সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারীদের জন্য নতুন বেতন কাঠামো কার্যকরের পথে বড় অগ্রগতি দেখা যাচ্ছে। আগামী ২০২৬-২৭ অর্থবছরের শুরু, অর্থাৎ ১ জুলাই থেকে নতুন পে-স্কেল ধাপে ধাপে বাস্তবায়নের পরিকল্পনা নেওয়া হয়েছে। এতে দীর্ঘদিন ধরে বেতন পুনর্নির্ধারণের অপেক্ষায় থাকা সরকারি চাকুরিজীবীদের মধ্যে স্বস্তি ফিরতে পারে। একই সঙ্গে পেনশনভোগীরাও এ সিদ্ধান্তের সুফল পেতে পারেন।
সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে, নতুন পে-স্কেল একবারে পুরোপুরি চালু না করে কয়েক ধাপে বাস্তবায়নের চিন্তা করছে সরকার। এর মূল কারণ হলো বড় অঙ্কের অতিরিক্ত ব্যয় সামলানো, পাশাপাশি মূল্যস্ফীতির ওপর সম্ভাব্য চাপ নিয়ন্ত্রণে রাখা। অর্থ মন্ত্রণালয়ের সংশ্লিষ্ট পর্যায়ে এ বিষয়ে কাজ এগিয়েছে বলেও একাধিক প্রতিবেদনে উঠে এসেছে।
নতুন কাঠামো অনুযায়ী প্রথম ধাপে ১ জুলাই থেকে বর্ধিত মূল বেতনের ৫০ শতাংশ কার্যকর করা হতে পারে। পরবর্তী ২০২৭-২৮ অর্থবছরে বাকি ৫০ শতাংশ মূল বেতন সমন্বয়ের কথা রয়েছে। এরপর ২০২৮-২৯ অর্থবছরে বাড়িভাড়া, চিকিৎসা, যাতায়াতসহ অন্যান্য ভাতা নতুন কাঠামোর সঙ্গে সমন্বয় করা হতে পারে। ফলে পুরো বেতন কাঠামো বাস্তবায়ন একটি ধাপভিত্তিক প্রক্রিয়ায় সম্পন্ন হওয়ার সম্ভাবনা তৈরি হয়েছে।
নতুন পে-স্কেল বাস্তবায়নে সরকারের অতিরিক্ত বড় অঙ্কের অর্থ প্রয়োজন হবে। সরকারি কর্মচারীদের বেতন বৃদ্ধির জন্য প্রায় ১ লাখ ৬ হাজার কোটি টাকা এবং পেনশনভোগীদের জন্য আলাদাভাবে আরও উল্লেখযোগ্য বরাদ্দের প্রয়োজন হতে পারে বলে অর্থনৈতিক হিসাব-নিকাশে উঠে এসেছে। সে কারণেই পুরো বোঝা এক অর্থবছরে না নিয়ে কয়েক বছরে ভাগ করে বাস্তবায়নের কৌশল বিবেচনায় এসেছে।
প্রস্তাবিত বেতন কাঠামোর সবচেয়ে আলোচিত দিক হলো সর্বনিম্ন ও সর্বোচ্চ মূল বেতনের বড় ধরনের পরিবর্তন। বর্তমানে ২০তম গ্রেডে সর্বনিম্ন মূল বেতন ৮ হাজার ২৫০ টাকা। নতুন সুপারিশে তা বাড়িয়ে ২০ হাজার টাকা করার প্রস্তাব রয়েছে। অন্যদিকে সর্বোচ্চ ধাপে মূল বেতন ৭৮ হাজার টাকা থেকে বাড়িয়ে ১ লাখ ৬০ হাজার টাকা করার কথা বলা হয়েছে। সব মিলিয়ে গ্রেডভেদে মূল বেতন প্রায় ১০০ থেকে ১৪০ শতাংশ পর্যন্ত বাড়তে পারে।
তবে গ্রেড কাঠামোয় বড় কোনো পরিবর্তনের ইঙ্গিত নেই। আগের মতোই ২০টি গ্রেড বহাল রাখার সুপারিশ করা হয়েছে। একই সঙ্গে সর্বনিম্ন ও সর্বোচ্চ বেতনের ব্যবধানও কিছুটা কমানোর প্রস্তাব রয়েছে। এতে নিম্ন গ্রেডের কর্মচারীদের বেতন বৈষম্য তুলনামূলকভাবে কমতে পারে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।
নতুন বেতন কাঠামোর প্রস্তাব তৈরিতে কাজ করেছে সাবেক অর্থসচিব জাকির আহমেদ খানের নেতৃত্বাধীন ২৩ সদস্যের জাতীয় বেতন কমিশন। কমিশন চলতি বছরের ২১ জানুয়ারি তাদের প্রতিবেদন সরকারের কাছে জমা দেয়। ওই প্রতিবেদনে শুধু বেতন নয়, ভাতা, পেনশন এবং কিছু বিশেষ পদে আলাদা সুবিধার বিষয়ও অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে বলে জানা গেছে।
পেনশনভোগীদের ক্ষেত্রেও সুপারিশগুলো গুরুত্বপূর্ণ। কম পেনশন পাওয়া অবসরপ্রাপ্তদের জন্য তুলনামূলক বেশি হারে পেনশন বৃদ্ধির প্রস্তাব এসেছে। ২০ হাজার টাকার কম পেনশন পাওয়া ব্যক্তিদের পেনশনে বড় বৃদ্ধি, ২০ থেকে ৪০ হাজার টাকার মধ্যে পেনশন পাওয়া ব্যক্তিদের জন্য আলাদা হার এবং তার বেশি পেনশনারদের ক্ষেত্রেও পুনর্নির্ধারণের কথা বলা হয়েছে। বয়স্ক পেনশনভোগীদের চিকিৎসা ভাতা বৃদ্ধির বিষয়টিও আলোচনায় রয়েছে।
এছাড়া বৈশাখী ভাতাসহ কিছু আনুষঙ্গিক সুবিধা বাড়ানোর সুপারিশও রয়েছে। ফলে নতুন পে-স্কেল কেবল মূল বেতন বাড়ানোর মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকবে না; বরং সামগ্রিক আর্থিক সুবিধা পুনর্গঠনের দিকেও যাবে। বিশেষ করে জীবনযাত্রার ব্যয় বেড়ে যাওয়ার প্রেক্ষাপটে এ উদ্যোগ সরকারি চাকুরিজীবীদের জন্য তাৎপর্যপূর্ণ বলে মনে করা হচ্ছে।
তবে এখানে একটি বিষয় গুরুত্বপূর্ণ—এখনও চূড়ান্ত বাস্তবায়নের জন্য আনুষ্ঠানিক প্রজ্ঞাপন জারি হয়নি। অর্থাৎ ১ জুলাই থেকে ধাপে ধাপে বাস্তবায়নের যে পরিকল্পনার কথা জানা যাচ্ছে, তা কার্যকর হতে হলে বাজেট, প্রশাসনিক অনুমোদন এবং আনুষ্ঠানিক সরকারি সিদ্ধান্তের প্রক্রিয়া সম্পন্ন হতে হবে। তাই সরকারি চাকুরিজীবীদের জন্য এটি অবশ্যই আশাব্যঞ্জক খবর, কিন্তু চূড়ান্ত নির্দেশনার দিকেও নজর রাখা জরুরি।
সব মিলিয়ে বলা যায়, নতুন পে-স্কেল বাস্তবায়নের এ উদ্যোগ সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারী ও পেনশনভোগীদের জন্য দীর্ঘ প্রতীক্ষার একটি সম্ভাবনাময় অধ্যায় খুলে দিয়েছে। ১ জুলাই থেকে ধাপে ধাপে কার্যকর হলে এটি শুধু বেতন বৃদ্ধির খবরই হবে না, বরং সরকারি চাকরিজীবীদের আর্থিক সক্ষমতা ও জীবনমান উন্নয়নের দিক থেকেও বড় পরিবর্তন আনতে পারে। আনুষ্ঠানিক ঘোষণা এলে বিষয়টি আরও স্পষ্ট হবে, আর ততদিন পর্যন্ত সংশ্লিষ্ট মহলের নজর থাকবে বাজেট ও সরকারি সিদ্ধান্তের দিকে।
