নতুন পে-স্কেল ২০২৬: ৫০% বাস্তবায়নে ১৬তম গ্রেডে বাড়তি মাত্র ৬৫০ টাকা? কেন বাড়ছে ক্ষোভ

সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারীদের জন্য প্রস্তাবিত নতুন পে-স্কেল ২০২৬-২৭ অর্থবছরের শুরু, অর্থাৎ ১ জুলাই থেকে আংশিক বাস্তবায়নের আলোচনা জোরালো হয়েছে। পরিকল্পনা অনুযায়ী প্রথম ধাপে মূল বেতনের ৫০ শতাংশ কার্যকর হতে পারে। তবে এই প্রক্রিয়ায় ১৬তম গ্রেডের কর্মচারীদের জন্য যে হিসাব সামনে আসছে, তা অনেকের কাছেই হতাশাজনক। আলোচিত এক গাণিতিক উদাহরণ অনুযায়ী, নিয়মিত ইনক্রিমেন্টের পর যে অঙ্ক পাওয়ার কথা, তার তুলনায় নতুন ব্যবস্থায় অতিরিক্ত সুবিধা দাঁড়াতে পারে মাত্র ৬৫০ টাকা। এ কারণেই নিম্ন গ্রেডের কর্মচারীদের মধ্যে প্রশ্ন উঠেছে—এটিই কি তাহলে বহু প্রতীক্ষিত বেতন-স্বস্তি?

সরকারি চাকরিজীবীদের নতুন বেতন কাঠামো নিয়ে সাম্প্রতিক বিভিন্ন প্রতিবেদনে বলা হচ্ছে, পুরো প্রস্তাব বাস্তবায়ন একবারে না করে ধাপে ধাপে করা হতে পারে। আলোচনায় আছে, প্রথম বছরে মূল বেতনের ৫০ শতাংশ, পরের বছরে বাকি ৫০ শতাংশ এবং এরপর ভাতাগুলো সমন্বয় করা হতে পারে। একই সঙ্গে প্রস্তাবিত কাঠামোয় সর্বনিম্ন মূল বেতন ২০ হাজার টাকা এবং সর্বোচ্চ মূল বেতন ১ লাখ ৬০ হাজার টাকা করার সুপারিশের তথ্যও সামনে এসেছে।

১৬তম গ্রেড নিয়ে কেন এত আলোচনা

সবচেয়ে বেশি আলোচনা হচ্ছে ১৬তম গ্রেডের কর্মচারীদের উদাহরণটি ঘিরে। কারণ, এই গ্রেডে কাজ করা বহু কর্মচারীর বর্তমান বেসিক দীর্ঘদিনের ইনক্রিমেন্টের কারণে প্রারম্ভিক ধাপের চেয়ে কিছুটা বেশি। ফলে নতুন পে-স্কেল এলে শুধু নতুন স্কেলের প্রারম্ভিক অঙ্ক ধরলেই প্রকৃত চিত্র বোঝা যায় না; আগের ইনক্রিমেন্টের সুবিধাও নতুন কাঠামোয় কীভাবে ধরা হবে, সেটিই এখানে মূল বিষয়।

আলোচিত হিসাব অনুযায়ী, ১৬তম গ্রেডের একজন কর্মচারীর বর্তমান বেসিক যদি ১০,২৬০ টাকা হয়, তাহলে প্রথমে ধরা হচ্ছে তার গ্রেডের পুরোনো প্রারম্ভিক মূল বেতন ৯,৩০০ টাকা। অর্থাৎ, প্রারম্ভিক ধাপের ওপরে তিনি বাড়তি ৯৬০ টাকা ইনক্রিমেন্ট পেয়েছেন। এরপর নতুন স্কেলে ১৬তম গ্রেডের আলোচিত প্রারম্ভিক অঙ্কের সঙ্গে ওই ৯৬০ টাকা যোগ করে সংশোধিত বেসিক ২২,৮৬০ টাকা ধরা হয়েছে।

এই ২২,৮৬০ টাকার ৫০ শতাংশ কার্যকর হলে অঙ্ক দাঁড়ায় ১১,৪৩০ টাকা। কাগজে-কলমে এটি অবশ্যই বর্তমান ১০,২৬০ টাকার চেয়ে বেশি। কিন্তু এখানেই শেষ নয়। কারণ, জুলাই মাসে নিয়মিত বার্ষিক ইনক্রিমেন্ট ধরলে ওই কর্মচারীর বেতন এমনিতেই ১০,৭৮০ টাকায় পৌঁছাতে পারে। ফলে ৫০ শতাংশ বাস্তবায়নের পর নতুন অঙ্ক ১১,৪৩০ টাকা থেকে এই ১০,৭৮০ টাকা বাদ দিলে বাস্তব বাড়তি সুবিধা থাকে মাত্র ৬৫০ টাকা।

কেন একে ‘তামাশার চিত্র’ বলছেন অনেকে

নিম্ন গ্রেডের কর্মচারীদের অনেকের অভিযোগ, নতুন পে-স্কেলের আলোচনায় বড় অঙ্কের বেতন বৃদ্ধির কথা বলা হলেও বাস্তবে ধাপে ধাপে বাস্তবায়নের ফলে হাতে যে বাড়তি অর্থ আসবে, তা খুবই সীমিত হতে পারে। বিশেষ করে ১৬তম গ্রেডের মতো স্তরে, যেখানে কর্মচারীরা আগে থেকেই কয়েকটি ইনক্রিমেন্ট নিয়ে চাকরি করছেন, সেখানে ৫০ শতাংশ বাস্তবায়নের সুবিধা অনেকটাই খেয়ে ফেলছে আগের বেতনধাপের স্বাভাবিক অগ্রগতি।

এ কারণেই অনেক কর্মচারী প্রশ্ন তুলছেন, যদি নতুন কাঠামোর ঘোষিত সুফল বাস্তবে প্রথম ধাপে খুব সামান্য হয়, তাহলে নিম্ন গ্রেডের কর্মীদের জন্য এর তাৎপর্য কোথায়? বাজারদর, বাসাভাড়া, চিকিৎসা ব্যয় ও নিত্যপ্রয়োজনীয় জিনিসের মূল্যবৃদ্ধির সঙ্গে তুলনা করলে এই অতিরিক্ত ৬৫০ টাকা যে খুব বড় স্বস্তি দিতে পারবে না, সে কথাও জোর দিয়ে বলা হচ্ছে।

প্রস্তাবিত নতুন কাঠামোয় বড় ছবি কী

নতুন বেতন কাঠামোর আলোচনায় সবচেয়ে বড় পরিবর্তন হিসেবে যে বিষয়গুলো সামনে এসেছে, তার মধ্যে রয়েছে—২০টি গ্রেড বহাল রাখা, সর্বনিম্ন বেতন ৮ হাজার ২৫০ টাকা থেকে ২০ হাজার টাকায় উন্নীত করার প্রস্তাব, সর্বোচ্চ বেতন ৭৮ হাজার টাকা থেকে ১ লাখ ৬০ হাজার টাকায় নেওয়ার সুপারিশ, এবং কিছু ভাতা পুনর্বিন্যাসের আলোচনা। বৈশাখী ভাতা বাড়ানোর প্রস্তাবও আলোচনায় রয়েছে। অর্থাৎ সামগ্রিকভাবে কাঠামোটি কর্মচারীদের জন্য বড় ধরনের পরিবর্তনের ইঙ্গিত দিচ্ছে।

তবে বাস্তব প্রশ্ন হচ্ছে, এই পরিবর্তনের ফল কে কখন কতটা পাবেন। কারণ, সব গ্রেডে একইভাবে প্রভাব পড়ছে না। উচ্চ গ্রেডে বেতন বৃদ্ধির অঙ্ক বড় দেখালেও নিম্ন ও মধ্যম স্তরের কর্মচারীদের কাছে মাস শেষে হাতে আসা টাকার বাস্তব পার্থক্যই বেশি গুরুত্বপূর্ণ। ১৬তম গ্রেডের আলোচিত হিসাবটি তাই শুধু একটি সংখ্যার গল্প নয়; এটি নিচের স্তরের কর্মচারীদের প্রত্যাশা ও হতাশার প্রতীক হয়ে উঠেছে।

একটি গুরুত্বপূর্ণ সতর্কতা

এখানে মনে রাখা জরুরি, নতুন পে-স্কেলের চূড়ান্ত প্রজ্ঞাপন এখনো প্রকাশ হয়নি। বিভিন্ন মাধ্যমে যে হিসাব ও বিশ্লেষণ ঘুরছে, তার কিছু অংশ প্রস্তাবিত কাঠামো, কিছু অংশ সম্ভাব্য বাস্তবায়নপদ্ধতি, আর কিছু অংশ ব্যাখ্যামূলক উদাহরণ। ফলে ১৬তম গ্রেডের নির্দিষ্ট অঙ্ক বা ধাপভিত্তিক বেতন পুনর্নির্ধারণের চূড়ান্ত ছবি জানতে হলে সরকারি সিদ্ধান্ত ও প্রজ্ঞাপনের দিকেই তাকিয়ে থাকতে হবে।

শেষ কথা

সরকারি কর্মচারীদের নতুন পে-স্কেল ২০২৬ নিঃসন্দেহে বড় আলোচনার বিষয়। কিন্তু ৫০ শতাংশ আংশিক বাস্তবায়নের মডেলে ১৬তম গ্রেডের কর্মচারীদের জন্য যদি প্রকৃত বাড়তি সুবিধা মাত্র ৬৫০ টাকার মতো হয়, তাহলে সেটি স্বস্তির চেয়ে অসন্তোষই বাড়াবে—এমন আশঙ্কা উড়িয়ে দেওয়া যায় না। তাই শুধু বড় অঙ্কের ঘোষণাই নয়, নিচের গ্রেডের কর্মচারীরা বাস্তবে কতটা উপকৃত হবেন, সেটিই এখন সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন। চূড়ান্ত সিদ্ধান্তে যদি এই স্তরের কর্মচারীদের আর্থিক বাস্তবতা গুরুত্ব পায়, তবেই নতুন পে-স্কেল নিয়ে তৈরি হওয়া প্রত্যাশা অর্থবহ হবে।

নিলয় আহমেদ
নিলয় আহমেদ
নিলয় আহম্মেদ শিক্ষা বিষয়ক প্রতিবেদক। তিনি বাংলা বিষয়ে স্নাতকোত্তর সম্পন্ন করেছেন। পরীক্ষা, ভর্তি ও শিক্ষানীতি সংক্রান্ত তথ্য নিয়ে কাজ করেন। তথ্য যাচাই করে সংক্ষিপ্ত ও পরিষ্কারভাবে উপস্থাপন করাই তার প্রধান দায়িত্ব।
রিলেটেড আরটিকেল

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here

- Advertisment -

জনপ্রিয় নিউজ