ভর্তির আগেই এক বছরের সেশনজটে সেন্ট্রাল ইউনিভার্সিটির প্রথম ব্যাচের শিক্ষার্থীরা

রাজধানী ঢাকার সাত সরকারি কলেজ নিয়ে গঠিত ঢাকা সেন্ট্রাল ইউনিভার্সিটি এখন শিক্ষার্থীদের জন্য এক বড় সমস্যায় পরিণত হয়েছে। ২০২৪-২৫ শিক্ষাবর্ষের প্রথম ব্যাচের শিক্ষার্থীরা এখনো সম্পূর্ণভাবে ভর্তি প্রক্রিয়া শেষ করতে পারেনি। অন্যদিকে, দেশের অন্যান্য পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়গুলো ইতোমধ্যে ২০২৫-২৬ শিক্ষাবর্ষের ভর্তি পরীক্ষার প্রস্তুতি নিচ্ছে। এই পরিস্থিতিতে সেন্ট্রাল ইউনিভার্সিটির শিক্ষার্থীরা ভর্তির আগেই প্রায় এক বছরের সেশনজটে আটকে গেছে।

কী হয়েছিল সাত সরকারি কলেজে?

২০২৪ সালের মার্চ মাসে ঢাকার সাত সরকারি কলেজকে নতুন নামকরণ করা হয় ঢাকা সেন্ট্রাল ইউনিভার্সিটি। এই সিদ্ধান্তটি নেওয়া হয়েছিল দীর্ঘদিনের শিক্ষার্থী আন্দোলনের পরিপ্রেক্ষিতে। কলেজগুলোর শিক্ষার্থীরা দীর্ঘদিন ধরে দাবি জানাচ্ছিলেন একটি স্বতন্ত্র বিশ্ববিদ্যালয়ের মর্যাদা পেতে। তাদের দাবি ছিল ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অধীন থেকে মুক্ত হয়ে নিজস্ব একাডেমিক পরিচয় তৈরি করা।

এরপর ২০২৤-২৫ শিক্ষাবর্ষের জন্য ভর্তি কার্যক্রম শুরু করা হয়। কিন্তু এখানেই শুরু হয় সমস্যা। বিশ্ববিদ্যালয়টির অধ্যাদেশ জারি এবং একাডেমিক কাঠামো তৈরির কাজ সম্পন্ন না হওয়ায় ভর্তি প্রক্রিয়া ধীর গতিতে এগোতে থাকে। ফলে দেশের সব বিশ্ববিদ্যালয়ে ক্লাস শুরু হলেও সেন্ট্রাল ইউনিভার্সিটির শিক্ষার্থীরা এখনো অপেক্ষায় রয়েছে।

ঢাকা সেন্ট্রাল ইউনিভার্সিটিতে কোন কলেজগুলো রয়েছে?

কলেজের নাম প্রতিষ্ঠাকাল
ঢাকা কলেজ ১৮৪১
ইডেন মহিলা কলেজ ১৮৭৩
সরকারি শহীদ সোহরাওয়ার্দী কলেজ ১৯৫৫
কবি নজরুল সরকারি কলেজ ১৯৫৮
বেগম বদরুন্নেসা সরকারি মহিলা কলেজ ১৯৩৯
সরকারি বাঙলা কলেজ ১৯৬২
সরকারি তিতুমীর কলেজ ১৯৬৯

এই সাত কলেজে মোট প্রায় দুই লাখ শিক্ষার্থী এবং এক হাজারের বেশি শিক্ষক রয়েছেন। এত বড় একটি শিক্ষা প্রতিষ্ঠান পরিচালনায় সঠিক পরিকল্পনা এবং দ্রুত সিদ্ধান্ত নেওয়া খুবই জরুরি।

শিক্ষার্থীরা কী বলছেন?

তিতুমীর কলেজের ইসলামিক স্টাডিজ বিভাগের শিক্ষার্থী এটিএম রিজওয়ান হোসেন তার হতাশা প্রকাশ করে বলেন, “আমি ২০২৪-২৫ সেশনে সেন্ট্রাল বিশ্ববিদ্যালয়ের অধীনে তিতুমীর কলেজে চান্স পেয়েছি। কিন্তু দুর্ভাগ্য যে, ভর্তি হওয়ার আগেই সেশনজটে পড়ে আমাদের ভর্তি প্রক্রিয়াই অনিশ্চয়তার দিকে এগিয়ে যাচ্ছে।”

তিনি আরও জানান, “২৪-২৫ সেশনের সব শিক্ষার্থীরা ইতোমধ্যে তাদের নিজ নিজ কলেজ ও বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়াশোনা করছে। তাদের অনেকেরই প্রথম সেমিস্টার শেষ হয়ে গিয়েছে। অথচ সেন্ট্রাল বিশ্ববিদ্যালয়ের অধীনে আমাদের এখনো ভর্তি কার্যক্রমই পুরোপুরিভাবে শেষ হয়নি।”

আরেক শিক্ষার্থী রায়হান হোসেন বলেন, “অন্য কোনো বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি হওয়ার সুযোগ না থাকায় আমি এ বিশ্ববিদ্যালয়েই ক্লাস শুরুর অপেক্ষায় আছি। আশা করছি দ্রুত কার্যকর আইন, স্পষ্ট সিলেবাস ও একাডেমিক কাঠামো প্রণয়নের মাধ্যমে আমাদের পড়াশোনায় কোনো দেরি হবে না।”

অন্যান্য বিশ্ববিদ্যালয়ের অবস্থা কেমন?

এদিকে দেশের অন্যান্য পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে পরিস্থিতি সম্পূর্ণ ভিন্ন। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় ইতোমধ্যে দুটি ইউনিটের ভর্তি পরীক্ষা সম্পন্ন করেছে। রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়, জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়, চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়সহ প্রায় সব বিশ্ববিদ্যালয় ২০২৫-২৬ শিক্ষাবর্ষের ভর্তি পরীক্ষার তারিখ ঘোষণা করেছে।

এই অবস্থায় সেন্ট্রাল ইউনিভার্সিটির ২০২৪-২৫ শিক্ষাবর্ষের শিক্ষার্থীরা বুঝতে পারছে যে তারা কমপক্ষে একটি বছর পিছিয়ে গেছে। যখন তাদের সমবয়সী বন্ধুরা পরের বছরের জন্য ভর্তি পরীক্ষা দিচ্ছে, তখন তারা এখনো আগের বছরের ভর্তি প্রক্রিয়াই সম্পন্ন করতে পারেনি।

প্রশাসন কী বলছে?

প্রস্তাবিত ঢাকা সেন্ট্রাল ইউনিভার্সিটির অন্তর্বর্তী প্রশাসক হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন ঢাকা কলেজের অধ্যক্ষ অধ্যাপক এ কে এম ইলিয়াস। তিনি জানান, “সরকারি নীতিমালা অনুযায়ী কাজ করাই আমাদের প্রধান লক্ষ্য। অধ্যাদেশ জারি ও কাঠামো গঠনের কাজ এখনো সম্পূর্ণ হয়নি। তবে শিক্ষা মন্ত্রণালয় শতভাগ সহযোগিতার আশ্বাস দিয়েছে।”

তিনি আরও বলেন, “ক্লাস শুরু করতে বিলম্ব হলেও পরবর্তীতে অতিরিক্ত ক্লাস নিয়ে একাডেমিক ক্ষতি পুষিয়ে নেওয়ার চেষ্টা করা হবে। সহযোগিতার বর্তমান ধারা অব্যাহত থাকলে এ সমস্যাগুলো দ্রুত কাটিয়ে ওঠা সম্ভব হবে।”

সরকারি তিতুমীর কলেজের অধ্যক্ষ ড. ছদরুদ্দীন আহমদ স্বীকার করেন যে ২০২৪-২৫ শিক্ষাবর্ষের শিক্ষার্থীদের আসলে অনেক ক্ষতি হয়ে গেছে। তিনি বলেন, “এই সেশনজট কাটিয়ে উঠার জন্য আমরা প্রয়োজনে বেশি ক্লাস নিয়ে সিলেবাস শেষ করবো। আমাদের একটা পরিকল্পনা রয়েছে এ সেশনকে ভর্তির পরবর্তীতে ছয় মাসের মধ্যে তাদের ফাইনাল পরীক্ষা নেওয়ার।”

ভর্তি কার্যক্রম কতবার বাড়ানো হয়েছে?

কার্যক্রম পূর্ববর্তী সময়সীমা নতুন সময়সীমা
কাগজপত্র ও ফি জমা ৩০ অক্টোবর – ১৫ নভেম্বর ১৬ নভেম্বর – ১ ডিসেম্বর

এর আগে একাধিকবার ভর্তি কার্যক্রমের সময়সীমা বাড়ানো হয়েছে। ভর্তিকৃত শিক্ষার্থীদের নিজ নিজ কলেজে কাগজপত্র ও অবশিষ্ট ফি প্রদানের সময়সীমা বারবার পিছিয়ে দেওয়া হচ্ছে। এতে শিক্ষার্থীদের মধ্যে অনিশ্চয়তা আরও বেড়ে যাচ্ছে।

সেশনজট কেন সমস্যা?

সেশনজট মানে হলো শিক্ষার্থীরা তাদের নির্ধারিত সময়ের চেয়ে পিছিয়ে পড়া। এটি একজন শিক্ষার্থীর জীবনে বড় প্রভাব ফেলে। প্রথমত, একজন শিক্ষার্থী যখন দেখে তার সমবয়সীরা পরের বছরে চলে গেছে, তখন তার মধ্যে হতাশা তৈরি হয়। দ্বিতীয়ত, ক্যারিয়ার শুরু করতে দেরি হয়, যা চাকরির বাজারে প্রতিযোগিতায় পিছিয়ে রাখে।

সেন্ট্রাল ইউনিভার্সিটির শিক্ষার্থীরা বলছেন, তারা প্রশাসনের অভ্যন্তরীণ সমস্যার কারণে শিক্ষাজীবন থেকে বঞ্চিত হচ্ছে। তারা অনিশ্চয়তার মধ্যে দিন কাটাচ্ছে, জানে না কবে তাদের ক্লাস শুরু হবে।

সমাধান কী হতে পারে?

শিক্ষার্থীরা এবং শিক্ষকরা চাইছেন দ্রুত কিছু পদক্ষেপ নেওয়া হোক। প্রথমত, বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাদেশ দ্রুত জারি করতে হবে যাতে এটি আইনগতভাবে একটি পূর্ণাঙ্গ বিশ্ববিদ্যালয় হিসেবে কাজ করতে পারে। দ্বিতীয়ত, একটি স্পষ্ট একাডেমিক ক্যালেন্ডার তৈরি করতে হবে যাতে শিক্ষার্থীরা জানতে পারে কবে কী হবে।

তৃতীয়ত, প্রশাসনকে দ্রুত ভর্তি প্রক্রিয়া সম্পন্ন করে ক্লাস শুরু করতে হবে। চতুর্থত, যেহেতু ইতোমধ্যে অনেক সময় নষ্ট হয়ে গেছে, তাই সংক্ষিপ্ত কোর্স বা অতিরিক্ত ক্লাসের মাধ্যমে শিক্ষার্থীদের ক্ষতি পুষিয়ে দেওয়ার ব্যবস্থা করতে হবে।

E-E-A-T অনুযায়ী গুরুত্বপূর্ণ তথ্য

বিষয় তথ্য
বিশ্ববিদ্যালয়ের নাম ঢাকা সেন্ট্রাল ইউনিভার্সিটি (প্রস্তাবিত)
মোট কলেজ ৭টি
মোট শিক্ষার্থী প্রায় ২ লাখ
মোট শিক্ষক ১০০০+ জন
প্রশাসক অধ্যাপক এ কে এম ইলিয়াস (অন্তর্বর্তী)
বর্তমান অবস্থা ভর্তি প্রক্রিয়া অসম্পূর্ণ
সেশনজট প্রায় ১ বছর

শিক্ষার্থীদের আশা এবং প্রত্যাশা

সেন্ট্রাল ইউনিভার্সিটির প্রথম ব্যাচের শিক্ষার্থীরা আশা করছেন যে প্রশাসন দ্রুত পদক্ষেপ নেবে এবং তাদের সেশনজটের হাত থেকে উদ্ধার করবে। তারা চান তাদের উচ্চশিক্ষা যেন সঠিকভাবে এগিয়ে যায়। এই শিক্ষার্থীরা অনেক স্বপ্ন নিয়ে কলেজে ভর্তি হয়েছিল, কিন্তু এখন তারা অনিশ্চয়তায় ভুগছে।

অনেক শিক্ষার্থী বলছেন, তারা অন্য কোনো পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি হতে পারেনি বলে এখানেই আছে। এখন তারা চান কর্তৃপক্ষ যেন দ্রুত একটি সমাধান বের করে এবং তাদের শিক্ষাজীবন যেন নষ্ট না হয়। তারা শিক্ষা মন্ত্রণালয় এবং সরকারের কাছে আবেদন জানাচ্ছেন যেন এই বিষয়টি অগ্রাধিকার ভিত্তিতে সমাধান করা হয়।

শেষ কথা

ঢাকা সেন্ট্রাল ইউনিভার্সিটি গঠনের সিদ্ধান্তটি ছিল শিক্ষার্থীদের দীর্ঘদিনের দাবি। কিন্তু এর বাস্তবায়নে যে জটিলতা দেখা দিয়েছে, তা শিক্ষার্থীদের জীবনে নেতিবাচক প্রভাব ফেলছে। প্রথম ব্যাচের শিক্ষার্থীরা এখন ভর্তির আগেই এক বছরের সেশনজটে পড়ে আছে। এটি শুধু একটি প্রশাসনিক ব্যর্থতা নয়, বরং হাজার হাজার তরুণের ভবিষ্যৎ নিয়ে এক বড় প্রশ্ন।

এখন দরকার দ্রুত এবং কার্যকর পদক্ষেপ। শিক্ষা মন্ত্রণালয়, বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন এবং সংশ্লিষ্ট সকলকে একসাথে কাজ করতে হবে। শিক্ষার্থীদের সেশনজট কাটিয়ে তাদের যথাযথ শিক্ষার সুযোগ নিশ্চিত করা এখন সময়ের দাবি। আশা করা যায়, খুব শীঘ্রই এই সমস্যার সমাধান হবে এবং শিক্ষার্থীরা তাদের স্বপ্নের পথে এগিয়ে যেতে পারবে।

শাকিল আহম্মেদ
শাকিল আহম্মেদhttps://porasonablog.com
মোঃ শাকিল আহাম্মেদ শিক্ষা বিষয়ক সংবাদ নিয়ে নিয়মিত কাজ করছেন এবং ভর্তি, রেজাল্ট ও বিভিন্ন পরীক্ষার আপডেট সংগ্রহ ও যাচাই করেন। তিনি অর্থনীতি বিষয়ে স্নাতক সম্পন্ন করেছেন। তথ্য প্রকাশের আগে তিনি সংশ্লিষ্ট শিক্ষা বোর্ড, বিশ্ববিদ্যালয়ের অফিসিয়াল নোটিশ ও নির্ভরযোগ্য সূত্র মিলিয়ে দেখেন। শিক্ষার্থীদের জন্য দ্রুত ও নির্ভুল তথ্য পৌঁছে দেওয়াই তার প্রধান লক্ষ্য।
রিলেটেড আরটিকেল

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here

- Advertisment -

জনপ্রিয় নিউজ