ইরাসমাস মুন্ডাস স্কলারশিপ পেল ১৫৯ বাংলাদেশি: বিশ্বে তৃতীয় অবস্থানে বাংলাদেশ

২০২৫ সালে বাংলাদেশের জন্য একটি অত্যন্ত গর্বের সংবাদ এসেছে। ইরাসমাস মুন্ডাস স্কলারশিপ পেয়েছেন মোট ১৫৯ জন বাংলাদেশি শিক্ষার্থী, যা আমাদের দেশের মেধাবী তরুণদের আন্তর্জাতিক মানের প্রমাণ। এই অর্জনের মাধ্যমে সারাবিশ্বে বাংলাদেশি শিক্ষার্থীদের অবস্থান তৃতীয় স্থানে উন্নীত হয়েছে।

ইরাসমাস মুন্ডাস স্কলারশিপ কি?

ইরাসমাস মুন্ডাস স্কলারশিপ হলো ইউরোপের সবচেয়ে মর্যাদাপূর্ণ এবং জনপ্রিয় শিক্ষাবৃত্তি প্রোগ্রাম। ১৯৮৭ সাল থেকে শুরু হওয়া এই স্কলারশিপ প্রোগ্রামটি ইউরোপীয় কমিশন পরিচালনা করে থাকে। এই বৃত্তির মাধ্যমে বিশ্বের বিভিন্ন দেশের মেধাবী শিক্ষার্থীরা ইউরোপের শীর্ষস্থানীয় বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে বিনা খরচে মাস্টার্স এবং জয়েন্ট মাস্টার্স করার সুযোগ পান।

এই স্কলারশিপের অন্যতম বিশেষত্ব হলো শিক্ষার্থীরা একাধিক ইউরোপীয় দেশে পড়াশোনা করার সুযোগ পান। অর্থাৎ, একই প্রোগ্রামের আওতায় দুই বা তিনটি দেশের বিশ্ববিদ্যালয়ে অধ্যয়ন করে আন্তর্জাতিক অভিজ্ঞতা অর্জন করতে পারেন।

২০২৫-২৬ শিক্ষাবর্ষে বাংলাদেশি শিক্ষার্থীদের সাফল্য

বৃহস্পতিবার (১৪ আগস্ট ২০২৫) রাজধানীর গুলশানে আয়োজিত এক অভ্যর্থনা অনুষ্ঠানে এই গুরুত্বপূর্ণ তথ্য জানানো হয়। বাংলাদেশে ইউরোপীয় ইউনিয়ন ডেলিগেশন এই অনুষ্ঠানের আয়োজন করে। অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন ইউজিসি চেয়ারম্যান প্রফেসর ড. এস এম এ ফায়েজ এবং বিশেষ অতিথি হিসেবে ছিলেন ইউরোপীয় ইউনিয়নের রাষ্ট্রদূত মাইকেল মিলার

স্কলারশিপপ্রাপ্ত ১৫৯ জন বাংলাদেশি শিক্ষার্থীর মধ্যে ১০৯ জন দুই বছর মেয়াদি জয়েন্ট মাস্টার্স প্রোগ্রামে ফুল ফান্ডেড স্কলারশিপ পেয়েছেন। এই সংখ্যা আগের বছরগুলোর তুলনায় উল্লেখযোগ্য বৃদ্ধি পেয়েছে, যা বাংলাদেশি শিক্ষার্থীদের আন্তর্জাতিক মানের প্রমাণ দেয়।

স্কলারশিপের আর্থিক সুবিধা

ইরাসমাস মুন্ডাস স্কলারশিপ একটি সম্পূর্ণ ফ্রি স্কলারশিপ যা শিক্ষার্থীদের সকল ধরনের খরচ বহন করে। স্কলারশিপের আওতায় যা যা পাওয়া যায়:

  • মাসিক ভাতা: প্রতি মাসে ১৪০০ ইউরো (প্রায় ১ লাখ ৮২ হাজার টাকা) জীবনযাপনের খরচের জন্য।
  • টিউশন ফি: সম্পূর্ণ টিউশন ফি বিনামূল্যে।
  • ভ্রমণ খরচ: বছরে ৩০০০ ইউরো ভ্রমণ খরচ হিসেবে।
  • ইনস্টলেশন খরচ৫০০ ইউরো প্রাথমিক সেটআপের জন্য।
  • বীমা কভারেজ: পূর্ণ স্বাস্থ্য বীমা সুবিধা।

সর্বমোট ২৪ মাসের জন্য একজন শিক্ষার্থী সর্বোচ্চ ৩৩,৬০০ ইউরো (প্রায় ৪৪ লাখ টাকা) পর্যন্ত সুবিধা পেতে পারেন।

কেন এই সাফল্য গুরুত্বপূর্ণ?

ইউজিসি চেয়ারম্যান প্রফেসর এস এম এ ফায়েজ এই সাফল্যকে শুধু শিক্ষার্থীদের ব্যক্তিগত অর্জন নয়, বরং সমগ্র জাতির জন্য গর্ব ও সম্মানের বিষয় বলে উল্লেখ করেছেন। তিনি বলেন, “১৫৯ জন বাংলাদেশি শিক্ষার্থী তীব্র প্রতিযোগিতার মাধ্যমে এই সম্মানজনক স্কলারশিপের জন্য নির্বাচিত হয়েছে।”

এই অর্জন বাংলাদেশি শিক্ষার্থীদের মেধা, দৃঢ় সংকল্প এবং বৈশ্বিক প্রতিযোগিতায় টিকে থাকার সক্ষমতা প্রমাণ করে। বিশ্বব্যাপী র‌্যাংকিংয়ে তৃতীয় অবস্থান অর্জন বাংলাদেশের শিক্ষাব্যবস্থার মানোন্নয়নের একটি ইতিবাচক সংকেত।

ভবিষ্যতের সুযোগ ও সম্ভাবনা

ইউরোপীয় ইউনিয়নের রাষ্ট্রদূত মাইকেল মিলার উল্লেখ করেছেন যে এই স্কলারশিপ প্রোগ্রাম বাংলাদেশি তরুণদের সক্ষমতা বৃদ্ধি ও কর্মসংস্থানের ক্ষেত্রে বড় ধরনের সুযোগ তৈরি করবে। একইসাথে এর মাধ্যমে ইউরোপীয় ইউনিয়নের সাথে বাংলাদেশের সম্পর্ক আরও জোরদার হবে।

প্রফেসর ফায়েজ মনে করেন, এই স্কলারশিপের মাধ্যমে বাংলাদেশি শিক্ষার্থীরা নিজেদের সক্ষমতা বৃদ্ধি, ইউরোপের বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয়ের সাথে যোগসূত্র তৈরি এবং বিশ্বদরবারে নিজেদের মেধা যাচাইয়ের সুযোগ পাবেন।

ইরাসমাস মুন্ডাস স্কলারশিপে আবেদনের যোগ্যতা

যারা এই মর্যাদাপূর্ণ স্কলারশিপে আবেদন করতে চান, তাদের জন্য কিছু মৌলিক যোগ্যতা রয়েছে:

  • শিক্ষাগত যোগ্যতাব্যাচেলর ডিগ্রি সম্পন্ন করতে হবে, কারণ এটি মূলত মাস্টার্স লেভেলের স্কলারশিপ।
  • ভাষাগত যোগ্যতাইংরেজিতে দক্ষতা থাকতে হবে। IELTS বা TOEFL স্কোর প্রয়োজন হতে পারে।
  • একাডেমিক রেকর্ড: ভালো একাডেমিক ফলাফল এবং প্রাসঙ্গিক অভিজ্ঞতা থাকা জরুরি।
  • আবেদনের সময়সীমা: সাধারণত প্রতি বছর অক্টোবর থেকে জানুয়ারি মাস পর্যন্ত আবেদনের সময় থাকে।

স্কলারশিপের বিশেষত্ব

ইরাসমাস মুন্ডাস স্কলারশিপ অন্যান্য স্কলারশিপ থেকে আলাদা কয়েকটি কারণে:

  • বহুদেশীয় শিক্ষা: একই প্রোগ্রামে দুই বা তিনটি ইউরোপীয় দেশে পড়াশোনার সুযোগ।
  • নেটওয়ার্ক তৈরি৩০০+ বিশ্ববিদ্যালয় এবং ২৮৫+ প্রোগ্রামের সাথে যুক্ত হওয়ার সুযোগ।
  • ক্যারিয়ার সুবিধা: ইউরোপে চাকরি খোঁজার এবং পার্মানেন্ট রেসিডেন্সি পাওয়ার সুবিধা।
  • গবেষণার সুযোগ: বিশ্বমানের গবেষণা প্রতিষ্ঠানে কাজ করার সুবিধা।

সরকারি সহায়তা ও উদ্যোগ

ইউজিসির ইন্টারন্যাশনাল কোলাবরেশন বিভাগ বাংলাদেশি শিক্ষার্থীদের এই স্কলারশিপে অংশগ্রহণ বৃদ্ধিতে কার্যকর পদক্ষেপ নিয়েছে। বিভাগের পরিচালক (চলতি দায়িত্ব) এবং ইরাসমাস প্লাস ন্যাশনাল ফোকাল পয়েন্ট জেসমিন পারভীন এক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করছেন।

সরকার ইউরোপের বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয়ে বাংলাদেশি শিক্ষার্থীদের জন্য যৌথ গবেষণা ও উচ্চশিক্ষার সুযোগ বৃদ্ধির জন্য ইউরোপীয় ইউনিয়নের কাছে আবেদন জানিয়েছে।

উপসংহার

২০২৫-২৬ শিক্ষাবর্ষে ১৫৯ জন বাংলাদেশি শিক্ষার্থীর ইরাসমাস মুন্ডাস স্কলারশিপ অর্জন আমাদের দেশের জন্য একটি ঐতিহাসিক মাইলফলক। বিশ্বব্যাপী তৃতীয় অবস্থান অর্জনের মাধ্যমে বাংলাদেশি শিক্ষার্থীরা প্রমাণ করেছে যে মেধা ও প্রতিভার ক্ষেত্রে তারা বিশ্বের যেকোনো দেশের সাথে প্রতিযোগিতা করতে সক্ষম।

এই সাফল্য শুধুমাত্র ব্যক্তিগত অর্জন নয়, বরং এটি বাংলাদেশের শিক্ষাব্যবস্থার উন্নতি এবং ভবিষ্যত প্রজন্মের জন্য অনুপ্রেরণার উৎস। যারা বিদেশে উচ্চশিক্ষা গ্রহণ করতে চান, তাদের জন্য ইরাসমাস মুন্ডাস স্কলারশিপ একটি সুবর্ণ সুযোগ

আমাদের দেশের মেধাবী তরুণদের এই অসামান্য অর্জনে আমরা গর্বিত এবং আশা করি ভবিষ্যতে আরও বেশি সংখ্যক বাংলাদেশি শিক্ষার্থী এই আন্তর্জাতিক মানের শিক্ষাবৃত্তি অর্জনের মাধ্যমে দেশের নাম উজ্জ্বল করবে।

শাকিল আহম্মেদ
শাকিল আহম্মেদhttps://porasonablog.com
মোঃ শাকিল আহাম্মেদ শিক্ষা বিষয়ক সংবাদ নিয়ে নিয়মিত কাজ করছেন এবং ভর্তি, রেজাল্ট ও বিভিন্ন পরীক্ষার আপডেট সংগ্রহ ও যাচাই করেন। তিনি অর্থনীতি বিষয়ে স্নাতক সম্পন্ন করেছেন। তথ্য প্রকাশের আগে তিনি সংশ্লিষ্ট শিক্ষা বোর্ড, বিশ্ববিদ্যালয়ের অফিসিয়াল নোটিশ ও নির্ভরযোগ্য সূত্র মিলিয়ে দেখেন। শিক্ষার্থীদের জন্য দ্রুত ও নির্ভুল তথ্য পৌঁছে দেওয়াই তার প্রধান লক্ষ্য।
রিলেটেড আরটিকেল

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here

- Advertisment -

জনপ্রিয় নিউজ