বাংলাদেশের আয়কর রিটার্ন ব্যবস্থায় নতুন পরিবর্তন এসেছে। এখন থেকে যদি আপনার সন্তান ইংরেজি মাধ্যম স্কুল, বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয় বা বিদেশে পড়াশোনা করে, তাহলে সেই তথ্য আয়কর রিটার্নে উল্লেখ করতে হবে। ২০২৫ সালের ১৭ আগস্ট জাতীয় রাজস্ব বোর্ড (এনবিআর) থেকে জারি করা নতুন ‘আয়কর রিটার্ন অডিট নির্দেশনা-২০২৫’ অনুযায়ী এই নিয়ম চালু হয়েছে।
কেন এই নতুন নিয়ম এসেছে?
অনেক অভিভাবক তাদের সন্তানদের ব্যয়বহুল শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে পড়ান কিন্তু আয়কর রিটার্নে সেই শিক্ষা ব্যয়ের সঠিক তথ্য দেন না। ফলে তাদের প্রকৃত আয় এবং জীবনযাত্রার মান সম্পর্কে কর কর্তৃপক্ষের কাছে সুস্পষ্ট ধারণা থাকে না। এই সমস্যা সমাধানের জন্যই এনবিআর নতুন অডিট নির্দেশনা জারি করেছে।
জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের মতে, এই নিয়মের মূল উদ্দেশ্য হল কর ফাঁকি প্রতিরোধ, কর প্রশাসনে স্বচ্ছতা আনা এবং একটি সুস্থ কর সংস্কৃতি গড়ে তোলা। বর্তমানে অনেক করদাতা তাদের প্রকৃত আর্থিক অবস্থা লুকিয়ে রাখেন, যা রাজস্ব আদায়ে বাধা সৃষ্টি করে।
কোন ধরনের শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের তথ্য জানাতে হবে?
নতুন নিয়ম অনুযায়ী নিম্নলিখিত ধরনের শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে আপনার সন্তান পড়াশোনা করলে তা আয়কর রিটার্নে উল্লেখ করতে হবে:
ইংরেজি মাধ্যম স্কুল এবং কলেজে অধ্যয়নরত সন্তানদের তথ্য অবশ্যই রিটার্নে দিতে হবে। এই ধরনের শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে সাধারণত টিউশন ফি এবং অন্যান্য শিক্ষা খরচ অনেক বেশি হয়ে থাকে। বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়াশোনা করা সন্তানদের তথ্যও রিটার্নে অন্তর্ভুক্ত করতে হবে। এছাড়াও বিদেশি বিশ্ববিদ্যালয় বা আন্তর্জাতিক শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে অধ্যয়নরত সন্তানদের শিক্ষা ব্যয়ের বিস্তারিত তথ্য প্রদান করা বাধ্যতামূলক।
জীবনযাত্রার মানের আরও কি তথ্য জানাতে হবে?
সন্তানের শিক্ষা খরচ ছাড়াও আরও ৮টি বিষয়ে তথ্য দিতে হবে। পানি, বিদ্যুৎ, গ্যাস এবং টেলিফোন বিলের পরিমাণ যৌক্তিক কিনা তা যাচাই করা হবে। অনেক সময় করদাতারা এই মাসিক খরচগুলো কম দেখান যাতে তাদের প্রকৃত আয় সম্পর্কে সন্দেহ না জাগে।
বাড়ি ভাড়া বা বাসস্থান সংক্রান্ত খরচ সম্পর্কেও সঠিক তথ্য প্রদান করতে হবে। যানবাহন ক্রয় বা রক্ষণাবেক্ষণ খরচ, চিকিৎসা ব্যয়, বিনোদন ও ভ্রমণ খরচ এবং পোশাক-আশাক ও খাদ্য ব্যয় সংক্রান্ত তথ্য রিটার্নে উল্লেখ করা আবশ্যক। এমনকি পারিবারিক অনুষ্ঠান বা সামাজিক উৎসবে করা খরচের হিসাবও আয়কর নথিতে দেখাতে হবে।
অডিট প্রক্রিয়া কিভাবে কাজ করবে?
নতুন অডিট ব্যবস্থা সম্পূর্ণ ডিজিটাল এবং ঝুঁকিভিত্তিক পদ্ধতিতে পরিচালিত হবে। অটোমেটেড সিস্টেমের মাধ্যমে রিটার্ন নির্বাচন করা হবে যাতে মানবীয় হস্তক্ষেপ কম থাকে। তবে কাগজে দাখিলকৃত রিটার্ন আপাতত র্যান্ডম পদ্ধতিতে অডিটে আনা হবে।
রিটার্ন নির্বাচনের পর করদাতাকে ৩০ দিনের মধ্যে নোটিশ দেওয়া হবে। যদি সন্তোষজনক ব্যাখ্যা দিতে পারেন তাহলে অডিট থেকে অব্যাহতি পাবেন। অন্যথায় কর পরিদর্শক মাঠ পর্যায়ে তদন্ত করে প্রমাণ সংগ্রহ করবেন। প্রয়োজনে সংশোধিত রিটার্ন জমা দেওয়ার সুযোগ থাকবে।
কোন করদাতাদের বেশি নজরদারিতে রাখা হবে?
ব্যক্তি করদাতাদের ক্ষেত্রে বেতনভিত্তিক আয়, ব্যাংক হিসাবের জমা, ভাড়া আয়, কৃষি আয়, রেমিট্যান্স, বিনিয়োग আয় এবং জীবনযাত্রার ব্যয় খুঁটিনাটি যাচাই করা হবে। আয়ের সাথে সম্পদ ও ব্যয়ের মধ্যে সঙ্গতি আছে কি না তা বিশেষভাবে দেখা হবে।
চাকরিজীবীদের ক্ষেত্রে বেতনের আয় এবং ব্যাংক হিসাবের লেনদেন মিলিয়ে দেখা হবে। ভাড়া আয় ঘোষিত মূল্যের সাথে বাজারদর মিলিয়ে যাচাই করা হবে। ব্যবসায়িক লেনদেনে ব্যাংক হিসাব, ক্রয়-বিক্রির নথি এবং ভ্যাট রিটার্ন পর্যালোচনা করা হবে।
বিদেশ থেকে আসা রেমিট্যান্স প্রকৃত উপার্জনকারীর নামে এসেছে কি না সেটিও খতিয়ে দেখা হবে। অনেক সময় অবৈধ আয় লুকানোর জন্য ভুয়া রেমিট্যান্স দেখানো হয়, যা এখন কঠোরভাবে যাচাই করা হবে।
কোম্পানি ও ব্যবসায়ীদের জন্য বিশেষ নিয়ম
কোম্পানির ক্ষেত্রে নিরীক্ষিত হিসাব জমা দেওয়া বাধ্যতামূলক। টার্নওভার এবং ব্যাংক জমার সাথে ব্যয় মিলিয়ে দেখা হবে। অপ্রাসঙ্গিক খরচ দেখানো হয়েছে কি না এবং উৎসে কর যথাযথভাবে কাটা হয়েছে কি না তা পর্যালোচনা করা হবে।
নতুন ঋণ বা দেনা প্রদর্শন, স্থায়ী সম্পদের সংযোজন, ভাউচার ও উৎসে কর কর্তনের প্রমাণ, ক্রয়-বিক্রির হিসাব এবং আর্থিক বিবৃতি যাচাই করা হবে। ভুয়া ব্যয় দেখানো বা আয়ের উৎস গোপন করলে কর নির্ধারণের পাশাপাশি জরিমানার ব্যবস্থা থাকবে।
কত ভাগ রিটার্ন অডিটে আসবে?
এনবিআরের ঘোষণা অনুযায়ী সব রিটার্ন অডিট হবে না। সর্বোচ্চ এক-তৃতীয়াংশ রিটার্ন অডিটের আওতায় আনা হবে। প্রতিটি কর সার্কেলে একটি বিশেষ অডিট টিম থাকবে যারা পূর্ববর্তী এবং বর্তমান বছরের রিটার্ন যাচাই করে রাজস্ব ক্ষতির সম্ভাবনা থাকলে অডিটের জন্য বাছাই করবে।
একই করদাতাকে টানা তিন বছর অডিটে না আনার বিধান রাখা হয়েছে। তবে লোকসান, শূন্য আয় বা অস্বাভাবিকভাবে কম আয় দেখানো হলে তা অডিটের আওতায় আসবে। যাদের আগে কখনো অডিট হয়নি, তাদের অন্তত এক-তৃতীয়াংশ রিটার্ন বাছাই করার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।
করদাতাদের জন্য গুরুত্বপূর্ণ পরামর্শ
আয়কর রিটার্ন দাখিলের সময় সততা এবং স্বচ্ছতা বজায় রাখুন। আপনার প্রকৃত আয়, ব্যয় এবং সম্পদের সঠিক হিসাব দিন। বিশেষ করে সন্তানের শিক্ষা ব্যয় সহ জীবনযাত্রার সকল খরচ যথাযথভাবে রিটার্নে উল্লেখ করুন।
সকল খরচের রশিদ এবং প্রমাণপত্র সংরক্ষণ করে রাখুন। অডিটের সময় এগুলো সহায়ক দলিল হিসেবে কাজে আসবে। ব্যাংক স্টেটমেন্ট, বিল-ভাউচার এবং আয়ের সকল কাগজপত্র গোছানো অবস্থায় রাখুন।
কর পরামর্শকের সাহায্য নিন যদি রিটার্ন প্রস্তুতি জটিল মনে হয়। একজন অভিজ্ঞ কর বিশেষজ্ঞ আপনাকে সঠিক দিকনির্দেশনা দিতে পারবেন। অনলাইন রিটার্ন সিস্টেম ব্যবহার করুন যা নিরাপদ এবং সময় সাশ্রয়ী।
এই নিয়মের সুবিধা কি?
নতুন অডিট নির্দেশনা কার্যকর হলে কর প্রশাসনে স্বচ্ছতা বৃদ্ধি পাবে। রাজস্ব আয় বৃদ্ধি পাবে এবং করদাতাদের মধ্যে আস্থা তৈরি হবে। সৎ করদাতারা সুবিধা পাবেন আর কর ফাঁকি কমে যাবে।
আর্থিক খাতে স্বচ্ছতা বৃদ্ধি পাবে যা দেশের অর্থনীতির জন্য ভাল। কর ভিত্তি সম্প্রসারিত হবে এবং উন্নয়ন কর্মকাণ্ডে সরকারের তহবিল বৃদ্ধি পাবে। এভাবে সবার সমান অংশগ্রহণে একটি ন্যায়সঙ্গত কর ব্যবস্থা গড়ে উঠবে।
নতুন এই নিয়ম মেনে চলার মাধ্যমে আমরা একটি আধুনিক এবং স্বচ্ছ কর ব্যবস্থা গড়তে পারব যা দেশের সামগ্রিক উন্নয়নে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করবে।
