রাজধানী ঢাকার সাতটি বিখ্যাত কলেজ নিয়ে একটি বিশেষ সেন্ট্রাল ইউনিভার্সিটি তৈরি হতে চলেছে। এই নতুন বিশ্ববিদ্যালয়ে শিক্ষার্থীরা পাবেন আধুনিক শিক্ষাব্যবস্থা, বিনামূল্যে ল্যাপটপ এবং অনেক দুর্দান্ত সুবিধা। শিক্ষা মন্ত্রণালয় জানিয়েছে, এই ঢাকা কেন্দ্রীয় বিশ্ববিদ্যালয় হবে দেশের শিক্ষাব্যবস্থার এক নতুন মাইলফলক।
কী কী কলেজ নিয়ে তৈরি হবে সেন্ট্রাল ইউনিভার্সিটি
এই কেন্দ্রীয় বিশ্ববিদ্যালয়ে অন্তর্ভুক্ত হবে রাজধানীর সবচেয়ে পুরাতন ও সম্মানিত সাতটি কলেজ। এগুলো হলো ঢাকা কলেজ, ইডেন মহিলা কলেজ, বেগম বদরুন্নেসা সরকারি মহিলা কলেজ, সরকারি তিতুমীর কলেজ, সরকারি শহীদ সোহরাওয়ার্দী কলেজ, কবি নজরুল সরকারি কলেজ এবং সরকারি বাঙলা কলেজ। এই কলেজগুলো দীর্ঘদিন ধরে দেশের মেধাবী শিক্ষার্থীদের শিক্ষা দিয়ে আসছে।
এইচএসসি থাকবে পাঁচটি কলেজে
নতুন বিশ্ববিদ্যালয়ের একটি বিশেষ দিক হলো, এর পাঁচটি কলেজে এইচএসসি পর্যায়ের পড়াশোনা অব্যাহত থাকবে। এর মানে হলো, উচ্চমাধ্যমিক এবং স্নাতক পর্যায়ের শিক্ষার্থীরা একই ক্যাম্পাসে পড়াশোনা করতে পারবেন। তবে তারা টাইম, স্পেস ও রিসোর্স শেয়ারিং পদ্ধতিতে ক্যাম্পাস ব্যবহার করবেন, যাতে কোনো ধরনের অসুবিধা না হয়।
হাইব্রিড পাঠদান ব্যবস্থা
এই সেন্ট্রাল ইউনিভার্সিটিতে থাকবে আধুনিক হাইব্রিড পাঠদান ব্যবস্থা। এর মানে হলো, শিক্ষার্থীরা ৪০% ক্লাস করবেন অনলাইনে এবং ৬০% ক্লাস করবেন সরাসরি ক্যাম্পাসে। এই পদ্ধতিতে শিক্ষার্থীরা ঘরে বসে অনলাইনে ক্লাস করতে পারবেন, আবার ক্যাম্পাসে গিয়েও শিক্ষকদের সাথে সরাসরি পড়াশোনা করতে পারবেন। তবে সব ধরনের পরীক্ষা হবে সরাসরি ক্যাম্পাসে উপস্থিত হয়ে।
বিনামূল্যে ল্যাপটপ ও ইন্টারনেট সুবিধা
কেন্দ্রীয় বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রতিটি শিক্ষার্থী প্রথম বর্ষেই পাবেন একটি ল্যাপটপ এবং এর সাথে প্রয়োজনীয় সব সামগ্রী। এটি সম্পূর্ণ বিনামূল্যে দেওয়া হবে। এছাড়াও শিক্ষার্থীরা পাবেন স্বল্পমূল্যে ইন্টারনেট সেবা, যাতে তারা সহজেই অনলাইন ক্লাসে অংশগ্রহণ করতে পারেন এবং পড়াশোনার প্রয়োজনীয় তথ্য সংগ্রহ করতে পারেন।
চার ধাপে বাস্তবায়ন প্রক্রিয়া
এই ঢাকা সেন্ট্রাল ইউনিভার্সিটি প্রতিষ্ঠা হবে চার ধাপে। প্রথমে খসড়া আইন অনুমোদন এবং অধ্যাদেশ জারি করা হবে। এরপর শিক্ষা মন্ত্রণালয়, বাংলাদেশ বিশ্ববিদ্যালয় মঞ্জুরি কমিশন এবং বিশ্ববিদ্যালয়ের মধ্যে ত্রিপাক্ষিক চুক্তি স্বাক্ষর হবে। তৃতীয় ধাপে উপাচার্য নিয়োগ এবং প্রশাসনিক কার্যক্রম শুরু হবে। সবশেষে পূর্ণাঙ্গ শিক্ষা কার্যক্রম চালু হবে।
চারটি স্কুলে ভাগ হবে বিষয়সমূহ
নতুন বিশ্ববিদ্যালয়ে সাতটি কলেজকে চারটি স্কুলে ভাগ করা হবে। এগুলো হলো School of Sciences (বিজ্ঞান বিভাগ), School of Arts and Humanities (কলা ও মানবিক বিভাগ), School of Business Studies (ব্যবসায় শিক্ষা বিভাগ), এবং School of Law and Justice (আইন ও বিচার বিভাগ)। এই ব্যবস্থায় শিক্ষার্থীরা তাদের পছন্দের বিষয়ে পড়াশোনা করতে পারবেন।
ইন্টারডিসিপ্লিনারি শিক্ষাব্যবস্থা
এই সেন্ট্রাল ইউনিভার্সিটিতে থাকবে ইন্টারডিসিপ্লিনারি শিক্ষাব্যবস্থা। এর মানে হলো, প্রথম চার সেমিস্টারে সব শিক্ষার্থী নন-মেজর কোর্স পড়বেন। এতে করে তারা বিভিন্ন বিষয় সম্পর্কে ধারণা পাবেন। পরবর্তী চার সেমিস্টারে তারা নিজেদের মেজর বিষয় নিয়ে পড়াশোনা করবেন। পঞ্চম সেমিস্টারে শর্ত পূরণ করলে শিক্ষার্থীরা চাইলে নিজেদের বিষয় পরিবর্তন করতে পারবেন।
আধুনিক ক্যাম্পাস সুবিধা
কেন্দ্রীয় বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রতিটি কলেজে থাকবে আধুনিক মানসম্পন্ন লাইব্রেরি, ক্যাফেটেরিয়া, মেডিকেল সেন্টার এবং পরিবহন ব্যবস্থা। শিক্ষার্থীরা পাবেন সব ধরনের আধুনিক সুবিধা। এছাড়াও সব ধরনের প্রশাসনিক কাজ যেমন ভর্তি, রেজিস্ট্রেশন, আবেদন ইত্যাদি হবে ডিজিটাল সিস্টেমে। শিক্ষার্থীরা যেকোনো তথ্যের জন্য আইটি প্ল্যাটফর্মের মাধ্যমে অনুসন্ধান করতে পারবেন।
কেন্দ্রীয় ভর্তি ও নিয়োগ ব্যবস্থা
এই বিশ্ববিদ্যালয়ে কেন্দ্রীয়ভাবে ভর্তি প্রক্রিয়া পরিচালিত হবে। শিক্ষক, কর্মকর্তা ও কর্মচারী নিয়োগও হবে কেন্দ্রীয়ভাবে এবং প্রয়োজন অনুযায়ী তাদের বিভিন্ন কলেজে বণ্টন করা হবে। বাজেট পরিচালনাও হবে কেন্দ্রীয়ভাবে, যাতে সব কলেজ সমান সুবিধা পায়।
পুরাতন শিক্ষার্থীদের জন্য বিশেষ ব্যবস্থা
যেসব শিক্ষার্থী ইতিমধ্যে এই কলেজগুলোতে পড়াশোনা করছেন, তারা আগের অ্যাকাডেমিক কাঠামো অনুযায়ী তাদের পড়াশোনা শেষ করতে পারবেন। তাদের সময়মতো পরীক্ষা নেওয়া হবে, দ্রুত রেজাল্ট প্রকাশ করা হবে এবং সেশনজট কমানোর জন্য যথাযথ ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
প্রশাসনিক কাঠামো
নতুন সেন্ট্রাল ইউনিভার্সিটির সব কার্যক্রম পরিচালিত হবে অ্যাকাডেমিক কাউন্সিল, সিনেট ও সিন্ডিকেটের মাধ্যমে। একজন প্রক্টর থাকবেন এবং প্রতিটি কলেজে একজন পুরুষ ও একজন নারী ডেপুটি প্রক্টর থাকবেন। মোট ১ৄ জন ডেপুটি প্রক্টর থাকবেন সাতটি কলেজে।
কেন এই বিশ্ববিদ্যালয় প্রয়োজন
ঢাকার এই সাতটি কলেজ আগে জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ের অধীনে ছিল। পরে ২০১৭ সালে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অধীনে নিয়ে আসা হয়। কিন্তু দুই ক্ষেত্রেই নানা অ্যাকাডেমিক ও প্রশাসনিক সংকট দেখা দেয়। এই সমস্যা সমাধানের জন্য শিক্ষার্থীরা দাবি জানিয়েছিলেন একটি স্বতন্ত্র বিশ্ববিদ্যালয়ের। সেই দাবির পরিপ্রেক্ষিতেই এই কেন্দ্রীয় বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।
এই ঢাকা সেন্ট্রাল ইউনিভার্সিটি হবে দেশের শিক্ষাব্যবস্থার এক নতুন অধ্যায়। হাইব্রিড পাঠদান, বিনামূল্যে ল্যাপটপ, ইন্টারডিসিপ্লিনারি শিক্ষা এবং আধুনিক সুবিধা নিয়ে এই বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষার্থীদের জন্য নিয়ে আসবে নতুন সম্ভাবনা।
