দেশের মাধ্যমিক ও উচ্চমাধ্যমিক পর্যায়ের লক্ষ লক্ষ শিক্ষার্থীর জন্য অপেক্ষার প্রহর কিছুটা কমছে। ৬ষ্ঠ থেকে ১২শ শ্রেণীর উপবৃত্তি সংক্রান্ত নোটিশ ২০২৬ ইতোমধ্যে প্রকাশ করেছে প্রধানমন্ত্রীর শিক্ষা সহায়তা ট্রাস্ট (PMEAT) এবং মাধ্যমিক ও উচ্চশিক্ষা বিভাগ। সমন্বিত উপবৃত্তি কর্মসূচির আওতায় ২০২৬ শিক্ষাবর্ষে ভর্তি হওয়া ৬ষ্ঠ শ্রেণি, ৯ম শ্রেণির বিশেষ ক্ষেত্র এবং ২০২৫–২৬ সেশনের একাদশ/আলিম প্রথম বর্ষের শিক্ষার্থীদের HSP-MIS সফটওয়্যারে তথ্য এন্ট্রি ও যোগ্য শিক্ষার্থী নির্বাচনের নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে এই নোটিশে।
এর পাশাপাশি পুরনো কিস্তির উপবৃত্তির অর্থ ‘নগদ’ অ্যাকাউন্টের মাধ্যমে ধাপে ধাপে বিতরণ করার প্রক্রিয়াও চলমান রয়েছে। ফলে শিক্ষার্থী ও অভিভাবক উভয় পক্ষেরই এই মুহূর্তে সবচেয়ে বেশি প্রয়োজন—সঠিক তথ্য, সঠিক সময়ে।
এক নজরে গুরুত্বপূর্ণ তথ্য
- কর্মসূচির নাম: সমন্বিত উপবৃত্তি কর্মসূচি (Harmonized Stipend Program – HSP)
- পরিচালনাকারী সংস্থা: প্রধানমন্ত্রীর শিক্ষা সহায়তা ট্রাস্ট (PMEAT), মাধ্যমিক ও উচ্চশিক্ষা বিভাগ
- উপবৃত্তির শ্রেণি পরিসর: ৬ষ্ঠ থেকে ১২শ ও সমমান (স্কুল, কলেজ, মাদ্রাসা)
- অনলাইন পোর্টাল: HSP-MIS সফটওয়্যার
- টাকা বিতরণের মাধ্যম: ‘নগদ’ মোবাইল অ্যাকাউন্ট (কিছু ক্ষেত্রে ব্যাংক হিসাব)
- আবেদন সংক্রান্ত ওয়েবসাইট: pmeat.gov.bd
নোটিশে কী বলা হয়েছে
সম্প্রতি প্রকাশিত নোটিশ অনুযায়ী, সমন্বিত উপবৃত্তি কর্মসূচির আওতায় ২০২৬ সালে নতুন ভর্তি হওয়া ৬ষ্ঠ শ্রেণি ও ৬ষ্ঠ শ্রেণি (মাদ্রাসা), এবং ২০২৫–২৬ শিক্ষাবর্ষের একাদশ ও আলিম প্রথম বর্ষের যোগ্য শিক্ষার্থীদের তথ্য HSP-MIS সফটওয়্যারে এন্ট্রি করতে হবে। এ ছাড়া ৯ম শ্রেণির বিশেষ ক্ষেত্রেও কিছু শিক্ষার্থীর তথ্য নতুনভাবে যুক্ত করার সুযোগ থাকছে।
শিক্ষা প্রতিষ্ঠান প্রধানদের নির্দেশ দেওয়া হয়েছে—যোগ্য শিক্ষার্থীদের যাচাই-বাছাই শেষে নির্ধারিত ফরম পূরণ করে অনলাইনে তথ্য জমা দিতে হবে। উপজেলা/থানা মাধ্যমিক শিক্ষা কর্মকর্তা সংশ্লিষ্ট সব প্রতিষ্ঠানকে বিষয়টি অবহিত করবেন এবং শ্রেণি শিক্ষক শিক্ষার্থী ও অভিভাবককে হালনাগাদ তথ্য জানাবেন।
কারা পাবেন উপবৃত্তি ২০২৬
উপবৃত্তি পাওয়ার জন্য শুধু আবেদন করাই যথেষ্ট নয়, নির্দিষ্ট কিছু শর্ত পূরণ করতে হবে। নোটিশ ও পূর্ববর্তী নির্দেশিকার আলোকে যোগ্যতার প্রধান শর্তগুলো হলো—
- শিক্ষার্থীকে অবশ্যই দরিদ্র/অসচ্ছল পরিবারের সদস্য হতে হবে।
- শ্রেণিকক্ষে মাসিক গড় উপস্থিতি কমপক্ষে ৮০ শতাংশ থাকতে হবে।
- বার্ষিক পরীক্ষায় সন্তোষজনক ফলাফল থাকতে হবে।
- শিক্ষার্থী অন্য কোনো সরকারি উৎস থেকে উপবৃত্তি বা অভিভাবক শিক্ষাভাতা গ্রহণ করলে যোগ্য বিবেচিত হবেন না।
- একই পরিবারের একাধিক শিক্ষার্থীর ক্ষেত্রে নির্দিষ্ট নিয়ম প্রযোজ্য হবে।
- নবম শ্রেণির শিক্ষার্থী শুধু ‘বিশেষ ক্ষেত্র’ ব্যতীত সাধারণ ক্যাটাগরিতে আবেদন করতে পারবেন না।
উল্লেখ্য, একাদশ শ্রেণির ক্ষেত্রে নতুন ভর্তি হওয়া শিক্ষার্থীদের অগ্রাধিকার দেওয়া হবে এবং মেয়ে শিক্ষার্থী, প্রতিবন্ধী ও পিছিয়ে পড়া জনগোষ্ঠীর শিক্ষার্থীদের নির্বাচনে বাড়তি গুরুত্ব দেওয়ার কথা বলা হয়েছে।
আবেদন পদ্ধতি: ধাপে ধাপে
উপবৃত্তির আবেদন প্রক্রিয়াটি সরাসরি শিক্ষার্থী নয়, বরং শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের মাধ্যমে সম্পন্ন হয়। ধাপগুলো নিম্নরূপ—
১. প্রথমে শিক্ষা প্রতিষ্ঠান থেকে নির্ধারিত উপবৃত্তির আবেদন ফরম সংগ্রহ করতে হবে।
২. অভিভাবকের পেশা, আয়, পরিবারের সদস্য সংখ্যা, পিতা-মাতার শিক্ষাগত যোগ্যতাসহ সব তথ্য সঠিকভাবে পূরণ করতে হবে।
৩. শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের প্রধানের কাছে ফরম জমা দিতে হবে।
৪. প্রতিষ্ঠান প্রধান যাচাই-বাছাই শেষে যোগ্য শিক্ষার্থীদের তালিকা তৈরি করবেন।
৫. অনুমোদিত তথ্য HSP-MIS পোর্টালে (pmeat.gov.bd) নির্ধারিত সময়ের মধ্যে এন্ট্রি করা হবে।
৬. এন্ট্রির পর তথ্য যাচাই ও অনুমোদন প্রক্রিয়া সম্পন্ন হলে শিক্ষার্থীদের চূড়ান্ত তালিকা তৈরি হবে।
শিক্ষার্থী ও অভিভাবকদের প্রতি পরামর্শ—ফরমে দেওয়া কোনো তথ্য যেন ভুল না হয়, বিশেষ করে শিক্ষার্থীর নাম, জন্মনিবন্ধন/এনআইডি, রেজিস্ট্রেশন নম্বর ও নগদ অ্যাকাউন্ট নম্বর। রেজিস্ট্রেশন নম্বর ছাড়া কোনো শিক্ষার্থীর তথ্য HSP-MIS-এ এন্ট্রি করা যাবে না বলে ইতোমধ্যে জানানো হয়েছে।
প্রয়োজনীয় কাগজপত্র
আবেদনের সময় সাধারণত যেসব কাগজপত্র লাগে—
- শিক্ষার্থীর জন্মনিবন্ধন সনদের কপি
- অভিভাবকের এনআইডি কার্ডের কপি
- সর্বশেষ শ্রেণির ফলাফলের প্রমাণপত্র
- শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের প্রত্যয়ন
- অভিভাবকের আয়ের প্রমাণপত্র (যেখানে প্রযোজ্য)
- শিক্ষার্থী বা অভিভাবকের নামে খোলা নগদ অ্যাকাউন্টের নম্বর
- ২ কপি পাসপোর্ট সাইজের ছবি
টাকা বিতরণ: কারা কীভাবে পাবেন
সবচেয়ে বড় পরিবর্তনটি এসেছে টাকা বিতরণ পদ্ধতিতে। HSP-MIS সফটওয়্যারে ইতোমধ্যে যেসব শিক্ষার্থীর ‘নগদ’ বা ব্যাংক হিসাব যুক্ত আছে, তাদের অ্যাকাউন্টে সরাসরি টাকা চলে যাবে। যাদের এখনো নগদ অ্যাকাউন্ট খোলা হয়নি, তাদের অ্যাকাউন্ট খোলার পর কিস্তির অর্থ ছাড় করা হবে।
এ কারণে যেসব শিক্ষার্থী এখনো নগদ অ্যাকাউন্ট খোলেননি, তারা যেন দ্রুত অভিভাবকের সহায়তায় নিজ নামে বা অভিভাবকের নামে নগদ হিসাব খুলে ফেলেন—এমন পরামর্শ দিয়েছেন সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা। পাশাপাশি নিবন্ধিত মোবাইল নম্বরের সিমটি সচল রাখা জরুরি, কারণ বন্ধ সিমে টাকা পৌঁছালেও তা তোলা যায় না।
প্রতারক চক্র থেকে সতর্ক থাকুন
উপবৃত্তির টাকা ছাড় হওয়ার সময় প্রতিবছরই একটি প্রতারক চক্র সক্রিয় হয়ে ওঠে। তারা নিজেদের ‘শিক্ষা বোর্ড’, ‘শিক্ষা অধিদপ্তর’ কিংবা ‘নগদ কাস্টমার কেয়ার’-এর প্রতিনিধি পরিচয়ে ফোন করে পিন কোড, ওটিপি বা অ্যাকাউন্টের গোপন তথ্য চায়।
এই বিষয়ে স্পষ্টভাবে জানিয়ে দেওয়া হয়েছে—
- শিক্ষা বোর্ড বা কোনো সরকারি দপ্তর কখনোই পিন বা ওটিপি চেয়ে ফোন করবে না।
- অ্যাকাউন্টে সমস্যা হলে সমাধান দেবেন শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের প্রধান শিক্ষক, নগদ কাস্টমার কেয়ার নয়।
- অজানা নম্বর থেকে ফোন এলে কোনো তথ্য শেয়ার না করে সঙ্গে সঙ্গে কল কেটে দেওয়া উচিত।
অভিভাবকদের জন্য কিছু জরুরি পরামর্শ
- সন্তানের ক্লাসে নিয়মিত উপস্থিতি নিশ্চিত করুন—নাহলে পরবর্তী কিস্তির উপবৃত্তি বন্ধ হয়ে যেতে পারে।
- HSP-MIS-এ এন্ট্রি করা তথ্য প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে যোগাযোগ করে অন্তত একবার যাচাই করুন।
- নগদ অ্যাকাউন্টের পিন সম্পূর্ণ গোপন রাখুন।
- মোবাইল নম্বর পরিবর্তন করলে দ্রুত প্রতিষ্ঠানকে জানিয়ে হালনাগাদ করান।
- ভুল তথ্য বা মিথ্যা কাগজপত্র জমা দিলে ভবিষ্যতে উপবৃত্তি বাতিল হতে পারে।
সচরাচর জিজ্ঞাসা (FAQ)
প্রশ্ন ১: উপবৃত্তি ২০২৬-এর টাকা কবে দেওয়া হবে?
উত্তর: নোটিশ অনুযায়ী তথ্য এন্ট্রি ও যাচাই-বাছাই শেষে ধাপে ধাপে টাকা ছাড় করা হবে। সঠিক তারিখ প্রতিষ্ঠান থেকে জানানো হবে।
প্রশ্ন ২: ৬ষ্ঠ শ্রেণির নতুন শিক্ষার্থী কি সরাসরি আবেদন করতে পারবে?
উত্তর: হ্যাঁ, তবে আবেদন প্রক্রিয়া সম্পন্ন হবে শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের মাধ্যমে। শিক্ষার্থী ফরম পূরণ করে প্রতিষ্ঠানে জমা দেবে, বাকিটা প্রতিষ্ঠান করবে।
প্রশ্ন ৩: ৯ম শ্রেণির শিক্ষার্থী কি নতুন করে আবেদন করতে পারবে?
উত্তর: সাধারণভাবে না। শুধু ‘বিশেষ ক্ষেত্রে’ নির্ধারিত শিক্ষার্থীরা এ সুযোগ পাবে।
প্রশ্ন ৪: HSP-MIS পোর্টালের ঠিকানা কী?
উত্তর: প্রধানমন্ত্রীর শিক্ষা সহায়তা ট্রাস্টের অফিসিয়াল ওয়েবসাইট pmeat.gov.bd থেকে HSP-MIS-এ প্রবেশ করা যায়।
প্রশ্ন ৫: আবেদন করেও উপবৃত্তি না পেলে করণীয় কী?
উত্তর: প্রথমে শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের প্রধান বা উপবৃত্তি সংশ্লিষ্ট শিক্ষকের সঙ্গে যোগাযোগ করতে হবে। প্রয়োজনে উপজেলা মাধ্যমিক শিক্ষা কর্মকর্তার অফিসে অভিযোগ জানানো যাবে।
শেষ কথা
সমন্বিত উপবৃত্তি কর্মসূচি দেশের অসংখ্য দরিদ্র ও মেধাবী শিক্ষার্থীর পড়াশোনা চালিয়ে যাওয়ার সবচেয়ে বড় ভরসা। ৬ষ্ঠ থেকে ১২শ শ্রেণীর উপবৃত্তি সংক্রান্ত নোটিশ ২০২৬ সেই পথচলাকেই আরও সুশৃঙ্খল, প্রযুক্তিনির্ভর ও স্বচ্ছ করার একটি ধাপ। শিক্ষার্থী, অভিভাবক ও শিক্ষা প্রতিষ্ঠান—তিন পক্ষ যদি সময়মতো নিজ নিজ দায়িত্ব পালন করে, তবে উপবৃত্তির অর্থ প্রকৃত প্রাপ্যদের হাতে যথাসময়ে পৌঁছানো সম্ভব।
তাই সর্বশেষ নোটিশ ও নির্দেশনা নিয়মিত অনুসরণ করুন, প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে যোগাযোগ রাখুন এবং যেকোনো প্রতারণামূলক ফোন থেকে সচেতন থাকুন। আপনার সন্তানের শিক্ষা—আপনার সচেতনতাতেই সুরক্ষিত।
