এসএসসি পরীক্ষা ২০২৬ শুরু আজ: ৩,৮৮৫ কেন্দ্রে বসছে ১৮.৫৭ লাখ পরীক্ষার্থী

আজ মঙ্গলবার (২১ এপ্রিল) সারাদেশে একযোগে শুরু হচ্ছে বহুল প্রতীক্ষিত এসএসসি পরীক্ষা ২০২৬। এবারের এসএসসি, দাখিল ও সমমানের পরীক্ষায় অংশ নিচ্ছে সাড়ে ১৮ লাখের বেশি শিক্ষার্থী—সঠিক সংখ্যায় যা ১৮ লাখ ৫৭ হাজার ৩৪৪ জন। দেশের ৩ হাজার ৮৮৫টি কেন্দ্রে সকাল থেকেই শুরু হয়েছে কড়া নিরাপত্তা ও উৎসবমুখর পরিবেশে পরীক্ষা গ্রহণের প্রস্তুতি, আর পরীক্ষার হলের সামনে ভিড় জমিয়েছেন উদ্বিগ্ন অভিভাবকরা।

শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের প্রকাশিত তথ্য অনুযায়ী, এবারের পাবলিক পরীক্ষায় মোট পরীক্ষার্থীর মধ্যে ছাত্র রয়েছে ৯ লাখ ৩০ হাজার ৩০৫ জন এবং ছাত্রী ৯ লাখ ২৭ হাজার ৩৯ জন। অর্থাৎ ছাত্র-ছাত্রীর সংখ্যার পার্থক্য এবার খুবই সামান্য, যা দেশের শিক্ষাক্ষেত্রে নারী শিক্ষার অগ্রগতির একটি ইতিবাচক ইঙ্গিত বহন করছে। প্রথম দিনে ৯টি সাধারণ শিক্ষা বোর্ডে অনুষ্ঠিত হচ্ছে বাংলা প্রথম পত্র পরীক্ষা, মাদরাসা বোর্ডের অধীনে দাখিল পরীক্ষার্থীদের কোরআন মাজিদ ও তাজভিদ এবং কারিগরি বোর্ডের অধীনে এসএসসি (ভোকেশনাল) ও দাখিল (ভোকেশনাল) পরীক্ষার্থীদের বাংলা-২ বিষয়ের পরীক্ষা।

বোর্ডভিত্তিক হিসাবে দেখা যাচ্ছে, ৯টি সাধারণ শিক্ষা বোর্ডের অধীনে পরীক্ষায় অংশ নিচ্ছে ১৪ লাখ ১৮ হাজার ৩৯৮ জন শিক্ষার্থী। অন্যদিকে মাদ্রাসা শিক্ষা বোর্ডে ৩ লাখ ৪ হাজার ২৮৬ জন এবং কারিগরি শিক্ষা বোর্ডে ১ লাখ ৩৪ হাজার ৬৬০ জন শিক্ষার্থী পরীক্ষা দিচ্ছে। বরাবরের মতো এবারও সবচেয়ে বেশি পরীক্ষার্থী রয়েছে ঢাকা শিক্ষা বোর্ডে—সংখ্যায় যা ৩ লাখ ৬৬ হাজার ৬৫০ জন। সব মিলিয়ে দেশের ৩০ হাজার ৬৬৬টি শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের শিক্ষার্থীরা এবার এই পরীক্ষায় বসছে।

পরীক্ষার্থীদের জন্য ঢাকা শিক্ষা বোর্ড এবার ১৪টি গুরুত্বপূর্ণ নির্দেশনা জারি করেছে, যা প্রতিটি পরীক্ষার্থীর জন্য মেনে চলা বাধ্যতামূলক। বোর্ড জানিয়েছে, পরীক্ষা শুরুর অন্তত ৩০ মিনিট আগে পরীক্ষার্থীদের কেন্দ্রে উপস্থিত হয়ে নিজ নিজ আসনে বসতে হবে। প্রশ্নপত্রে উল্লেখিত সময় অনুযায়ীই পরীক্ষা অনুষ্ঠিত হবে এবং প্রথমে বহুনির্বাচনী (MCQ) এবং এরপর সৃজনশীল বা রচনামূলক (তত্ত্বীয়) পরীক্ষা নেওয়া হবে—এই দুটি অংশের মাঝে কোনো বিরতি থাকবে না। পরীক্ষার্থীদের প্রবেশপত্র সংগ্রহ করতে হবে পরীক্ষা শুরুর অন্তত সাত দিন আগে, নিজ নিজ প্রতিষ্ঠানপ্রধানের কাছ থেকে।

বোর্ডের নির্দেশনায় আরও বলা হয়েছে, উত্তরপত্রের ওএমআর ফরমে রোল নম্বর, রেজিস্ট্রেশন নম্বর ও বিষয় কোড সঠিকভাবে লিখে বৃত্ত পূরণ করতে হবে এবং কোনোভাবেই উত্তরপত্র ভাঁজ করা যাবে না। পরীক্ষার্থীদের সৃজনশীল, বহুনির্বাচনী এবং ব্যবহারিক—প্রতিটি অংশে আলাদাভাবে পাস করতে হবে। নিবন্ধনপত্রে উল্লিখিত বিষয় ছাড়া অন্য কোনো বিষয়ের পরীক্ষায় অংশ নেওয়া যাবে না। শারীরিক শিক্ষা, স্বাস্থ্যবিজ্ঞান ও খেলাধুলা এবং ক্যারিয়ার শিক্ষা বিষয়ের ধারাবাহিক মূল্যায়নের নম্বর প্রতিষ্ঠান থেকে কেন্দ্রে পাঠানো হবে, যা পরবর্তীতে ব্যবহারিক পরীক্ষার নম্বরের সঙ্গে যোগ করে অনলাইনে জমা দেওয়া হবে।

পরীক্ষা কেন্দ্রে মোবাইল ফোন সম্পূর্ণরূপে নিষিদ্ধ ঘোষণা করা হয়েছে। শুধুমাত্র কেন্দ্র সচিব ছাড়া অন্য কেউ—এমনকি পরীক্ষার্থীরাও—কেন্দ্রে মোবাইল ফোন আনতে বা ব্যবহার করতে পারবে না। তবে পরীক্ষার্থীরা বোর্ড অনুমোদিত ক্যালকুলেটর ব্যবহার করতে পারবে। সৃজনশীল, বহুনির্বাচনী ও ব্যবহারিক—সব পরীক্ষার জন্য একই উপস্থিতিপত্র ব্যবহার করতে হবে এবং ব্যবহারিক পরীক্ষা অনুষ্ঠিত হবে নিজ নিজ কেন্দ্রে। ফল প্রকাশের সাত দিনের মধ্যে পুনঃনিরীক্ষণের জন্য অনলাইনে আবেদন করা যাবে বলেও বোর্ড নিশ্চিত করেছে।

এদিকে প্রশ্নফাঁস রোধে এবার নেওয়া হয়েছে নজিরবিহীন কঠোর ব্যবস্থা। শিক্ষা এবং প্রাথমিক ও গণশিক্ষা মন্ত্রী ড. আ ন ম এহছানুল হক মিলন সাংবাদিকদের জানিয়েছেন, সাইবার নজরদারির মাধ্যমে যেকোনো ধরনের প্রশ্নফাঁস শনাক্ত করা হবে। তিনি বলেন, “আমরা সাইবার ক্রাইমে নজরদারি করছি। থানা থেকে প্রশ্নপত্র যারা নেবেন, তারা কোনো অপরাধ করছে কি না, সেই তালিকা আমরা নিয়েছি। একটি মনিটরিং সেল গঠন করা হয়েছে এবং একটি হোয়াটসঅ্যাপ গ্রুপ খোলা হয়েছে, যেখানে ডিসি, ইউএনওসহ সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা সার্বক্ষণিক যুক্ত রয়েছেন।”

মন্ত্রী আরও জানিয়েছেন, পুরনো পাবলিক পরীক্ষা অ্যাক্ট ১৯৮০ হালনাগাদ করে ডিজিটাল ক্রাইম সংক্রান্ত ধারা অন্তর্ভুক্ত করার জন্য আইন মন্ত্রণালয়ে পাঠানো হয়েছে। আগের আইনে কেবল ম্যাট্রিক ও ইন্টারমিডিয়েট পরীক্ষার বিষয় ছিল, কিন্তু নতুন আইনে অন্যান্য পাবলিক পরীক্ষাও অন্তর্ভুক্ত করা হচ্ছে। খাতা মূল্যায়নে মানবিক নম্বর প্রদান সম্পর্কিত প্রশ্নের উত্তরে মন্ত্রী স্পষ্ট করেছেন, বোর্ডের পরীক্ষকদের খাতা দেখার জন্য পর্যাপ্ত সময় দেওয়া হচ্ছে এবং মানবিক নম্বর দেওয়ার কোনো নির্দেশনা দেওয়া হয়নি।

শিক্ষাবিদরা মনে করছেন, এসএসসি পরীক্ষা ২০২৬ শুধু একটি পাবলিক পরীক্ষাই নয়, বরং এটি দেশের শিক্ষাব্যবস্থার একটি গুরুত্বপূর্ণ মাইলফলক। পরীক্ষার্থীদের উদ্দেশে তারা বলছেন, আত্মবিশ্বাসের সঙ্গে পরীক্ষায় বসা, সময় ব্যবস্থাপনা সঠিকভাবে মেনে চলা এবং কোনো ধরনের গুজব বা অসাধু উপায় থেকে নিজেকে দূরে রাখাই সফলতার মূল চাবিকাঠি। অভিভাবকদেরও পরামর্শ দেওয়া হয়েছে, সন্তানদের মানসিকভাবে চাপমুক্ত রাখা, পুষ্টিকর খাবার নিশ্চিত করা এবং পরীক্ষার সময় সহযোগিতামূলক মনোভাব বজায় রাখার।

সব মিলিয়ে, এসএসসি ও দাখিল পরীক্ষা ২০২৬ সুষ্ঠু, সুন্দর ও নকলমুক্ত পরিবেশে সম্পন্ন করতে সরকার, শিক্ষা বোর্ড ও প্রশাসন সর্বাত্মক প্রস্তুতি গ্রহণ করেছে। দেশের লাখো শিক্ষার্থীর স্বপ্নের এই পরীক্ষা কতটা স্বচ্ছতার সঙ্গে সম্পন্ন হয়, তা দেখার জন্য এখন পুরো জাতি তাকিয়ে আছে। আগামী কয়েক সপ্তাহ এসএসসি পরীক্ষার রুটিন অনুযায়ী দেশের প্রতিটি পরীক্ষাকেন্দ্রে চলবে এই ব্যস্ততম শিক্ষাযজ্ঞ।

শাকিল আহম্মেদ
শাকিল আহম্মেদhttps://porasonablog.com
মোঃ শাকিল আহাম্মেদ শিক্ষা বিষয়ক সংবাদ নিয়ে নিয়মিত কাজ করছেন এবং ভর্তি, রেজাল্ট ও বিভিন্ন পরীক্ষার আপডেট সংগ্রহ ও যাচাই করেন। তিনি অর্থনীতি বিষয়ে স্নাতক সম্পন্ন করেছেন। তথ্য প্রকাশের আগে তিনি সংশ্লিষ্ট শিক্ষা বোর্ড, বিশ্ববিদ্যালয়ের অফিসিয়াল নোটিশ ও নির্ভরযোগ্য সূত্র মিলিয়ে দেখেন। শিক্ষার্থীদের জন্য দ্রুত ও নির্ভুল তথ্য পৌঁছে দেওয়াই তার প্রধান লক্ষ্য।
রিলেটেড আরটিকেল

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here

- Advertisment -

জনপ্রিয় নিউজ