দীর্ঘ ১১ বছর পর সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারীদের জন্য নতুন পে-স্কেল চালুর প্রস্তুতি জোরালো হয়েছে। অর্থ মন্ত্রণালয় ও সংশ্লিষ্ট সূত্রের বরাত দিয়ে একাধিক গণমাধ্যম জানিয়েছে, ২০২৬-২৭ অর্থবছরের শুরু থেকে নতুন বেতন কাঠামো ধাপে ধাপে কার্যকর করার পরিকল্পনা নেওয়া হচ্ছে। প্রস্তাব অনুযায়ী, প্রথম বছরে বাড়তি মূল বেতনের একটি অংশ, পরের বছরে বাকি অংশ এবং তৃতীয় বছরে বিভিন্ন ভাতা ও আর্থিক সুবিধা পূর্ণাঙ্গভাবে সমন্বয় করা হতে পারে।
সরকারের এই উদ্যোগ বিশেষভাবে গুরুত্বপূর্ণ, কারণ দেশে সর্বশেষ জাতীয় বেতনস্কেল কার্যকর হয়েছিল ২০১৫ সালে। সে হিসেবে নতুন পে-স্কেল বাস্তবায়িত হলে প্রায় এক দশকের বেশি সময় পর সরকারি চাকরিজীবীরা নতুন বেতন কাঠামোর আওতায় আসবেন। বিভিন্ন প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, নতুন কাঠামো নিয়ে চূড়ান্ত সুপারিশ তৈরির কাজও শেষ পর্যায়ে রয়েছে।
যেভাবে বাস্তবায়ন হতে পারে নতুন পে-স্কেল
যে পরিকল্পনার কথা সামনে এসেছে, তাতে ২০২৬-২৭ অর্থবছরে সংশোধিত মূল বেতনের প্রায় ৫০ শতাংশ কার্যকর হতে পারে। এরপর ২০২৭-২৮ অর্থবছরে বাকি ৫০ শতাংশ যুক্ত করা হবে। সবশেষে ২০২৮-২৯ অর্থবছরে বাড়ি ভাড়া, যাতায়াত, চিকিৎসা, বৈশাখী ভাতা ও অন্যান্য আর্থিক সুবিধা সমন্বয় করে পূর্ণাঙ্গ বাস্তবায়ন সম্পন্ন হতে পারে। অর্থনীতির ওপর এককালীন চাপ কমানো এবং বাজেট ব্যবস্থাপনাকে সহনীয় রাখতেই ধাপে ধাপে বাস্তবায়নের এই পদ্ধতি বিবেচনায় নেওয়া হয়েছে বলে জানা গেছে।
প্রথম ধাপে এই বাস্তবায়নের জন্য আসন্ন বাজেটে প্রায় ৩৫ হাজার কোটি টাকার কাছাকাছি অতিরিক্ত বরাদ্দের আলোচনা রয়েছে। কিছু প্রতিবেদনে ৩৫ থেকে ৪০ হাজার কোটি টাকার সম্ভাব্য আর্থিক চাপের কথাও বলা হয়েছে। তবে চূড়ান্ত বাজেট অনুমোদনের আগে এই অঙ্কে পরিবর্তন আসতে পারে।
বেতন কত বাড়তে পারে
প্রস্তাবিত কাঠামোয় সরকারি চাকরির বর্তমান ২০টি গ্রেডই বহাল রাখার কথা বলা হয়েছে। তবে সর্বনিম্ন ও সর্বোচ্চ মূল বেতনে বড় ধরনের পরিবর্তনের সুপারিশ রয়েছে। ২০তম গ্রেডের ন্যূনতম মূল বেতন ৮ হাজার ২৫০ টাকা থেকে বাড়িয়ে ২০ হাজার টাকা এবং ১ম গ্রেডের সর্বোচ্চ মূল বেতন ৭৮ হাজার টাকা থেকে বাড়িয়ে ১ লাখ ৬০ হাজার টাকা করার প্রস্তাব আলোচনায় আছে। বিভিন্ন প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, গ্রেডভেদে বেতন ও সুবিধা ১০০ থেকে ১৪৭ শতাংশ পর্যন্ত বাড়তে পারে।
এছাড়া নতুন কাঠামোয় সর্বনিম্ন ও সর্বোচ্চ বেতনের অনুপাতও কিছুটা কমিয়ে আনার প্রস্তাব রয়েছে। বিদ্যমান ব্যবস্থায় এই অনুপাত যেখানে বেশি, সেখানে নতুন প্রস্তাবে তা ১:৮-এর মধ্যে রাখার কথা বলা হয়েছে। এর উদ্দেশ্য হলো নিম্ন ও মধ্যম গ্রেডের কর্মীদের জন্য তুলনামূলক বেশি স্বস্তি তৈরি করা।
ভাতা কাঠামোতেও আসতে পারে পরিবর্তন
শুধু মূল বেতন নয়, ভাতা কাঠামোতেও বড় সমন্বয়ের সুপারিশ এসেছে। পাওয়া তথ্য অনুযায়ী, ১০ম থেকে ২০তম গ্রেড পর্যন্ত যাতায়াত ভাতা চালুর প্রস্তাব রয়েছে। পাশাপাশি বৈশাখী ভাতা ২০ শতাংশ থেকে বাড়িয়ে ৫০ শতাংশ করার সুপারিশ করা হয়েছে। টিফিন ভাতা ২০০ টাকা থেকে বাড়িয়ে ১ হাজার টাকা করার কথাও আলোচনায় আছে। কোনো চাকরিজীবীর প্রতিবন্ধী সন্তান থাকলে মাসিক ২ হাজার টাকা সহায়তার সুপারিশের বিষয়টিও সামনে এসেছে।
বাড়ি ভাড়ার ক্ষেত্রেও গ্রেডভিত্তিক পুনর্বিন্যাসের প্রস্তাব আছে। উচ্চ গ্রেডের তুলনায় ১১তম থেকে ২০তম গ্রেডের কর্মীদের জন্য তুলনামূলক বেশি সুবিধা রাখার সুপারিশ করা হয়েছে বলে জানা গেছে। এতে নিম্ন আয়ের সরকারি চাকরিজীবীরা কিছুটা বেশি উপকৃত হতে পারেন।
পেনশনভোগীদের জন্য কী থাকছে
নতুন প্রস্তাবে পেনশনভোগীদের বিষয়টিও গুরুত্ব পেয়েছে। প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, মাসে ২০ হাজার টাকার কম পেনশন পাওয়া ব্যক্তিদের ক্ষেত্রে ১০০ শতাংশ পর্যন্ত বৃদ্ধি, ২০ থেকে ৪০ হাজার টাকার মধ্যে পেনশনে ৭৫ শতাংশ পর্যন্ত এবং তার বেশি পেনশনে ৫৫ শতাংশ পর্যন্ত বৃদ্ধির সুপারিশ করা হয়েছে। অর্থাৎ শুধু চাকরিরত কর্মচারী নন, অবসরপ্রাপ্তরাও এই কাঠামোতে বাড়তি সুবিধা পেতে পারেন।
কোন কমিটি কাজ করছে
নতুন পে-স্কেল নিয়ে কাজ করতে ২৩ সদস্যের একটি পে কমিশন গঠন করা হয়েছিল, যার নেতৃত্বে ছিলেন সাবেক অর্থসচিব জাকির আহমেদ খান। কমিশন তাদের প্রতিবেদন জমা দেওয়ার পর সেটি পর্যালোচনা ও বাস্তবায়ন কৌশল ঠিক করতে মন্ত্রিপরিষদ সচিবের নেতৃত্বে উচ্চপর্যায়ের কমিটিও কাজ করছে। বেসামরিক প্রশাসনের পাশাপাশি বিচার বিভাগ ও সশস্ত্র বাহিনীর জন্য আলাদা সুপারিশও বিবেচনায় রয়েছে।
শিক্ষা খাতের জন্য কেন বিষয়টি গুরুত্বপূর্ণ
সরকারি স্কুল, কলেজ, মাদ্রাসা, কারিগরি প্রতিষ্ঠান, সরকারি বিশ্ববিদ্যালয় এবং শিক্ষা প্রশাসনের কর্মকর্তা-কর্মচারীদের জন্য নতুন পে-স্কেল বড় প্রভাব ফেলতে পারে। বিশেষ করে মূল্যস্ফীতির চাপে বাস্তব আয়ের যে সংকোচন তৈরি হয়েছে, তা কিছুটা লাঘবের প্রত্যাশা করছেন অনেকে। শিক্ষা খাতে কর্মরত পরিবারগুলোর ব্যয় কাঠামো, সন্তানদের পড়াশোনা, চিকিৎসা ও বাসাভাড়ার চাপ বিবেচনায় বেতন ও ভাতা সমন্বয়ের এই উদ্যোগকে তাৎপর্যপূর্ণ হিসেবেই দেখা হচ্ছে।
তবে মনে রাখতে হবে, এখন পর্যন্ত এটি চূড়ান্ত গেজেটভুক্ত সিদ্ধান্ত নয়; বরং সুপারিশ, বাজেট প্রস্তুতি এবং বাস্তবায়ন-পরিকল্পনার পর্যায়ে রয়েছে। ফলে কবে থেকে কোন হারে বেতন বাড়বে, কোন ভাতা কবে যুক্ত হবে এবং কারা ঠিক কী পরিমাণ সুবিধা পাবেন—এসব প্রশ্নের চূড়ান্ত উত্তর মিলবে সরকারি ঘোষণা, বাজেট দলিল ও প্রজ্ঞাপনের পর।
শেষকথা
সব মিলিয়ে, ২০১৫ সালের পর নতুন পে-স্কেল বাস্তবায়নের আলোচনা এখন সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ নীতিগত ইস্যুগুলোর একটি। ২০২৬-২৭ অর্থবছর থেকে ৩ ধাপে বাস্তবায়নের যে উদ্যোগ সামনে এসেছে, তা চূড়ান্ত হলে সরকারি চাকরিজীবী ও পেনশনভোগীদের জন্য বড় স্বস্তি বয়ে আনতে পারে। তবে বাস্তব সুবিধার চিত্র স্পষ্ট হবে তখনই, যখন সরকার আনুষ্ঠানিকভাবে বাজেট বরাদ্দ, বাস্তবায়ন সূচি এবং প্রজ্ঞাপন প্রকাশ করবে।
