দেশের সবচেয়ে বড় বিশ্ববিদ্যালয় জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ে লাখো শিক্ষার্থীর স্বপ্ন পূরণের যাত্রা শুরু হয় প্রতি বছর। এইচএসসি পাস করা প্রায় প্রতিটি শিক্ষার্থীর মনে এখন একটাই প্রশ্ন ঘুরপাক খাচ্ছে – জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি পরীক্ষা কবে হবে? আর এই প্রশ্নের উত্তর নিয়েই আজকের এই বিশেষ প্রতিবেদন।
ভর্তি পরীক্ষার তারিখ নিয়ে সুখবর
জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য অধ্যাপক এ এস এম আমানুল্লাহ শনিবার গুরুত্বপূর্ণ তথ্য জানিয়েছেন যে, ২০২৫-২৬ শিক্ষাবর্ষের ভর্তি পরীক্ষা আগামী ডিসেম্বরের শেষের দিকে অনুষ্ঠিত হবে। এই তথ্যটি ShareNews24 নিশ্চিত করেছে। যেসব শিক্ষার্থী এইচএসসি ২০২৫ পাস করেছেন, তাদের জন্য এটি একটি আশার বার্তা। কারণ ডিসেম্বরে ভর্তি পরীক্ষা হলে, তারা নতুন বছরেই অনার্স প্রথম বর্ষের ক্লাস শুরু করতে পারবেন।
বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে যে, গত বছরের মতো এবারও সব অধিভুক্ত কলেজে স্নাতক সম্মান শ্রেণিতে ভর্তি পরীক্ষা বহুনির্বাচনি প্রশ্ন বা MCQ পদ্ধতিতে নেওয়া হবে। এই পদ্ধতিতে পরীক্ষা হওয়ার ফলে শিক্ষার্থীদের জন্য প্রস্তুতি নেওয়া তুলনামূলক সহজ হয়।
ভর্তি পরীক্ষার পদ্ধতি কেমন হবে
জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ের ভর্তি প্রক্রিয়া বেশ সহজ এবং স্বচ্ছ। শিক্ষার্থীদের মোট ২০০ নম্বরের ভিত্তিতে মূল্যায়ন করা হবে। এই ২০০ নম্বরের মধ্যে অর্ধেক অর্থাৎ ১০০ নম্বর আসবে সরাসরি প্রবেশিকা পরীক্ষা থেকে। বাকি ১০০ নম্বর হিসাব করা হবে শিক্ষার্থীর এসএসসি এবং এইচএসসি পরীক্ষার জিপিএ থেকে। এই পদ্ধতিতে যারা আগে ভালো ফলাফল করেছেন, তাদের একটা সুবিধা থাকবে, কিন্তু ভর্তি পরীক্ষায় ভালো করলে সবাই সমান সুযোগ পাবে।
বহুনির্বাচনি পরীক্ষা পদ্ধতিতে সাধারণত ৪টি অপশন থাকে এবং সঠিক উত্তর বাছাই করতে হয়। এই ধরনের পরীক্ষায় ভালো করতে হলে পাঠ্যবইয়ের সব টপিক ভালোভাবে পড়া জরুরি। মডেল টেস্ট দিলে এবং আগের বছরের প্রশ্নগুলো সমাধান করলে প্রস্তুতি আরও মজবুত হবে।
| বিষয় | বিস্তারিত তথ্য |
|---|---|
| পরীক্ষার সময় | ডিসেম্বর ২০২৫ এর শেষের দিকে |
| পরীক্ষার পদ্ধতি | বহুনির্বাচনি (MCQ) |
| মোট নম্বর | ২০০ |
| ভর্তি পরীক্ষার নম্বর | ১০০ |
| এসএসসি ও এইচএসসির নম্বর | ১০০ |
| শিক্ষাবর্ষ | ২০২৫-২৬ |
যোগ্যতার শর্তগুলো কী কী
জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তির যোগ্যতা প্রতিটি বিভাগের জন্য আলাদা আলাদা। যদি আপনি মানবিক বিভাগ থেকে এইচএসসি পাস করে থাকেন, তাহলে আপনার এসএসসি এবং এইচএসসি মিলিয়ে ন্যূনতম জিপিএ ৪.০০ থাকতে হবে। এখানে চতুর্থ বিষয়ের নম্বর ছাড়াই হিসাব করা হয়।
অন্যদিকে বিজ্ঞান বিভাগের শিক্ষার্থীদের জন্য শর্ত একটু কঠিন। তাদের এসএসসি এবং এইচএসসি মিলিয়ে ন্যূনতম জিপিএ ৪.৫০ থাকতে হবে। এই জিপিএ হিসাবেও চতুর্থ বিষয় যুক্ত হয় না। ব্যবসায় শিক্ষা বিভাগের শিক্ষার্থীদের যোগ্যতা মানবিক বিভাগের মতোই।
এই যোগ্যতার শর্তগুলো মেনে চললে যে কেউ জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ের অধিভুক্ত কলেজে ভর্তির আবেদন করতে পারবেন। তবে মনে রাখতে হবে, শুধু যোগ্যতা থাকলেই হবে না, ভর্তি পরীক্ষায় ভালো নম্বর পেতে হবে।
আসন সংখ্যা এবং শূন্য আসনের তথ্য
ইউজিসির সর্বশেষ ৪৯তম বার্ষিক প্রতিবেদন অনুযায়ী, ২০২২ সালে জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ে মোট ৯ লাখ ১ হাজার ৫৪৫টি আসন ছিল। এর মধ্যে ৭ লাখ ৪ হাজার ১৯৬ জন শিক্ষার্থী ভর্তি হয়েছিলেন। ফলে প্রায় ১ লাখ ৯৭ হাজার ৩৪৯টি আসন শূন্য ছিল।
যদি শুধু স্নাতক সম্মান এবং কারিগরি পর্যায়ের আসনের কথা বলা হয়, তাহলে মোট আসন ছিল ৪ লাখ ৩৬ হাজার ৯০টি। এর মধ্যে ভর্তি হয়েছিলেন ৩ লাখ ৪৯ হাজার ৭১৫ জন শিক্ষার্থী। আর শূন্য থেকে গিয়েছিল ৮৬ হাজার ৩৭৫টি আসন। এই তথ্য থেকে বোঝা যায় যে, জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ে অনেক আসন খালি থাকে। তাই যোগ্যতা থাকলে এবং ভালো প্রস্তুতি নিলে ভর্তির সুযোগ পাওয়া কঠিন কিছু নয়।
| আসনের তথ্য | সংখ্যা (২০২২) |
|---|---|
| মোট আসন | ৯,০১,৫৪৫ |
| ভর্তি শিক্ষার্থী | ৭,০৪,১৯৬ |
| শূন্য আসন | ১,৯৭,৩৪৯ |
| স্নাতক সম্মানের আসন | ৪,৩৬,০৯০ |
| স্নাতক সম্মানে ভর্তি | ৩,৪৯,৭১৫ |
| স্নাতক সম্মানে শূন্য | ৮৬,৩৭৫ |
ভর্তি পরীক্ষার ইতিহাস
জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ের ভর্তি পদ্ধতির একটা লম্বা ইতিহাস আছে। ২০১৫-১৬ শিক্ষাবর্ষ থেকে বিশ্ববিদ্যালয় প্রথমবারের মতো জিপিএ ভিত্তিক ভর্তি পদ্ধতি শুরু করেছিল। এই পদ্ধতিতে কোনো পরীক্ষা দিতে হতো না, শুধু এসএসসি এবং এইচএসসির ফলাফলের উপর ভিত্তি করেই ভর্তি হওয়া যেত।
কিন্তু দীর্ঘদিন জিপিএ পদ্ধতি চালু থাকার পর, গত বছর আবার ভর্তি পরীক্ষা ফিরিয়ে আনা হয়েছে। অনেক শিক্ষাবিদ এবং বিশেষজ্ঞরা মনে করেন যে, ভর্তি পরীক্ষা পদ্ধতি বেশি ন্যায্য। কারণ যারা এসএসসি বা এইচএসসিতে একটু কম নম্বর পেয়েছেন, তারাও ভর্তি পরীক্ষায় ভালো করে নিজেদের প্রমাণ করার সুযোগ পান। এই পরিবর্তন জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার মান বাড়াতে সাহায্য করছে।
আবেদন প্রক্রিয়া কীভাবে হবে
যদিও এখনো ২০২৫-২৬ শিক্ষাবর্ষের ভর্তি আবেদনের সুনির্দিষ্ট তারিখ ঘোষণা হয়নি, তবে গত বছরের অভিজ্ঞতা থেকে ধারণা করা যায় যে, নভেম্বরের শেষ বা ডিসেম্বরের প্রথম সপ্তাহে আবেদন শুরু হতে পারে। আবেদন সম্পূর্ণ অনলাইনে করতে হবে। জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ের অফিশিয়াল ওয়েবসাইটে গিয়ে আবেদন ফরম পূরণ করতে হবে।
আবেদনের সময় শিক্ষার্থীদের এসএসসি এবং এইচএসসির সার্টিফিকেট, রেজিস্ট্রেশন নম্বর এবং অন্যান্য প্রয়োজনীয় তথ্য দিতে হবে। সঠিক তথ্য দেওয়া অত্যন্ত জরুরি, কারণ ভুল তথ্য দিলে আবেদন বাতিল হয়ে যেতে পারে। আবেদন ফি সাধারণত মোবাইল ব্যাংকিং বা অনলাইন পেমেন্টের মাধ্যমে জমা দিতে হয়।
প্রস্তুতির কিছু কার্যকরী পরামর্শ
ভর্তি পরীক্ষায় ভালো করতে হলে পরিকল্পিত প্রস্তুতি জরুরি। প্রথমত, আপনার পাঠ্যবইগুলো ভালোভাবে পড়ুন। বিশেষ করে যে বিষয়ে ভর্তি হতে চান, সেই বিষয়ের বইগুলোতে বেশি জোর দিন। এইচএসসি লেভেলের সব গুরুত্বপূর্ণ টপিক রিভিশন দিন।
দ্বিতীয়ত, আগের বছরের প্রশ্নপত্র সংগ্রহ করে সমাধান করুন। এতে আপনি বুঝতে পারবেন কোন ধরনের প্রশ্ন আসে এবং কোন টপিকগুলো বেশি গুরুত্বপূর্ণ। মডেল টেস্ট দেওয়ার অভ্যাস করুন। এতে পরীক্ষার হলে সময় ম্যানেজমেন্ট করতে সুবিধা হবে।
তৃতীয়ত, নিয়মিত পড়াশোনা করুন। প্রতিদিন অন্তত ৪-৫ ঘণ্টা ভর্তি পরীক্ষার প্রস্তুতিতে দিন। শুধু একদিন বেশি পড়ে পরের দিন বিরতি নিলে ভালো ফল আসবে না। নিয়মিততাই সফলতার চাবিকাঠি। সুস্থ থাকুন, পর্যাপ্ত ঘুমান এবং মানসিক চাপ কমাতে বিরতিতে হালকা ব্যায়াম বা হাঁটাহাঁটি করুন।
কেন জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয় গুরুত্বপূর্ণ
জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয় বাংলাদেশের সবচেয়ে বড় বিশ্ববিদ্যালয়। সারাদেশে ছড়িয়ে থাকা হাজারের বেশি কলেজ এই বিশ্ববিদ্যালয়ের অধিভুক্ত। প্রতি বছর লাখ লাখ শিক্ষার্থী এখানে উচ্চশিক্ষার সুযোগ পান। বিশেষ করে যারা ঢাকা বা বড় শহরের বাইরে থাকেন, তাদের জন্য জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয় একটি সহজলভ্য এবং মানসম্মত শিক্ষার মাধ্যম।
এই বিশ্ববিদ্যালয়ে বিভিন্ন বিষয়ে স্নাতক এবং স্নাতকোত্তর পড়ার সুযোগ আছে। বাংলা, ইংরেজি, ইতিহাস, রাষ্ট্রবিজ্ঞান, ব্যবস্থাপনা, হিসাববিজ্ঞান, পদার্থবিজ্ঞান, রসায়ন, গণিত সহ প্রায় সব প্রধান বিষয়ে পড়ার সুযোগ রয়েছে। তাই জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ের ভর্তি পরীক্ষা প্রতিটি এইচএসসি পাস শিক্ষার্থীর জন্য একটা বড় সুযোগ।
শেষ কথা
জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি পরীক্ষা কবে হবে এই প্রশ্নের উত্তর এখন আপনার জানা। ডিসেম্বর ২০২৫ এর শেষের দিকে এই পরীক্ষা অনুষ্ঠিত হবে। এখনই হাতে বেশ কিছুদিন সময় আছে। এই সময়টা কাজে লাগিয়ে ভালো প্রস্তুতি নিন। মনে রাখবেন, ভর্তি পরীক্ষায় সফল হতে হলে পরিশ্রম এবং নিয়মিত পড়াশোনার কোনো বিকল্প নেই।
জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ের অফিশিয়াল ওয়েবসাইট নিয়মিত ভিজিট করুন, যাতে ভর্তি সার্কুলার প্রকাশ হওয়ার সাথে সাথে আপনি জানতে পারেন। আপনার বন্ধুদের সাথে এই তথ্য শেয়ার করুন, যাতে সবাই সঠিক সময়ে সঠিক তথ্য পায়। আপনার সফলতা কামনা করছি। অনার্স প্রথম বর্ষে আপনার কাঙ্ক্ষিত কলেজ এবং বিষয়ে ভর্তি হতে পারুন – এই শুভকামনা রইল।
প্রায়শই জিজ্ঞাসিত প্রশ্ন:
প্রশ্ন: জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি পরীক্ষা কোন পদ্ধতিতে হবে?
উত্তর: বহুনির্বাচনি (MCQ) পদ্ধতিতে পরীক্ষা হবে, যেখানে ১০০ নম্বরের প্রবেশিকা পরীক্ষা হবে।
প্রশ্ন: ভর্তির জন্য ন্যূনতম জিপিএ কত লাগবে?
উত্তর: মানবিক বিভাগের জন্য ন্যূনতম জিপিএ ৪.০০ এবং বিজ্ঞান বিভাগের জন্য ৪.৫০ লাগবে।
প্রশ্ন: কবে থেকে আবেদন শুরু হবে?
উত্তর: সম্ভবত নভেম্বরের শেষ বা ডিসেম্বরের প্রথম সপ্তাহে আবেদন শুরু হতে পারে, অফিশিয়াল ঘোষণার জন্য অপেক্ষা করুন।
