার পর জেএসসি বন্ধ হয়ে যাওয়ায় এই নতুন বৃত্তি পরীক্ষা চালু করা হচ্ছে।
বিশেষ বিষয় হলো, এই পরীক্ষায় সব শিক্ষার্থী অংশ নিতে পারবে না। অষ্টম শ্রেণির মাত্র ২৫ শতাংশ শিক্ষার্থী পরীক্ষায় বসতে পারবে। সপ্তম শ্রেণির পরীক্ষার ফলাফলের ভিত্তিতে এই তালিকা তৈরি হবে।
কত টাকা লাগবে পরীক্ষার জন্য?
প্রতি শিক্ষার্থীকে ৬০০ টাকা ফি দিতে হবে পরীক্ষায় অংশ নিতে। এর মধ্যে বোর্ড ফি ৪০০ টাকা এবং কেন্দ্র ফি ২০০ টাকা। অনেক পরিবারের জন্য এই টাকার পরিমাণ বাড়তি চাপ সৃষ্টি করতে পারে।
কোন বিষয়ে পরীক্ষা হবে?
এই জুনিয়র বৃত্তি পরীক্ষা মোট পাঁচটি বিষয়ে হবে:
বাংলা, ইংরেজি এবং গণিত – প্রতিটি বিষয়ে ১০০ নম্বর করে। বিজ্ঞান এবং বাংলাদেশ ও বিশ্ব পরিচয় – প্রতিটি বিষয়ে ৫০ নম্বর করে।
প্রতিটি পরীক্ষার সময় হবে তিন ঘণ্টা। যাদের বিশেষ প্রয়োজন আছে, তারা অতিরিক্ত ৩০ মিনিট সময় পাবে।
কোথায় হবে পরীক্ষা?
প্রতিটি উপজেলা সদরে পরীক্ষার কেন্দ্র স্থাপন করা হবে। শিক্ষার্থীদের সুবিধার জন্য উপযুক্ত বিদ্যালয়গুলো পরীক্ষা কেন্দ্র হিসেবে ব্যবহার হবে। প্রয়োজনে একাধিক কেন্দ্রও করা যাবে।
বৃত্তি কীভাবে বণ্টন হবে?
মেধা বৃত্তি এবং সাধারণ বৃত্তি – দুই ধরনের বৃত্তি দেওয়া হবে। সব বৃত্তির ৫০ শতাংশ ছেলেদের এবং ৫০ শতাংশ মেয়েদের জন্য নির্ধারিত। প্রতিটি উপজেলায় নির্দিষ্ট সংখ্যক ট্যালেন্টপুল বৃত্তি দেওয়া হবে।
শিক্ষাবিদদের উদ্বেগ
অনেক শিক্ষাবিদ এই হঠাৎ বৃত্তি পরীক্ষার সিদ্ধান্ত নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন। গণসাক্ষরতা অভিযানের নির্বাহী পরিচালক রাশেদা কে চৌধূরী বলেছেন, “এই ধরনের গুরুত্বপূর্ণ পরীক্ষার সিদ্ধান্ত শিক্ষাবর্ষ শুরুর সময়ই জানানো উচিত।”
তিনি আরো বলেছেন, “শিক্ষায় বৈষম্য বাড়ার আশঙ্কা আছে। পিছিয়ে পড়া শিক্ষার্থীরা আরও পিছিয়ে যেতে পারে। কারণ স্কুলগুলো শুধু ২৫ শতাংশ ভালো শিক্ষার্থীদের নিয়েই ব্যস্ত থাকবে।”
কোচিং-প্রাইভেটের চাপ বাড়বে?
এই বৃত্তি পরীক্ষার সিদ্ধান্ত নিয়ে আশঙ্কা আছে যে, কোচিং-প্রাইভেটের উপর নির্ভরশীলতা বেড়ে যাবে। অভিভাবকদের উপর আর্থিক চাপ বাড়তে পারে। বিশেষ করে যে সব পরিবার আর্থিকভাবে পিছিয়ে আছে, তাদের জন্য এটা আরও কঠিন হবে।
বিকল্প সমাধান কী হতে পারে?
শিক্ষাবিদরা পরামর্শ দিয়েছেন, বৃত্তি পরীক্ষায় যে বিপুল অর্থ খরচ হবে, সেই টাকা দিয়ে মিড-ডে মিল এবং উপবৃত্তি বাড়ানো যেতে পারে। এতে গরিব ও পিছিয়ে পড়া শিক্ষার্থীরা আরও বেশি সাহায্য পাবে।
কবে হবে পরীক্ষা?
এখনো চূড়ান্ত তারিখ ঠিক হয়নি। তবে ঢাকা শিক্ষা বোর্ডের চেয়ারম্যান জানিয়েছেন, আগামী সোমবার সভায় পরীক্ষার তারিখ নিয়ে আলোচনা হবে। এ বছরই পরীক্ষা হবে বলে নিশ্চিত করা হয়েছে।
শেষ কথা
শিক্ষাবর্ষের আট মাস পর বৃত্তি পরীক্ষার সিদ্ধান্ত নিঃসন্দেহে একটি গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ। তবে এই সিদ্ধান্তের সুফল পেতে হলে সকল শিক্ষার্থীর কল্যাণ এবং শিক্ষায় সমতা নিশ্চিত করতে হবে। ২৫ শতাংশ শিক্ষার্থীর জন্য সীমাবদ্ধ এই সুযোগ যেন শিক্ষায় বৈষম্য না বাড়ায়, সেদিকে নজর রাখা জরুরি।
অভিভাবক এবং শিক্ষার্থীদের জন্য পরামর্শ হলো, এই নতুন বৃত্তি পরীক্ষার জন্য প্রস্তুতি নিন, কিন্তু মনে রাখবেন সব শিক্ষার্থীরই সমান গুরুত্ব আছে। শিক্ষার মূল উদ্দেশ্য হলো সবার সামগ্রিক উন্নতি, শুধু একটি পরীক্ষায় ভালো করা নয়।
