দেশের লাখ লাখ নবম ও দশম শ্রেণির শিক্ষার্থীদের জন্য বড় একটি সুখবর এসেছে। আগামী ২০২৬ সালের নতুন শিক্ষাবর্ষের জন্য সরকার বিনামূল্যে পাঠ্যপুস্তক ছাপানোর অনুমোদন দিয়েছে। এই সিদ্ধান্তে মোট সাড়ে পাঁচ কোটিরও বেশি বই ছাপা হবে, যা শিক্ষার্থীদের হাতে বিনা খরচে পৌঁছে দেওয়া হবে।
মঙ্গলবার (১৪ অক্টোবর) সচিবালয়ে মন্ত্রিপরিষদ বিভাগের সম্মেলন কক্ষে অনুষ্ঠিত সরকারি ক্রয় সংক্রান্ত উপদেষ্টা পরিষদ কমিটির বৈঠকে এই গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। বৈঠকে অর্থ উপদেষ্টা ড. সালেহউদ্দিন আহমেদ ভার্চ্যুয়ালি অংশগ্রহণ করেন এবং কমিটির সভাপতিত্ব করেন।
কত বই ছাপানো হবে এবং কাদের জন্য?
মাধ্যমিক ও উচ্য শিক্ষা বিভাগ থেকে জানানো হয়েছে যে, এবারের এই পাঠ্যপুস্তক ছাপানোর প্রকল্পে বিভিন্ন ধরনের শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের শিক্ষার্থীদের কথা মাথায় রাখা হয়েছে। শুধু সাধারণ মাধ্যমিক স্কুলের শিক্ষার্থীরাই নয়, মাদ্রাসা ও কারিগরি শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের শিক্ষার্থীরাও এই সুবিধা পাবে।
বৈঠক সূত্রে জানা যায়, মাধ্যমিক বাংলা ও ইংরেজি ভার্সন নবম শ্রেণি, দাখিল নবম শ্রেণি, এসএসসি ও দাখিল ভোকেশনাল নবম শ্রেণি এবং কারিগরি ট্রেড নবম ও দশম শ্রেণির জন্য মোট ৫ কোটি ৫৪ লাখ ৯০ হাজার ৮৬৯টি পাঠ্যপুস্তক মুদ্রণ, বাঁধাই এবং সরবরাহ করা হবে। এই বিশাল সংখ্যক বই নিশ্চিত করবে যে দেশের প্রতিটি কোণায় শিক্ষার্থীরা তাদের বিনামূল্যের পাঠ্যবই পাবে।
কত টাকা খরচ হবে এই প্রকল্পে?
শিক্ষার্থীদের জন্য বিনামূল্যে বই সরবরাহ করা হলেও সরকারকে এর জন্য একটি বড় অঙ্কের অর্থ ব্যয় করতে হবে। উপদেষ্টা পরিষদ কমিটি প্রস্তাবটি পর্যালোচনা করে অনুমোদন দেওয়ার পর জানা গেছে যে, ২২৩টি দরপত্রের মাধ্যমে এসব পাঠ্যপুস্তক মুদ্রণ করা হবে।
এই পুরো প্রকল্পে মোট ব্যয় হবে ৪৭৯ কোটি ৮২ লাখ ৪৪ হাজার ৯২৭ টাকা। এই বিশাল অঙ্কের অর্থ খরচ করে সরকার নিশ্চিত করতে চায় যে, দেশের প্রতিটি শিক্ষার্থী যেন নির্দিষ্ট সময়ে তাদের পাঠ্যপুস্তক পায় এবং শিক্ষা কার্যক্রম যেন সঠিকভাবে চলতে পারে।
গুরুত্বপূর্ণ তথ্য এক নজরে
| বিষয় | বিস্তারিত তথ্য |
|---|---|
| মোট বইয়ের সংখ্যা | ৫ কোটি ৫৪ লাখ ৯০ হাজার ৮৬৯টি |
| শিক্ষাবর্ষ | ২০২৬ খ্রিষ্টাব্দ |
| যে শ্রেণির জন্য | নবম ও দশম শ্রেণি (বিভিন্ন শাখা) |
| মোট ব্যয় | ৪৭৯ কোটি ৮২ লাখ ৪৪ হাজার ৯২৭ টাকা |
| দরপত্র সংখ্যা | ২২৩টি |
| অনুমোদনের তারিখ | ১৪ অক্টোবর (মঙ্গলবার) |
| অনুমোদনকারী কমিটি | সরকারি ক্রয় সংক্রান্ত উপদেষ্টা পরিষদ কমিটি |
| সভাপতি | অর্থ উপদেষ্টা ড. সালেহউদ্দিন আহমেদ |
কোন কোন শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের শিক্ষার্থীরা পাবে?
এই বিনামূল্যে পাঠ্যবই বিতরণ কর্মসূচিতে বিভিন্ন ধরনের শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের শিক্ষার্থীদের অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে। মাধ্যমিক স্কুলের বাংলা মাধ্যম এবং ইংরেজি ভার্সনের শিক্ষার্থীরা তাদের নির্ধারিত বই পাবে। পাশাপাশি মাদ্রাসা শিক্ষার দাখিল নবম শ্রেণির শিক্ষার্থীরাও এই সুবিধার আওতায় আসবে।
শুধু তাই নয়, এসএসসি ভোকেশনাল এবং দাখিল ভোকেশনাল শিক্ষার্থীদের জন্যও আলাদা বই ছাপানো হবে। এছাড়া কারিগরি শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের ট্রেড কোর্সের নবম ও দশম শ্রেণির শিক্ষার্থীরাও তাদের প্রয়োজনীয় পাঠ্যপুস্তক পাবে। এভাবে সরকার নিশ্চিত করতে চায় যে, শিক্ষার কোনো শাখাই যেন বাদ না পড়ে।
কীভাবে বই ছাপানো এবং সরবরাহ করা হবে?
পাঠ্যপুস্তক মুদ্রণ, বাঁধাই ও সরবরাহের এই বিশাল প্রকল্প বাস্তবায়নের জন্য সরকার স্বচ্ছ পদ্ধতি অনুসরণ করছে। মোট ২২৩টি দরপত্রের মাধ্যমে বিভিন্ন মুদ্রণ প্রতিষ্ঠান নির্বাচন করা হবে, যারা নির্দিষ্ট মান বজায় রেখে এই বইগুলো ছাপাবে।
প্রতিটি বই মুদ্রণ করার পর সঠিকভাবে বাঁধাই করা হবে, যাতে বইগুলো টেকসই এবং দীর্ঘদিন ব্যবহারযোগ্য হয়। এরপর এই বইগুলো দেশের বিভিন্ন শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে সরবরাহ করা হবে। লক্ষ্য হলো নতুন শিক্ষাবর্ষ শুরুর আগেই সব শিক্ষার্থীর হাতে তাদের বই পৌঁছে দেওয়া।
শিক্ষার্থীদের জন্য কেন এটি গুরুত্বপূর্ণ?
দেশের অনেক পরিবারের জন্য সন্তানদের পাঠ্যবই কেনা একটি বড় আর্থিক চাপ। বিশেষ করে নবম-দশম শ্রেণিতে যখন বইয়ের সংখ্যা বেড়ে যায় এবং বই আকারে বড় হয়, তখন এর খরচও বেশি পড়ে। বিনামূল্যে পাঠ্যপুস্তক বিতরণের এই উদ্যোগ পরিবারগুলোর আর্থিক বোঝা অনেকাংশে কমিয়ে দেয়।
এছাড়া সময়মতো বই পাওয়া শিক্ষার্থীদের জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। অনেক সময় বাজারে বই না পাওয়া বা দেরিতে পাওয়ার কারণে শিক্ষার্থীদের পড়াশোনায় ব্যাঘাত ঘটে। সরকারের এই পরিকল্পিত পাঠ্যবই বিতরণ কর্মসূচি নিশ্চিত করবে যে, প্রতিটি শিক্ষার্থী নির্দিষ্ট সময়ে তাদের বই পাবে এবং পড়াশোনা শুরু করতে পারবে।
সরকারের শিক্ষা উন্নয়নে প্রতিশ্রুতি
এই বিশাল বাজেটের পাঠ্যবই মুদ্রণ প্রকল্প সরকারের শিক্ষা খাতে বিনিয়োগের একটি উজ্জ্বল উদাহরণ। প্রায় ৪৮০ কোটি টাকা খরচ করে সরকার প্রমাণ করছে যে, দেশের ভবিষ্যৎ প্রজন্মের শিক্ষার জন্য কোনো বিনিয়োগই বেশি নয়।
মাধ্যমিক ও উচ্চ শিক্ষা বিভাগ প্রতি বছর এই ধরনের উদ্যোগ নিয়ে থাকে, কিন্তু ২০২৬ সালের জন্য এই সংখ্যা বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য। সাড়ে পাঁচ কোটিরও বেশি বই একসঙ্গে ছাপানো এবং বিতরণ করা একটি চ্যালেঞ্জিং কাজ, কিন্তু সুষ্ঠু পরিকল্পনা ও বাস্তবায়নের মাধ্যমে এটি সফলভাবে সম্পন্ন করা সম্ভব।
শেষ কথা
নবম-দশম শ্রেণির সাড়ে ৫ কোটি বই ছাপানোর এই অনুমোদন দেশের শিক্ষা ব্যবস্থার জন্য একটি ইতিবাচক পদক্ষেপ। এটি নিশ্চিত করবে যে, দেশের প্রতিটি কোণায়, প্রতিটি ধরনের শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে পড়ুয়া শিক্ষার্থীরা তাদের বিনামূল্যের পাঠ্যবই পাবে।
আগামী ২০২৬ শিক্ষাবর্ষের জন্য এই প্রস্তুতি এখন থেকেই শুরু হয়ে গেছে। আশা করা যায়, সময়মতো মুদ্রণ, বাঁধাই ও সরবরাহ কাজ সম্পন্ন হবে এবং নতুন বছরের শুরুতেই শিক্ষার্থীরা তাদের নতুন বই নিয়ে পড়াশোনা শুরু করতে পারবে।
এই ধরনের সরকারি উদ্যোগ দেশের শিক্ষার মান উন্নয়নে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে এবং পরিবারগুলোর আর্থিক চাপ কমায়। শিক্ষাই জাতির মেরুদণ্ড, আর এই বিনামূল্যে পাঠ্যপুস্তক বিতরণ কর্মসূচি সেই মেরুদণ্ডকে আরও শক্তিশালী করার একটি পদক্ষেপ।
