ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় দেশের প্রাচীনতম ও সবচেয়ে নামকরা শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান। ১৯২১ সালে প্রতিষ্ঠিত এই বিশ্ববিদ্যালয় একসময় ‘প্রাচ্যের অক্সফোর্ড’ হিসেবে খ্যাত ছিল। কিন্তু আজকের বিশ্বমানের র্যাংকিং-এ ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অবস্থান কোথায়? আর সেই বিশ্বমান অর্জন করা কি আদৌ সম্ভব?
বর্তমান অবস্থান: র্যাংকিং-এ কোথায় দাঁড়িয়ে আছে ঢাবি?
কিউএস ওয়ার্ল্ড ইউনিভার্সিটি র্যাংকিং ২০২৬-এ ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অবস্থান ৫৮ৄতম স্থানে। গত বছর এই অবস্থান ছিল ৫৫৪তম। অর্থাৎ ৩০ ধাপ পিছিয়ে গেছে এই বিশ্ববিদ্যালয়। প্রথম আলো
অন্যদিকে ওয়েবমেট্রিক্স র্যাংকিং-এ বিশ্বে ঢাবির অবস্থান ১১২৮তম। এটি গত বছরের ১০৫১তম অবস্থান থেকে আরও পিছিয়ে যাওয়া। তবে আশার কথা হলো, দেশের মধ্যে এখনও শীর্ষস্থানে রয়েছে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়।
বিশ্বের বিখ্যাত র্যাংকিং সংস্থাগুলোর তালিকায় ঢাবির এই অবস্থান দেখে প্রশ্ন উঠেছে – এই বিশ্ববিদ্যালয় কি আর আগের গৌরব ফিরে পাবে?
কেন পিছিয়ে আছে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়?
গবেষণার দুর্বলতা হলো প্রধান সমস্যা। ঢাবির বার্ষিক বাজেট মাত্র ১৫ কোটি টাকা, যা একটি ১০৩ বছরের পুরনো বিশ্ববিদ্যালয়ের জন্য অপর্যাপ্ত। ঢাকা মেইল
মূল সমস্যাগুলো:
অবকাঠামোগত সমস্যা: পুরনো ভবন, অপর্যাপ্ত ল্যাবরেটরি এবং আধুনিক যন্ত্রপাতির অভাব। ঢাবির কোষাধ্যক্ষ অধ্যাপক মমতাজ উদ্দিন আহমেদের ভাষায়, “গবেষণায় ততটুকুই করা সম্ভব যতটুকু বাজেট রয়েছে।”
শিক্ষক সংকট: আন্তর্জাতিক মানের শিক্ষক এবং গবেষকদের অভাব। অনেক যোগ্য শিক্ষক বিদেশে চলে যাচ্ছেন উন্নত সুবিধার জন্য।
গবেষণা পরিবেশ: গবেষণাবান্ধব পরিবেশ তৈরি করতে না পারা। ল্যাবরেটরি ও কম্পিউটারের সীমিত ব্যবহারের সুযোগ শিক্ষার্থীদের দক্ষতা বিকাশে বাধা দেয়।
আন্তর্জাতিক সহযোগিতার অভাব: বিদেশি বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর সাথে পর্যাপ্ত গবেষণা সহযোগিতা এবং শিক্ষার্থী বিনিময় কর্মসূচির অভাব।
বিশ্বমানে পৌঁছানোর সম্ভাবনা: স্বপ্ন নাকি বাস্তবতা?
বিশেষজ্ঞদের মতে, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের বিশ্বমান অর্জন করা সম্ভব, তবে এর জন্য প্রয়োজন পরিকল্পিত সংস্কার। প্রথম আলো
যে পথে এগুতে হবে:
কারিকুলাম আধুনিকীকরণ: বিশ্বমানের সিলেবাস তৈরি করতে হবে যা আন্তর্জাতিক চাহিদা মেটাতে পারে। প্রতিটি বিভাগের কোর্স এমনভাবে সাজাতে হবে যেন গ্র্যাজুয়েটরা বিশ্বের যে কোনো প্রতিষ্ঠানে কাজ করতে পারে।
গবেষণা বৃদ্ধি: গবেষণা বাজেট বাড়াতে হবে এবং আধুনিক ল্যাবরেটরি স্থাপন করতে হবে। বর্তমানে ঢাবি ২৮৪০ কোটি টাকার উন্নয়ন প্রকল্প পেয়েছে, যা সঠিকভাবে ব্যবহার করলে অবকাঠামো উন্নয়ন সম্ভব। দৈনিক ইত্তেফাক
আন্তর্জাতিক সহযোগিতা: বিদেশি বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর সাথে যৌথ গবেষণা, শিক্ষক-শিক্ষার্থী বিনিময় এবং ক্রেডিট ট্রান্সফার কর্মসূচি চালু করতে হবে।
মানসম্পদ উন্নয়ন: বিশ্বমানের শিক্ষক নিয়োগ দিতে হবে এবং প্রশিক্ষণের ব্যবস্থা করতে হবে। দেশে ও বিদেশে অবস্থানরত যোগ্য শিক্ষাবিদদের এই প্রতিষ্ঠানের সাথে যুক্ত করতে হবে।
সরকারি উদ্যোগ ও পরিকল্পনা
সরকার ইতিমধ্যে উচ্চশিক্ষার মান উন্নয়নে কিছু পদক্ষেপ নিয়েছে। ‘হিট’ (Higher Education Acceleration and Transformation) প্রকল্প এর মাধ্যমে বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর গবেষণা কার্যক্রম জোরদার করার চেষ্টা চলছে।
বিশ্ববিদ্যালয় মঞ্জুরি কমিশন (ইউজিসি) উন্নয়ন প্রকল্পগুলো যথাসময়ে শেষ করার জন্য বিশ্ববিদ্যালয়গুলোকে নির্দেশনা দিয়েছে। বাংলা ট্রিবিউন
বিশেষজ্ঞদের সুপারিশ
শিক্ষাবিদরা বলছেন, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের বিশ্বমান অর্জনের জন্য সাতটি মূল পদক্ষেপ নিতে হবে:
প্রথমত, বিশ্বমানের কারিকুলাম তৈরি করতে হবে এবং নিয়মিত আপডেট করতে হবে।
দ্বিতীয়ত, বিশেষায়িত বিষয় (যেমন ডেটা সাংবাদিকতা, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা) নিয়ে আলাদা মেজর চালু করতে হবে।
তৃতীয়ত, সাফল্যের মাপকাঠি নির্ধারণ করতে হবে। যেমন: কতজন গ্র্যাজুয়েট আন্তর্জাতিক প্রতিষ্ঠানে কাজ পাচ্ছে।
চতুর্থত, বিদেশি শিক্ষক নিয়োগ দিতে হবে এবং দেশীয় প্রবাসী শিক্ষাবিদদের ফিরিয়ে আনতে হবে।
পঞ্চমত, ইংরেজি মাধ্যমে পড়াশোনা এবং আন্তর্জাতিক মানের পরীক্ষা পদ্ধতি চালু করতে হবে।
ষষ্ঠত, বিদেশি বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর সাথে ক্রেডিট ট্রান্সফার এবং যৌথ ডিগ্রি প্রোগ্রাম চালু করতে হবে।
সপ্তমত, স্বল্প, মধ্যম ও দীর্ঘমেয়াদী কর্মপরিকল্পনা প্রণয়ন ও বাস্তবায়ন করতে হবে।
চ্যালেঞ্জ ও বাস্তবতা
আর্থিক সংকট সবচেয়ে বড় বাধা। গবেষণা খাতে পর্যাপ্ত বরাদ্দ না থাকলে বিশ্বমানের গবেষণা সম্ভব নয়। প্রথম আলো
রাজনৈতিক হস্তক্ষেপ এবং দলীয় বিবেচনায় নিয়োগ প্রক্রিয়াও মেধাভিত্তিক উন্নয়নে বাধা সৃষ্টি করে। বণিক বার্তা
আন্তর্জাতিক সহযোগিতার অভাব এবং ভাষাগত দক্ষতার কমতি আরেকটি প্রধান সমস্যা।
আশার আলো: সাম্প্রতিক অগ্রগতি
তবে আশাব্যঞ্জক কিছু পরিবর্তনও লক্ষ্য করা যাচ্ছে। কিউএস এশিয়া র্যাংকিং-এ ঢাবি ২৮ ধাপ এগিয়ে ১১২তম অবস্থানে পৌঁছেছে। প্রথম আলো
ডিজিটাল বাংলাদেশ এবং স্মার্ট বাংলাদেশ কর্মসূচির অংশ হিসেবে অটোমেশন প্রক্রিয়া শুরু হয়েছে, যা প্রশাসনিক দক্ষতা বৃদ্ধিতে সহায়ক হবে।
উপসংহার: স্বপ্ন পূরণের সম্ভাবনা
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় কি বিশ্বমানে পৌঁছাতে পারবে? উত্তর হলো – হ্যাঁ, পারবে। তবে এর জন্য প্রয়োজন সমন্বিত প্রচেষ্টা, পর্যাপ্ত বিনিয়োগ এবং দীর্ঘমেয়াদী পরিকল্পনা।
বিশ্বের সেরা বিশ্ববিদ্যালয়গুলো একদিনেই গড়ে উঠেনি। হার্ভার্ড, এমআইটি, অক্সফোর্ড – এই প্রতিষ্ঠানগুলোর শতবর্ষের ইতিহাস রয়েছে। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়েরও ১০৩ বছরের ঐতিহ্য রয়েছে।
মূল কথা হলো, পরিকল্পিত সংস্কার, যথাযথ বিনিয়োগ এবং মেধাভিত্তিক পরিচালনার মাধ্যমে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় আবারও বিশ্বমানের প্রতিষ্ঠান হিসেবে প্রতিষ্ঠিত হতে পারে। তবে এর জন্য রাজনৈতিক সদিচ্ছা, পর্যাপ্ত বাজেট এবং আন্তর্জাতিক মানের শিক্ষা ব্যবস্থা গড়ে তোলা অত্যন্ত জরুরি।
ভবিষ্যতের ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় হতে পারে দক্ষিণ এশিয়ার শ্রেষ্ঠ শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান, যদি আমরা আজকেই সঠিক পদক্ষেপ নিতে পারি।
