নন-ক্যাডার প্রথম শ্রেণীর চাকরি: পদ স্থায়ী হলে চাকরি স্থায়ীকরণের তারিখ কীভাবে নির্ধারিত হয়

সরকারি বিভিন্ন দপ্তরে নন-ক্যাডার প্রথম শ্রেণীর চাকরিতে নিয়োজিত অনেক কর্মকর্তার মধ্যেই একটি সাধারণ প্রশ্ন দেখা যায়—অস্থায়ী পদে যোগদানের পর কয়েক বছর পরে যদি সেই পদ স্থায়ী হয়, তাহলে চাকরি স্থায়ীকরণের হিসাব কোন তারিখ থেকে ধরা হবে? প্রচলিত সরকারি বিধি-বিধান, চাকরি-সংক্রান্ত আইনি কাঠামো এবং প্রশাসনিক চর্চা বলছে, পদ স্থায়ী হওয়ার আগে স্থায়ীকরণের আদেশ জারি করা না গেলেও, পদ স্থায়ী হওয়ার পর চাকরি স্থায়ীকরণ কার্যকর হলে তার হিসাব সাধারণত প্রথম যোগদানের তারিখ থেকেই ধরা হয়।

এই বিষয়টি বুঝতে হলে আগে “পদ স্থায়ী হওয়া” এবং “চাকরি স্থায়ীকরণ”—এই দুইটি আলাদা বিষয় স্পষ্টভাবে বোঝা দরকার। অনেকেই দুইটিকে একই বিষয় মনে করলেও বাস্তবে প্রশাসনিক ও আইনি দিক থেকে এদের অর্থ এক নয়।

অস্থায়ী পদে নিয়োগ মানে হলো এমন একটি পদের বিপরীতে যোগদান, যা নির্দিষ্ট সময়, প্রকল্প, প্রশাসনিক প্রয়োজন বা সীমিত অনুমোদনের ভিত্তিতে সৃষ্টি হয়েছে। অন্যদিকে পদ স্থায়ী হওয়া মানে সেই পদকে সরকার স্থায়ী কাঠামোর অংশ হিসেবে অনুমোদন দিয়েছে। কিন্তু কোনো কর্মকর্তা ওই পদে যোগ দিলেই সঙ্গে সঙ্গে তিনি স্থায়ী কর্মচারী হয়ে যান না। চাকরি স্থায়ীকরণের জন্য আলাদা প্রশাসনিক প্রক্রিয়া রয়েছে।

সরকারি চাকরি আইন, ২০১৮-এর ৯ ধারায় শিক্ষানবিসকাল ও চাকরি স্থায়ীকরণের বিষয়টি বিধির মাধ্যমে নির্ধারণের কথা বলা হয়েছে। অর্থাৎ সরাসরি নিয়োগপ্রাপ্ত কোনো সরকারি কর্মচারীর চাকরি কবে এবং কী শর্তে স্থায়ী হবে, তা কেবল নিয়োগপত্রে লেখা কথার ওপর নয়; প্রযোজ্য বিধি, প্রবেশনকাল, দাপ্তরিক প্রতিবেদন, পুলিশ ভেরিফিকেশন, স্বাস্থ্য পরীক্ষাসহ আনুষঙ্গিক প্রক্রিয়ার ওপরও নির্ভর করে।

সাধারণভাবে সরকারি চাকরিতে যোগদানের পর একজন কর্মকর্তা একটি প্রবেশন বা শিক্ষানবিসকাল অতিক্রম করেন। অনেক ক্ষেত্রে এই সময় এক বছর, আবার অনেক পদে দুই বছরও হতে পারে। এই সময়ে কর্মদক্ষতা, আচরণ, দাপ্তরিক উপযোগিতা, পুলিশ ভেরিফিকেশন এবং চিকিৎসা-সংক্রান্ত আনুষ্ঠানিকতা সন্তোষজনক হলে চাকরি স্থায়ীকরণের পথে অগ্রগতি হয়। তবে একটি গুরুত্বপূর্ণ বাস্তবতা হলো—যে পদে কর্মকর্তা কর্মরত, সেটি যদি এখনো স্থায়ী না হয়, তাহলে প্রক্রিয়া সম্পন্ন থাকলেও স্থায়ীকরণের চূড়ান্ত আদেশ অনেক সময় আটকে থাকে।

এখানেই মূল আইনি হিসাবটি গুরুত্বপূর্ণ। কোনো কর্মকর্তা যদি অস্থায়ী পদে যোগদান করেন এবং পরে সরকার সেই পদকে স্থায়ী পদে রূপান্তর করে, তাহলে তার চাকরি স্থায়ীকরণের আনুষ্ঠানিক আদেশ পরে জারি হলেও চাকরির ধারাবাহিকতা সাধারণত যোগদানের তারিখ থেকেই বিবেচিত হয়। অর্থাৎ পদ স্থায়ী হওয়ার তারিখ আর চাকরির গণনাযোগ্য শুরুর তারিখ এক জিনিস নয়।

সহজভাবে বললে, পদ আগে স্থায়ী হতে হবে—এটি প্রশাসনিক শর্ত। কিন্তু পদ স্থায়ী হওয়ার পরে যখন ওই পদের বিপরীতে কর্মরত কর্মকর্তার চাকরি স্থায়ীকরণ করা হবে, তখন তার চাকরির মেয়াদ, জ্যেষ্ঠতা বা চাকরির ধারাবাহিকতা প্রথম যোগদানের তারিখ থেকেই বিবেচনায় আসতে পারে। এ কারণেই স্থায়ীকরণের আদেশ দেরিতে হলেও আগের চাকরিকাল অনেক ক্ষেত্রে হারিয়ে যায় না।

প্রশাসনিক বাস্তবতায় এমন উদাহরণও রয়েছে, যেখানে কোনো দপ্তরে অস্থায়ী পদে কর্মকর্তারা কয়েক বছর আগে যোগদান করেছিলেন, কিন্তু বহু বছর পরে পদ স্থায়ী হয়। পরে চাকরি স্থায়ীকরণের সময় তাদের জন্য স্থায়ীকরণের কার্যকারিতা যোগদানের সময় থেকেই ধরা হয়েছে। এতে জ্যেষ্ঠতা, চাকরির ধারাবাহিকতা এবং ভবিষ্যৎ আর্থিক-প্রশাসনিক সুবিধার হিসাব বাস্তবসম্মতভাবে সংরক্ষিত থাকে।

তবে এখানে একটি বিষয় বিশেষভাবে মনে রাখা দরকার—সব ক্ষেত্রে স্বয়ংক্রিয়ভাবে একই ফল হবে, এমন নিশ্চয়তা নেই। নিয়োগপত্রের শর্ত, সংশ্লিষ্ট দপ্তরের নিয়োগবিধি, পদ সৃষ্টির অনুমোদন, জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়ের নির্দেশনা, অর্থ বিভাগের সম্মতি এবং চূড়ান্ত প্রজ্ঞাপনের ভাষা—এসব বিষয়ও প্রভাব ফেলতে পারে। তাই একই ধরনের দুটি পদ বা দুটি প্রতিষ্ঠানে বাস্তব প্রয়োগে কিছু পার্থক্য দেখা যেতেই পারে।

অনেক চাকরিপ্রার্থীর আরেকটি প্রশ্ন হলো, পুলিশ ভেরিফিকেশন বা মেডিকেল রিপোর্ট হয়ে গেলেই কি চাকরি স্থায়ী হয়ে যায়? উত্তর হলো—না। এগুলো চাকরি স্থায়ীকরণের গুরুত্বপূর্ণ উপাদান, কিন্তু একমাত্র শর্ত নয়। সংশ্লিষ্ট পদ স্থায়ী না হলে বা প্রয়োজনীয় প্রশাসনিক অনুমোদন সম্পন্ন না হলে স্থায়ীকরণের আদেশ বিলম্বিত হতে পারে।

জ্যেষ্ঠতার প্রশ্নেও এই বিষয়টি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। কারণ চাকরি স্থায়ীকরণের কার্যকারিতা যদি যোগদানের তারিখ থেকে ধরা হয়, তাহলে কর্মকর্তা তার চাকরিজীবনের আগের অংশটুকু জ্যেষ্ঠতা নির্ধারণে উপেক্ষিত হওয়ার ঝুঁকি থেকে অনেকটাই সুরক্ষা পান। একই সঙ্গে ভবিষ্যতে পদোন্নতি, পেনশন-সংশ্লিষ্ট হিসাব এবং অন্যান্য সেবা সুবিধার ক্ষেত্রেও এটি প্রভাব ফেলতে পারে।

তবে চাকরি স্থায়ীকরণ নিয়ে বিভ্রান্তি তৈরি হওয়ার বড় কারণ হলো, অনেকে “স্থায়ী পদ” এবং “স্থায়ী চাকরি”কে একই জিনিস ধরে নেন। বাস্তবে পদ স্থায়ী হলেও সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তার চাকরি স্থায়ীকরণের জন্য আলাদা আদেশ দরকার হতে পারে। আবার কেউ অস্থায়ী পদে থাকলেও পরে পদ স্থায়ী হওয়ার পর তার চাকরির ধারাবাহিকতা প্রথম দিন থেকেই গণ্য হতে পারে। এই সূক্ষ্ম পার্থক্য না বোঝার কারণেই চাকরিজীবীদের মধ্যে নানা ধরনের প্রশ্ন তৈরি হয়।

নন-ক্যাডার প্রথম শ্রেণীর চাকরিতে যারা নতুন যোগ দিয়েছেন বা দীর্ঘদিন অস্থায়ী পদের বিপরীতে দায়িত্ব পালন করছেন, তাদের জন্য সবচেয়ে জরুরি বিষয় হলো নিজেদের নিয়োগপত্র, পদসৃষ্টির আদেশ, নিয়োগবিধি, প্রবেশনকাল এবং দাপ্তরিক স্থায়ীকরণ-সংক্রান্ত নথি ভালোভাবে বোঝা। প্রয়োজন হলে বিভাগীয় প্রশাসন শাখা বা সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের কাছ থেকে লিখিত ব্যাখ্যা নেওয়াও বুদ্ধিমানের কাজ।

সব মিলিয়ে বলা যায়, নন-ক্যাডার প্রথম শ্রেণীর চাকরিতে পদ স্থায়ী হওয়া এবং চাকরি স্থায়ীকরণ একে অপরের সঙ্গে সম্পর্কিত হলেও তারা একই বিষয় নয়। পদ স্থায়ী না হলে চাকরি স্থায়ীকরণের আনুষ্ঠানিক আদেশ জারি করা কঠিন হতে পারে, কিন্তু একবার পদ স্থায়ী হয়ে চাকরি স্থায়ীকরণ হলে তার আইনি ও প্রশাসনিক হিসাব অনেক ক্ষেত্রেই যোগদানের দিন থেকেই ধরা হয়। ফলে চাকরির ধারাবাহিকতা, জ্যেষ্ঠতা এবং ভবিষ্যৎ সেবা-সুবিধার প্রশ্নে এই বিষয়টি কর্মকর্তাদের জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।

লিজা আক্তার
লিজা আক্তার
লিজা আক্তার শিক্ষা ও ক্যারিয়ার বিষয়ক সংবাদ নিয়ে কাজ করেন। তিনি ব্যবস্থাপনা বিষয়ে স্নাতক সম্পন্ন করেছেন। তথ্য প্রকাশের আগে তিনি সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানের অফিসিয়াল নোটিশ ও বিশ্বস্ত সূত্র যাচাই করেন। তিনি এমনভাবে তথ্য উপস্থাপন করতে চান যাতে শিক্ষার্থীরা সহজেই প্রয়োজনীয় তথ্য বুঝতে পারে।
রিলেটেড আরটিকেল

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here

- Advertisment -

জনপ্রিয় নিউজ